যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালের পক্ষে প্রচারণায় গিয়ে ফ্রান্সের সাম্প্রতিক সহিংস বিক্ষোভের প্রসঙ্গ টেনে ডেমোক্র্যাটদের আক্রমণ করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার দাবি, রিপাবলিকানরা জয়ী না হলে যুক্তরাষ্ট্রেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ দেননি তিনি।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) আয়োজিত সমাবেশে ট্রাম্পের বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল রজার মার্শালের নির্বাচনী প্রচারণায় সমর্থন জোগানো। ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দামের কারণে যেসব অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকান প্রার্থীরা চাপে রয়েছেন, সেসব এলাকায় প্রচারণা চালাচ্ছেন তিনি।
সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, ‘কানসাসকে আমি ভালোবাসি, তবে আমি এখানে এসেছি রজার মার্শাল নামের একজনের জন্য।’
নিজের প্রচলিত নির্বাচনী বক্তব্যে নতুন প্রসঙ্গ যোগ করে তিনি ফ্রান্সের পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেন। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও জনসেবামূলক খাতে পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব নিয়ে দেশটিতে বড় ধরনের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে বিভিন্ন স্থানে দাঙ্গা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা আমাদের দেশে এমনটা ঘটতে দেব না।’ ফ্রান্সে আগুন ও সহিংসতার দৃশ্য দেখলে মনে রাখতে হবে, যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাটরা এমন পরিস্থিতিই তৈরি করতে চায় বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ সময় ডেমোক্র্যাটদের ব্যঙ্গ করে ‘ডুমোক্র্যাটস’ বলেও উল্লেখ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
বক্তব্যে অভিবাসী ও মুসলিমদের লক্ষ্য করে আক্রমণাত্মক ভাষাও ব্যবহার করেন ট্রাম্প। অধিকারকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে তার এ ধরনের বক্তব্যের সমালোচনা করে আসছেন। তাদের মতে, অভিবাসী ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিয়ে এমন বক্তব্য বৈষম্যমূলক মনোভাবকে স্বাভাবিক করে তুলতে পারে।
কানসাসে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই
রক্ষণশীল হিসেবে পরিচিত কানসাসে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ১৬ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন ট্রাম্প। গত ৯৪ বছরে অঙ্গরাজ্যটি থেকে কোনো ডেমোক্র্যাট মার্কিন সিনেটর নির্বাচিত হননি। তবে এবার প্রথম মেয়াদের রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালকে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে ফেলেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিল্টন।
একটি মেথডিস্ট মেগাচার্চের যাজক হ্যামিল্টন ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও তার নেতৃত্বের ধরন নিয়ে সমালোচনা করে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। ট্রাম্প হ্যামিল্টনকে আক্রমণ করে বলেন, তিনি চান মানুষ শ্বেতাঙ্গ হিসেবে জন্ম নেওয়ার জন্য অনুশোচনা করুক।
সমাবেশে মার্শালও সাংস্কৃতিক ইস্যুকে গুরুত্ব দেন। ‘র্যাডিক্যাল ইসলাম’ ঠেকানোর কথা বলে তিনি হ্যামিল্টনকে কানসাসের জন্য অতিরিক্ত উদারপন্থী হিসেবে তুলে ধরেন। সমকামীদের অধিকার ও প্রাইড প্যারেডের প্রতি হ্যামিল্টনের সমর্থনের সমালোচনা করেন তিনি।
এর জবাবে হ্যামিল্টনের প্রচারশিবিরের মুখপাত্র টাইসন ব্রডি মার্শালের প্রচারণাকে ‘ডুবন্ত’ বলে মন্তব্য করেন। তার ভাষ্য, সমাবেশের বক্তব্য কানসাসের মানুষের প্রকৃত সংকট আড়াল করতে পারবে না। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবার অভাব এবং ওয়াশিংটনের দুর্নীতি নিয়ে মানুষ উদ্বিগ্ন।
সোমবার প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় হ্যামিল্টন ট্রাম্পকে কানসাসে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, যেসব ক্ষেত্রে সম্ভব, ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করবেন; তবে ওয়াশিংটনের নীতিতে কৃষক ও গ্রামীণ হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত হলে কানসাসের মানুষের পক্ষে দাঁড়াবেন।
অর্থনীতি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে রিপাবলিকানদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট ও নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখাই দলটির প্রধান লক্ষ্য। বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ২১৮-২১৪ এবং সিনেটে ৫৩-৪৭।
রয়টার্স/ইপসোসের সোমবার প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের কাজের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন ৩১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক। এটি তার জন্য রেকর্ড সর্বনিম্ন সমর্থন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা বদলাতে ডেমোক্র্যাটদের নিট চারটি করে আসন অর্জন করতে হবে।
এদিকে কানসাসের পার্ক সিটিতে ট্রাম্পের সমাবেশে অংশ নিতে অনেক সমর্থককে ইন্টারস্টেট ১৩৫ মহাসড়ক পেরিয়ে এক মাইলের বেশি পথ হেঁটে যেতে হয়। এ সময় একটি ট্রাকস্টপের ডিজিটাল সাইনবোর্ডে প্রতি গ্যালন পেট্রলের দাম ৩.৯৮ ডলার এবং ডিজেলের দাম ৫.৭৮ ডলার দেখানো হচ্ছিল।
মোটরচালকদের সংগঠন এএএ-এর তথ্য অনুযায়ী, কানসাসে গত বছরের গড় দামের তুলনায় পেট্রলের দাম প্রায় ৪৫ শতাংশ বেড়েছে। মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ট্রাম্পের সমর্থকদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা গেছে।
হাচিনসনের ৫৯ বছর বয়সী রিপাবলিকান ভোটার মনিক মুলেন বলেন, প্রতিবন্ধী ভাতা নিয়ে তার আয় সীমিত। তারপরও পণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। খাবার জোগাড় করতেও তাকে আগের চেয়ে বেশি খোঁজাখুঁজি করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, সমাবেশস্থলের কাছে বিক্ষোভকারীদের একটি ছোট দল জড়ো হয়। তাদের একজন হ্যালস্টেডের কৃষক জেমস নাইটিঙ্গেল। তিনি অভিযোগ করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি তার এলাকার কৃষি অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। শস্য বিক্রির বাজার সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি বিদেশ থেকে গরুর মাংস আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার প্রশ্ন, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কী হলো?
কানসাসে দলীয় সমর্থনের বাইরে গিয়েও ভোট দেওয়ার নজির রয়েছে। অঙ্গরাজ্যটির গভর্নর লরা কেলি টানা দুই মেয়াদে ডেমোক্র্যাট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। ট্রাম্পের এক সমর্থক জিনা সেমানও মনে করেন, কানসাসে নির্বাচনে জয় পাওয়া কোনো দলের জন্যই সহজ নয়।
এদিকে ট্রাম্প ৩২ দিনের নির্বাচনী প্রচারাভিযানে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে যেসব এলাকায় তিনি বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন, সেসব এলাকায় বেশি প্রচার চালাচ্ছেন তিনি। তাঁর নির্বাচনী কৌশল সম্পর্কে অবগত এক রিপাবলিকানের মতে, গ্রামীণ এলাকায় ৫৫ বছর বা তার কম বয়সী পুরুষ ভোটারদের সমর্থন কমে যাওয়ার ইঙ্গিত অভ্যন্তরীণ জরিপে পাওয়ার পর এসব এলাকায় গুরুত্ব বাড়িয়েছেন ট্রাম্প।
সূত্র: রয়টার্স
কেকে/সাশ