হেমন্তের আগমনে যশোরের কেশবপুরে শুরু হয়েছে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির প্রস্তুতি। শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে সঙ্গে গাছিরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন গাছের পরিচর্যা ও রস সংগ্রহের কাজে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ২ কোটি টাকার খেজুরের রস ও গুড় উৎপাদনের আশা করছেন স্থানীয় গাছি ও ব্যবসায়ীরা।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকাল ৮টার দিকে কেশবপুর সদর ইউনিয়নের মুলগ্রাম জামতলা এলাকার দাসপাড়া সড়কে দেখা যায়, খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের প্রস্তুতি নিচ্ছেন গাছি আজিজুর রহমান। তিনি জানান, প্রতিদিন ১৫ থেকে ১৬টি খেজুর গাছ কাটতে পারেন তিনি। ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে গাছ কাটা ও রস সংগ্রহের প্রস্তুতির কাজ।
একসময় খেজুরের গুড় উৎপাদন ও বিপণনের জন্য সারা দেশে পরিচিত ছিল কেশবপুর। ১৯৮৬ সালের বন্যার আগ পর্যন্ত এলাকাটি খেজুরের গুড়ের অন্যতম প্রধান মোকাম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। তবে ওই বছরের বন্যার পর বারবার জলাবদ্ধতা, ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে খেজুর গাছের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে উপজেলায় খেজুর গাছের সংখ্যা কমতে থাকে। দীর্ঘদিন মাঠের পর মাঠ পানিতে ডুবে থাকায় মারা যায় অসংখ্য গাছ।
এ ছাড়া জ্বালানি সংকট, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও ন্যায্য দাম না পাওয়ার কারণে গাছির সংখ্যাও কমেছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে কেশবপুর উপজেলায় প্রায় ৪৭ হাজার খেজুর গাছ রয়েছে। কৃষি বিভাগের পরিসংখ্যানে গাছির সংখ্যা ৩৮০ জন। তবে স্থানীয়দের ধারণা, মাঠপর্যায়ে গাছ ও গাছির প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি।
শত শত বছর ধরে কেশবপুরের খেজুরের গুড়ের সুনাম রয়েছে দেশ-বিদেশে। স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, খেজুরের গুড় শিল্পকে কেন্দ্র করেই কেশবপুর শহরের গোড়াপত্তন ঘটে। হরিহর ও বুড়িভদ্রা নদীর তীরে একসময় গড়ে উঠেছিল গুড় তৈরির বহু কারখানা। কপোতাক্ষ নদের তীরের ত্রিমোহিনী বাজারের বিকাশেও এ শিল্পের ভূমিকা রয়েছে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, ১৮ শতকের শেষভাগ ও ১৯ শতকের শুরুর দিকে এ অঞ্চলের খেজুরের গুড় ও তা থেকে তৈরি চিনি ব্রিটেনে রপ্তানি করা হতো।
উপজেলার গড়ভাঙ্গা, ঈমাননগর, বাকবর্শি, পাঁজিয়া, নেপাকাঠি, কমলাপুর, ভাল্লুকঘর, ত্রিমোহিনী, ভানারখোলা, হাসানপুর, কাবিলপুর, সাতবাড়িয়া, জাহানপুর, দোরমুটিয়া, মুলগ্রাম, নতুন মুলগ্রাম, হাবাসপোল, মধ্যকুল, বায়সা, শ্রীরামপুর, কড়িয়াখালি, বেগমপুর, চাঁদড়া, মির্জানগর ও বড়নডালি গ্রামে এখনো খেজুরের রস ও গুড় উৎপাদন হয়।
কেশবপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, খেজুরের গুড় উৎপাদন বাড়াতে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে নতুন খেজুর গাছের চারা রোপণের জন্য প্রদর্শনী প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে চলতি বছর ৮ নম্বর সুফলাকাটি ইউনিয়নের সুফলাকাটি গ্রামে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।
তিনি আরও জানান, নিরাপদ পদ্ধতিতে গুড় উৎপাদনে গাছিদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে, যাতে কেশবপুরের গুড় রপ্তানির উপযোগী মান অর্জন করতে পারে। শীতকালে বাদুড়ের উপদ্রব থেকে রস সুরক্ষিত রাখা এবং স্বাস্থ্যসম্মত গুড় তৈরির বিষয়ে গাছিদের পরামর্শ দিচ্ছেন মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, চলতি বছর উপজেলার বড় একটি অংশ জলাবদ্ধতামুক্ত থাকায় এবং বর্ষার মৌসুম তুলনামূলক আগে শেষ হওয়ায় গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার বেশি খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা সম্ভব হতে পারে।
স্থানীয় গুড় ব্যবসায়ী অলিয়ার রহমান বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে কেশবপুরে প্রায় ২ কোটি টাকার খেজুরের রস ও গুড় উৎপাদন হতে পারে।
কেকে/সাশ