এক পাশে সারের দোকান, অন্য পাশে সারি সারি অটো। টিনের কাঁচা ঘরটি ব্যবহৃত হচ্ছে অটোর গ্যারেজ হিসেবে। অথচ ওই ঘরকেই সারের গুদাম হিসেবে দেখিয়ে পেয়েছে সার ডিলারশিপের অনুমোদন। মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী উপজেলার পাঁচগাঁও ইউনিয়নে এমন চিত্র সামনে আসার পর সার ডিলার নিয়োগে যোগ্যতা যাচাই ও তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে একজন করে মোট ১৩ জন সার ডিলার নিয়োগের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন ৫৫ জন। প্রতিযোগিতাপূর্ণ এ নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণ ও চূড়ান্ত নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
তদন্ত কমিটির এক সদস্যের ভাষ্য, সরেজমিনে পরিদর্শনে কোথাও গরুর খামার, আবার কোথাও জঙ্গলের মধ্যে পরিত্যক্ত ঘর পাওয়া গেছে। আরেক সদস্যের দাবি, তাদের দিয়ে নামমাত্র তদন্ত করানো হয়েছে এবং ডিলার নিয়োগের সিদ্ধান্ত এসেছে ওপরের মহল থেকে।
তাদের বক্তব্য, সরেজমিনে যা পাওয়া গেছে, তা-ই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত নিয়োগে তদন্ত প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ কতটা গুরুত্ব পেয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
পাঁচগাঁও ইউনিয়নে নিয়োগ পাওয়া ডিলার প্রতিষ্ঠানের গুদাম পরিদর্শনে দেখা যায়, টিনের কাঁচা ঘরের এক পাশে সারের দোকান, অন্য পাশে রাখা সারি সারি অটো। অটোর গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহৃত ওই ঘরটিকেই সারের গুদাম হিসেবে ভাড়া নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির মালিক।
পাঁচগাঁও ইউনিয়নের সার ডিলার নাফিজা এন্টারপ্রাইজের মালিক ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. কাইয়ুম ফকির বলেন, ‘সার এখনো আসেনি। সারের গুদাম হিসেবে অটোর গ্যারেজটিই ভাড়া নেওয়া হয়েছে। সার এলে গুদামটি উপযোগী করা হবে।’
তার বক্তব্য অনুযায়ী, সার সরবরাহের আগেই গুদামটি প্রস্তুত করার কাজ বাকি রয়েছে। এ অবস্থায় ডিলারশিপ অনুমোদনের সময় গুদামের বাস্তব অবস্থা কী ছিল এবং নির্ধারিত শর্ত পূরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে নিয়োগপ্রক্রিয়ার তদন্ত কমিটির সদস্য ও উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম মিয়া বলেন, ‘আমরা সরেজমিনে গিয়ে যা পেয়েছি, তা-ই রিপোর্ট দিয়েছি। পাঁচগাঁও ইউনিয়নে যতগুলো আবেদন ছিল, তার মধ্যে নাফিজা এন্টারপ্রাইজের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ ছিল। টিনের ঘরের কাঁচা ভিটি ছিল। ওই গুদাম যে তাদের, তা বোঝার উপায় ছিল না, কারণ ওই ঘরে আরেকজন ব্যবসা করেন। আমাদের রিপোর্ট দেওয়ার কাজ, রিপোর্ট দিয়েছি। কিন্তু ডিলার ওপরের মহলের সুপারিশেই হয়েছে। নাফিজা এন্টারপ্রাইজের জন্য এমপির ডিও লেটার ছিল।’
তদন্ত কমিটির সদস্যের এ বক্তব্যের পর নিয়োগপ্রক্রিয়ায় সরেজমিন পরিদর্শনের ফলাফল কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যে প্রতিষ্ঠানের গুদামের অবস্থা পরিদর্শনের সময় সবচেয়ে খারাপ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, সেই প্রতিষ্ঠান কীভাবে ডিলারশিপ পেয়েছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
এ ছাড়া সংসদ সদস্যের ডিও লেটার বা আধা সরকারি সুপারিশপত্র নিয়োগের সিদ্ধান্তে কী ভূমিকা রেখেছে, তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ কী ছিল এবং চূড়ান্ত অনুমোদন কোন কোন শর্ত যাচাই করে দেওয়া হয়েছে—এসব বিষয়ও স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে গুদামের উপযোগিতা, সংরক্ষণব্যবস্থা, আবেদনকারীর যোগ্যতা এবং তদন্ত প্রতিবেদনের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাই পাঁচগাঁও ইউনিয়নের এ নিয়োগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।
কেকে/এআই