মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬,
১৯ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: ● মিরপুরে ফের শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, বন্ধ মেট্রোরেল স্টেশন      ● গাজীপুরে ফের মহাসড়ক অবরোধ, যান চলাচল বন্ধ      ● ২০২৭ সালের সরকারি ছুটির তালিকা অনুমোদন      ● ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়ল ২২৩ টাকা      ● ডেঙ্গুতে আরও ৬ জনের মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ৪৩৩      ● জাতীয় নিরাপত্তায় ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির ওপর জোর রাষ্ট্রপতির      ● হাম উপসর্গে আরও ৩ প্রাণহানি, হাসপাতালে ভর্তি ১৫৪৮      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
ভোটের বাক্সে ফিলিস্তিনি নাগরিকরা : ইসরায়েলের গণতন্ত্রের অগ্নিপরীক্ষা
রাজা ইব্রাহিম খলিল
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬, ১:৩৯ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

২৭ অক্টোবরের ইসরায়েলি নির্বাচনে ৩৮টি দল অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে মাত্র দুটি দল শান্তি, সমতা ও দখলদারি অবসানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দুটিই ‘আরব দল’ অর্থাৎ ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের দল। প্রায় ৮০ শতাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিক ভোট দিয়েছেন, ফলে এই দুই দল নেসেটে ১৯টি আসন পেয়েছে, যা তাদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। কিন্তু এই সাফল্য উদযাপনের বদলে ডেকে এনেছে এক তীব্র প্রতিক্রিয়া, আর সেই প্রতিক্রিয়াই বলে দিচ্ছে ইসরায়েলি গণতন্ত্রের ভেতরের আসল চেহারাটা কেমন।

এই বিপুল ভোটার উপস্থিতি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন, ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবির ৪৮টি। কোনো পক্ষই সরকার গড়ার মতো অবস্থানে নেই। ফিলিস্তিনি নাগরিকদের উচ্চ ভোটদানের হার সাধারণত দুই প্রধান শিবিরের আসন কমিয়ে দেয়, ফলে ভারসাম্য নড়ে যায়। এবারও ঠিক তাই ঘটেছে।

নেতানিয়াহুর শিবিরের প্রতিক্রিয়া ছিল তাৎক্ষণিক। নির্বাচনকে ‘চুরি হওয়া’ বলে দাবি করা হচ্ছে, আর ‘আরব ভোট’ সীমিত করার দাবি উঠছে। ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের ওপর উসকানি বেড়েছে। সাবেক ডেপুটি স্পিকার মোশে ফাইগলিন ফিলিস্তিনিদের নির্বাচনি সংগঠিত হওয়াকে ইসরায়েলি রাজনীতির ‘৭ অক্টোবর’ বলে বর্ণনা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর ছেলে ইয়াইর নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ইরানের পারমাণবিক হুমকি বাদে রাষ্ট্রের টিকে থাকার জন্য ‘সবচেয়ে বড় বিপদ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

একটু থমকে ভাবা দরকার : নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করাকে যখন ‘বিপদ’ বা ‘হামলা’র সঙ্গে তুলনা করা হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে, গণতন্ত্রের ধারণাটাই কি সবার জন্য সমান প্রযোজ্য?

ফিলিস্তিনি নাগরিকরা দীর্ঘদিন একটি দ্বিধায় ভুগছেন। ভোট না দিলে ইহুদি ডানপন্থিদের ক্ষমতায় আসার ঝুঁকি বাড়ে। ভোট দিলেও গ্যারান্টি নেই যে তাতে তাদের সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষা পাবে।

ইতিহাসে এর নজির আছে। ১৯৯৯ সালে আরব ভোটারদের উপস্থিতি ছিল প্রায় ৭৫ শতাংশ, আর তারা বিপুলভাবে নেতানিয়াহুর বিপরীতে লেবার পার্টির এহুদ বারাকের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। এক বছর পর আরিয়েল শারনের আল-আকসা চত্বর পরিদর্শন এবং দ্বিতীয় ইন্তিফাদা শুরুর পর ইসরায়েলি পুলিশ ১৩ জন ফিলিস্তিনি নাগরিককে হত্যা করে। ক্ষোভ ও মোহভঙ্গের ফলে ২০০১ সালের নির্বাচন বর্জিত হয়, ভোটদানের হার নেমে আসে প্রায় ১৯ শতাংশে। শ্যারন জয়ী হন।

