মা ইলিশ সংরক্ষণে টানা ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) মধ্যরাতে। এরপরই মেঘনা নদী ও উপকূলীয় এলাকায় মাছ ধরতে নামবেন নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার জেলেরা। দীর্ঘ বিরতির পর মাছ শিকারে ফেরার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। একই সঙ্গে জেলেদের আনাগোনায় কর্মচাঞ্চল্য ফিরেছে মাছঘাটগুলোতেও।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই হাতিয়ার সূর্যমুখী ঘাটসহ বিভিন্ন মাছঘাটে দেখা গেছে জেলেদের ব্যস্ততা। কেউ নৌকা ও ট্রলার মেরামত করছেন, কেউ ছেঁড়া জাল ঠিক করছেন। আবার কেউ ইঞ্জিনের জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় খাবারসামগ্রী সংগ্রহ করছেন। মাছ ধরা শুরু হলে ঘাটকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যও সচল হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হাতিয়ায় প্রায় এক লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মাছ ধরার পেশার সঙ্গে জড়িত। দীর্ঘদিন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় জেলেদের পাশাপাশি মাছের আড়ত, বরফকল, মুদি দোকান ও খাবারের হোটেলসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কার্যক্রম কমে গিয়েছিল। নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার খবরে এসব পেশার মানুষের মধ্যেও নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।
সূর্যমুখী ঘাটের প্রবীণ জেলে জানে আলম (৬৭) বলেন, ২২ দিন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় জেলেরা বাড়িতে ছিলেন। কেউ কেউ বিকল্প কাজ করেছেন। এখন রাত ১২টার পর নদীতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন সবাই। কেউ নৌকা ঠিক করছেন, কেউ জাল গোছাচ্ছেন, আবার কেউ ইঞ্জিনের জ্বালানি সংগ্রহ করছেন। দীর্ঘ বিরতির পর ঘাটে আবার কর্মচাঞ্চল্য ফিরেছে।
তবে নিষেধাজ্ঞার সময় উপার্জন বন্ধ থাকায় অনেক জেলে পরিবারকে আর্থিক সংকটে পড়তে হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, সরকারি সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় কম হওয়ায় ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয়েছে অনেককে।
সূর্যমুখী ঘাটের জেলে নুর উদ্দিনের পরিবারে সদস্য আটজন। নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন তাঁর নিয়মিত আয় বন্ধ ছিল। সরকারি সহায়তা হিসেবে ২৫ কেজি চাল পেলেও পরিবারের অন্যান্য খরচ মেটাতে তাঁকে হিমশিম খেতে হয়েছে।
নুর উদ্দিন বলেন, ২২ দিন কোনো আয় ছিল না। আট সদস্যের পরিবারের জন্য শুধু চাল দিয়ে সংসার চালানো সম্ভব নয়। তেল, লবণ, ডাল, সবজিসহ প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে হয়েছে। বাধ্য হয়ে ধারদেনা করে চলতে হয়েছে। এখন মাছ ধরতে পারলে সংসারের কষ্ট কিছুটা কমবে বলে আশা করছেন তিনি।
জেলেদের ভাষ্য, মাছ ধরা বন্ধ থাকলেও তাঁদের পরিবারের খাবার, সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও অন্যান্য খরচ বন্ধ থাকেনি। বিশেষ করে বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা না থাকা পরিবারগুলোকে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা শেষে মাছ ধরে আয় করে সংসারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি পুরোনো দেনা পরিশোধের প্রত্যাশা করছেন তাঁরা।
কাজির বাজার ঘাটের ব্যবসায়ী আবদুস শহিদ বলেন, মাছের আড়ত, বরফকল, মুদি দোকান ও খাবারের হোটেলসহ অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মাছঘাটকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। মাছ ধরা বন্ধ থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা কমে গিয়েছিল। জেলেরা মাছ নিয়ে ফিরলে বেচাকেনা বাড়বে। এতে জেলে, ব্যবসায়ী ও শ্রমিক—সব পক্ষই উপকৃত হবে।
মাছ ধরা শুরু হলে নৌকা থেকে মাছ নামানো, আড়তে বেচাকেনা, বরফ সরবরাহ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণসহ বিভিন্ন কাজে কর্মব্যস্ততা বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে নদীতে পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া এবং ন্যায্য দাম নিশ্চিত হওয়া জেলেদের আয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
উপজেলা মৎস্য কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, হাতিয়ায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। তাঁদের মধ্যে ১৫ হাজার জেলে পরিবারকে নিষেধাজ্ঞাকালীন সরকারি সহায়তা হিসেবে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে দুস্থ ও অসহায় পরিবার বাছাই করে এ চাল বিতরণ করা হয়। উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় চাল বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে।
তবে জেলেদের অভিযোগ, ২২ দিন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় পরিবারের খাবারসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে যে পরিমাণ সহায়তা দরকার, তা তাঁরা পাননি। বিশেষ করে বড় পরিবার ও বিকল্প আয়ের সুযোগ না থাকা জেলেদের দুর্ভোগ ছিল বেশি। সরকারি সহায়তার বাইরে থাকা অনেক পরিবারকেও ধারদেনা করে চলতে হয়েছে।
জেলেদের মতে, মা ইলিশের প্রজনন রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ সময়ে জেলে পরিবারগুলোর খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারি সহায়তার পরিমাণ ও আওতা বাড়ানো প্রয়োজন। এতে নিষেধাজ্ঞা পালনে জেলেদের আগ্রহ বাড়ার পাশাপাশি তাঁদের আর্থিক চাপও কমবে।
নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখতে হাতিয়ায় উপজেলা মৎস্য বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন, কোস্টগার্ড ও নৌপুলিশ যৌথভাবে অভিযান চালিয়েছে। এ সময় কয়েকটি ট্রলার ও জেলেকে আটক করা এবং মাছ জব্দ করার ঘটনা ঘটেছে। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের জেল ও জরিমানা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
হাতিয়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফয়জুর রহমান বলেন, বৃহস্পতিবার রাত ১২টার পর নিষেধাজ্ঞা শেষ হবে। এরপর জেলেরা নদীতে গিয়ে মাছ শিকার করতে পারবেন। এর আগে কাউকে নদীতে নামতে দেওয়া হবে না। নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সজাগ রয়েছে।
দীর্ঘ ২২ দিনের বিরতি শেষে নদীতে ফেরার অপেক্ষায় হাতিয়ার জেলেরা। তাদের আশা, মাছের পর্যাপ্ত সরবরাহ ও ন্যায্য দাম পেলে সংসারের আর্থিক সংকট কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি সচল হবে ঘাটকেন্দ্রিক অর্থনীতিও।
কেকে/সাশ