বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ অনলাইনে চলছে দেদার মাদক কেনাবেচা। সময়ের সঙ্গে পাল্টে গেছে এর চিত্রও। বর্তমানে বিভিন্ন চক্র ওয়েবসাইট, গোপন টেলিগ্রাম গ্রুপ এবং কিউআর কোড ব্যবহার করে প্রযুক্তির আড়ালে সক্রিয়ভাবে এই অবৈধ কারবার পরিচালনা করছে। সশরীরে নির্দিষ্ট স্পটে যাওয়ার ঝুঁকি এড়াতে তারা এখন গ্রাহকদের হোম ডেলিভারি বা ‘ডোরস্টেপ’ সার্ভিস দিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর অনলাইন মাদক কারবারের নতুন নতুন কৌশল ও নেটওয়ার্কের সন্ধান পেলেও অনেক ক্ষেত্রে মূল হোতাদের ধরা সম্ভব হচ্ছে না।
এরইমধ্যে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে অনলাইনে মাদক বিক্রির একটি চক্রের সন্ধান পাওয়ার দাবি করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। সংস্থাটি বলছে, এ চক্রের রয়েছে ওয়েবসাইট ও গোপন ‘টেলিগ্রাম গ্রুপ’। সেখানে সহজেই পাওয়া যাচ্ছে উচ্চমাত্রার মাদক ‘কুশ’ ও ‘সিনথেটিক গাঁজা’।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্র বলছে, অনলাইনে মাদক কেনাবেচার একটি চক্র গড়ে উঠেছে। সেই চক্রের বেশিরভাগ সদস্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তারা ক্যাম্পাসে ঘুরে ঘুরে মাদক সেবন করেন— এমন শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘ভিজিটিং কার্ড’ বিতরণ করেন। সেই কার্ডে ‘কিউআর কোড’ থাকে। সেটি স্ক্যান করলে আগ্রহী ব্যক্তিকে একটি ওয়েবসাইটে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে একটি গোপন টেলিগ্রাম গ্রুপে যুক্ত করা হয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বলছে, শুধু মাঠপর্যায়ে নয়, অনলাইনেও মাদক ব্যবসায়ীদের কার্যক্রমের ওপর নজর রাখা হচ্ছে। কেউ প্রযুক্তির আড়ালে থেকে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করলেও তাকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার জন্য কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসান বলেন, মাদক কারবারিরা এখন প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন নতুন কৌশলে মাদক বিক্রির চেষ্টা করছে। গোয়েন্দা দল সাইবার প্যাট্রোলিংয়ের মাধ্যমে এ ধরনের কার্যক্রম শনাক্ত করে এবং পরবর্তী সময়ে এ অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে উচ্চমাত্রার সিনথেটিক গাঁজা, কুশ সিড ও মাদক প্রক্রিয়াজাতকরণের বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় একজন শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অধিদপ্তর সূত্র বলছে, শুধু মাঠপর্যায়ে নয়, অনলাইনেও মাদক ব্যবসায়ীদের কার্যক্রমের ওপর নজর রাখা হচ্ছে। কেউ প্রযুক্তির আড়ালে থেকে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করলেও তাকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার জন্য কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
টেলিগ্রামে যুক্ত ২৫০ শিক্ষার্থী
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোস্তাক আহমেদের নেতৃত্বে গত শুক্রবার রাজধানীর ভাটারার একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালানো হয়। এ সময় ৩০০ গ্রাম গাঁজাসহ সাইম ইসলাম (১৯) নামে এক তরুণকে আটক করা হয়। ওই তরুণ একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়েন। দুই মাস আগে অনলাইনে মাদক বিক্রির জন্য নিজে একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেন। যারা আগ্রহী হয়ে ওয়েবসাইটে আসেন, তাদের নিয়ে টেলিগ্রামে একটি গোপন গ্রুপ তৈরি করেন। সেখানে দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২৫০ জন শিক্ষার্থী যুক্ত রয়েছেন, যারা মাদক সেবন করেন।
সাইমকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে কর্মকর্তারা জানান, দুই মাস ধরে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে দুই সপ্তাহ ধরে তিনি ‘কুশ’ ও ‘সিনথেটিক গাঁজা’ বিক্রি করছেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষার্থী বলেন, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে একাধিক মাদক কারবারি চক্র সক্রিয়। মাদকের কয়েকটি স্পট রয়েছে। ইদানীং অনলাইনে অর্ডার করলে বাসায় মাদক পৌঁছে দেওয়া হয়।
সাইমকে আটকের পর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বাদী হয়ে ভাটারা থানায় একটি মামলা করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একটি দল ওই এলাকায় অভিযান চালায়। এ সময় একটি ফ্ল্যাটে তল্লাশি করা হয়। সেখান থেকে সাদা পলিথিনে মোড়ানো ৩০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া একটি ব্যবহৃত মুঠোফোন জব্দ করা হয়।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, গ্রেপ্তার সাইমের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জে। তিনি ভাটারার জোয়ার সাহারা লিচুবাগান এলাকার একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন।
কেকে/সাশ