অর্থাৎ ভোট দিলে লাভের নিশ্চয়তা নেই, না দিলে ক্ষতি নিশ্চিত। এই দুই পাথরের মাঝখানে পড়ে আছে একটি সম্প্রদায়।

কাগজে-কলমে ফিলিস্তিনি দলগুলোর অবস্থান শক্তিশালী হতে পারত। কিন্তু ইহুদি-নেতৃত্বাধীন দলগুলো তাদের সঙ্গে সরকার গঠনে বসতে নারাজ, ফলে এই শক্তি কার্যত অকেজো হয়ে পড়ে।

এই বর্জনের যুক্তি ২০২১ সালের এপ্রিলে স্পষ্ট হয়েছিল। চরম ডানপন্থি নেতা বেজালেল স্মোত্রিচ তখন ফিলিস্তিনি দল রায়ামের সমর্থনে নেতানিয়াহুর সরকার গঠনের চেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেন। তার যুক্তি ছিল, এমন পদক্ষেপ আরব ভোটারদের আরও উদ্বুদ্ধ করবে, আর তাতে বামপন্থিদের ক্ষমতায় ফেরার পথ খুলে যাবে। মানে, ফিলিস্তিনিদের গ্রহণ করা মানেই ইহুদি ডানপন্থার রাজনৈতিক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করা।

পরে রায়াম নাফতালি বেনেট ও ইয়াইর লাপিদের স্বল্পস্থায়ী জোট সরকারে যোগ দেয়, কোনো জাতীয় দাবি ছাড়াই। এর মূল্যও ছিল বড়। প্রথমবারের মতো ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক নেতৃত্ব ইসরায়েলকে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং জাতীয় প্রশ্ন সরিয়ে রেখে নাগরিক ও আর্থসামাজিক ইস্যুতে মনোযোগ দিতে রাজি হয়। এত ছাড় দেওয়ার পরও সেই সরকার টিকল না। জোটের দুই সদস্য ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরকারে থাকতে অস্বীকার করে পদত্যাগ করলে সরকার ভেঙে পড়ে।

এ থেকে নেতানিয়াহু একটি শিক্ষা নিয়েছেন : ভবিষ্যতে কোনো ‘পরিবর্তনের সরকার’ ঠেকাতে হলে ফিলিস্তিনি দলগুলোকে বৈধতাহীন করতে হবে এবং তাদের প্রতিনিধিত্ব সীমিত করতে হবে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর ফিলিস্তিনি নাগরিকদের রাজনৈতিক পরিসর তীব্রভাবে ছোট হয়ে এসেছে। সামাজিক মাধ্যমের পোস্টের কারণে শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হয়েছে, কর্মীরা চাকরি হারিয়েছেন, যুদ্ধবিরোধী বক্তব্যের জেরে পুলিশি তদন্ত ও গ্রেপ্তার হয়েছে।

নির্বাচন প্রক্রিয়াতেও এই আবহের ছাপ পড়েছে। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি ফিলিস্তিনিদের দুটি তালিকাই বাতিলের পক্ষে ভোট দেয়, সঙ্গে আইনপ্রণেতা ওফের কাসিফ ও বালাদ প্রধান সামি আবু শেহাদেহকেও অযোগ্য ঘোষণা করে। শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট এই নিষেধাজ্ঞা বাতিল করে।

ফিলিস্তিনিদের আক্রমণ করা এখন রাজনৈতিক প্রচারের নিয়মিত উপাদান। নির্বাচনের আগে আরবি পোস্ট নামের একটি গণমাধ্যম ১০ হাজারেরও বেশি নির্বাচন-সংক্রান্ত সামাজিক মাধ্যম বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করে। তাতে দেখা গেছে, নেতানিয়াহু শিবিরের প্রার্থীদের ৪০ শতাংশ পোস্ট আরব বা ফিলিস্তিনিদের নিয়ে, যার ৯৪ শতাংশই বিদ্বেষপূর্ণ।

আরও উদ্বেগজনক ছিল নেগেভে রায়ামের কর্মীদের বাড়িতে পুলিশের অভিযান। নির্বাচনি ঘুষের সন্দেহে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ স্বীকার করেছে, তল্লাশি হয়েছিল পরোয়ানা ছাড়াই। পরে প্রতিবেদনে প্রমাণের ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং তিনজনকেই ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে সন্দেহের একটি আখ্যান দানা বেঁধে গেছে।

বছরের পর বছর দমন ও উসকানির পরও ফিলিস্তিনি নাগরিকরা পিছু হটেননি। তারা সংগঠিত হয়েছেন, রেকর্ড সংখ্যায় ভোট দিয়েছেন। নাগরিকত্বকে গুরুত্ব দিয়ে, পূর্ণ রাজনৈতিক সমতা ও দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অর্থবহ ভ‚মিকার অধিকার দাবি করে তারা এক ধরনের জুয়া খেলেছেন।

কিন্তু তাদের নির্বাচিত দলগুলো বিচ্ছিন্ন থাকার ঝুঁকিতে আছে, যদি না তারা ইহুদি-নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবিরের শর্ত মানে। সেই শর্তগুলো হলো : ইসরায়েলকে একচেটিয়াভাবে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, হামাসকে ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন ঘোষণা করা এবং বাধ্যতামূলক সামরিক বা জাতীয় সেবা মেনে নেওয়া, যা থেকে ফিলিস্তিনি নাগরিকরা বর্তমানে অব্যাহতি পান।

সহজ ভাষায়, রাজনৈতিক ক্ষমতা পাওয়ার ন্যায্য অধিকার তারা তখনই পাবেন, যখন ফিলিস্তিনি প্রশ্নে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করবেন, জায়নবাদকে গ্রহণ করবেন এবং নিজেদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের মর্যাদা মেনে নেবেন
অনেক ফিলিস্তিনি নাগরিক এখন আশঙ্কা করছেন, রাজনৈতিক সাফল্য স্বীকৃতির বদলে আরও হুমকি, বিধিনিষেধ বা সহিংসতা ডেকে আনতে পারে। ইসরায়েলের এই উচ্চ ভোটদান ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে তার পরিচয় আর গণতন্ত্রের দাবির মধ্যকার মৌলিক বিরোধকে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।

এই দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত ইহুদি রাজনৈতিক আধিপত্যের পক্ষেই মীমাংসিত হতে পারে। তাতে এমন আইন আসতে পারে, যা ফিলিস্তিনিদের নাগরিক অধিকার আরও খর্ব করবে এবং বর্ণবাদী ব্যবস্থাকে আরও পোক্ত করবে। পরবর্তী নেসেটে শুধু ফিলিস্তিনিদের ভোটাধিকার সীমিত করার একটি বিল এলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। সামাজিক মাধ্যমে এমন দাবি এখনই উঠছে।

জনমতের চিত্রও আশাব্যঞ্জক নয়। ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের জুলাইয়ের এক জরিপ অনুযায়ী, ডানপন্থি ইহুদি শিবিরের উত্তরদাতাদের মাত্র ৪৬ শতাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভোটাধিকারকে সমর্থন করেন। অর্থাৎ একটি মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারও সেখানে অর্ধেকের কম মানুষের সমর্থন পাচ্ছে।

গাজায় যুদ্ধের পর ইহুদি ইসরায়েলিদের মধ্যে এমন একটি অনুভূতি বাড়ছে যে তারা যা খুশি করতে পারেন, কোনো সীমারেখা নেই। এর ফলে রাষ্ট্র ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতি প্রায় নিয়ন্ত্রণহীন আচরণ করার দিকে ঝুঁকছে।

যে গণতন্ত্র কেবল কিছু নাগরিকের ভোটকে স্বাগত জানায়, আর অন্যদের ভোট বেশি কার্যকর হয়ে উঠলে তাকে হুমকি ভাবে, তা আসলে গণতন্ত্রের মুখোশ। ২৭ অক্টোবরের ফল সেই মুখোশের আড়ালটা সামনে এনেছে। ফিলিস্তিনি নাগরিকরা নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছেন, এবার প্রশ্নটা ইসরায়েলি সমাজ ও রাজনীতির : তারা কি এই ফলকে মেনে নেবে, নাকি ভোটাধিকারের ওপরই খড়্গহস্ত হবে?

ইসরায়েলি সমাজ যদি দিক না বদলায়, তবে গণতন্ত্রের এই ভান আর বেশিদিন টিকবে না।

লেখক : গবেষক

কেকে/সাশ



মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close