ই-রিকশা নিয়ে আমাদের আলোচনা দুই মেরুতে আটকে আছে। একদল বলছেন এটি শহরের শৃঙ্খলার বিষফোঁড়া, আরেকদল বলছেন এটি গরিবের বাহন, লাখো পরিবারের অন্ন। দুই পক্ষেরই কিছু সত্য আছে। সমস্যা হলো, দুই পক্ষের কথাই শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্ন এড়িয়ে যায়: এই যান নিয়ে রাষ্ট্র কী নিয়মে, কার কাছে কী জবাবদিহি করে চলবে?
দেশে ঠিক কতগুলো ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক চলছে, তার নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই। ডেইলি স্টারের তথ্যমতে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে সংখ্যাটা সাড়ে চার থেকে পাঁচ মিলিয়ন। বিআরটিএর অনুমান ছয় মিলিয়নের বেশি। ২০২৪ সালে তৎকালীন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী সংসদে বলেছিলেন প্রায় ৪০ লাখ। সংখ্যা যা-ই হোক, যে খাত নিবন্ধনের বাইরে, তার চালক, মালিক বা ব্যাটারির হিসাব রাষ্ট্রের কাছে নেই। জবাবদিহির প্রথম ফাঁকটা এখানেই।
ই-রিকশা বেড়েছে চাহিদা থেকেই। জেলা ও মফস্বল শহরে জনসংখ্যা বেড়েছে, স্কুল-কলেজ-বাজার বেড়েছে, কিন্তু গণপরিবহন সীমিত। গলির ভেতরের যাত্রীর কাছে ই-রিকশা সস্তা ও সহজলভ্য। বিডিনিউজ২৪-এর প্রতিবেদনে এক যাত্রী বলেছেন, অন্য যান ভাড়া চায় দ্বিগুণ, ইজিবাইক যেতে চায় কম ভাড়ায়। চালকের দিক থেকেও গল্পটা একই। মিরপুরের এক চালক বলেছেন, প্যাডেল রিকশায় যাত্রী না পেয়ে তিনি ব্যাটারিচালিত রিকশায় এসেছেন।
প্রথম আলোর এক নিবন্ধ জানায়, বহু তরুণের জীবিকা এখন ইজিবাইক, কিছু নারীও চালান। চালকদের সংগঠন ‘রিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদ’ নিজেরাই নীতিমালা চেয়েছে। তাদের ভাষ্য, তারা প্রধান সড়কে চলতে চান না, চান লাইসেন্স ও নিবন্ধনের কাঠামো। আরও আছে গ্যারেজ, মেকানিক, যন্ত্রাংশ ও ব্যাটারির দোকানের মতো সহায়ক জীবিকা। তাই নিষেধাজ্ঞার ফল শুধু চালকের ওপর পড়ে না।
নিষেধাজ্ঞার ইতিহাসও শিক্ষণীয়। ২০১৪ সালে হাইকোর্ট ঢাকা ও চট্টগ্রামে এসব যান চলাচল অবৈধ বলেছিলেন, কারণ লাইসেন্স দেওয়ার আইনি ভিত্তিই ছিল না। ২০২৪ সালের নভেম্বরে আবার তিন কর্মদিবসের মধ্যে ঢাকায় বন্ধের নির্দেশ এল। ডেইলি স্টারের ভাষ্যে, সেই নির্দেশ কার্যকর হয়নি এবং সংখ্যাও কমেনি। আদেশ দিয়ে বাস্তবতা মুছে ফেলা যায় না।
বিপরীত পক্ষের অভিযোগগুলোও হালকা নয়। প্রথমত দুর্ঘটনা। টিবিএসের প্রতিবেদনে এক স্থানীয় এনজিওর হিসাবে ২০২৪ সালে ই-রিকশা-সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় নিহত ৮৭০ জন। বেশির ভাগ যানের কাঠামো দুর্বল, অথচ মোটরের গতি বেশি। আবার সংগ্রাম পরিষদের নেতা বলছেন, বিআরটিএর হিসাবে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত মোট নিহত ৩,২৫৭ জনের মধ্যে মোটরসাইকেলে ৮৯৩, ট্রাকে ৪৫২ এবং রিকশায় ১৩৬ জন। অর্থাৎ ই-রিকশাকে একা দায়ী করা যেমন একপেশে, তেমনি তার দুর্ঘটনার ঝুঁকি অস্বীকার করাও ঠিক নয়। এখানে ভিন্ন উৎসের হিসাব মেলে না, আর সেটাও এই খাতের তথ্যহীনতারই লক্ষণ।
দ্বিতীয়ত বিদ্যুৎ। যুগান্তরের প্রতিবেদনে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের কারণে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে। এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, একেকটি রিকশা আট ঘণ্টা চার্জে প্রায় নয় ইউনিট বিদ্যুৎ নেয়। সেই বিশ্লেষণের শিরোনামের দাবি, দেশের পাঁচ শতাংশ বিদ্যুৎ এখানে যাচ্ছে। এটি একটি বিশ্লেষণের হিসাব, সরকারি পরিসংখ্যান নয়। তবে চুরির বিদ্যুতে চার্জ দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করার জায়গা নেই। এর দায় চালকের একার নয়। যিনি অবৈধ সংযোগ দিয়ে চার্জিং স্টেশন চালান এবং যে কর্তৃপক্ষ তা দেখেও দেখে না, দায় তাদেরও।
তৃতীয়ত ব্যাটারি ও পরিবেশ। এসব যানে সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি চলে। ব্যবহৃত ব্যাটারির অনানুষ্ঠানিক পুনর্ব্যবহারে সীসা-দূষণের ঝুঁকির কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞরা, প্রথম আলোর একটি মতামতে আইসিডিডিআর,বি-র গবেষণার উল্লেখসহ। এই দূষণের জন্য আজ পর্যন্ত কেউ জবাবদিহির মুখে পড়েননি।
নতুন বিধিমালা: কী এগোল, কী বাকি
২০২৬ সালের ২৯ অক্টোবর স্থানীয় সরকার বিভাগ সিটি করপোরেশন এলাকার জন্য ই-রিকশা চলাচল বিধিমালা গেজেটে প্রকাশ করেছে। প্রথম আলো ও ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী এতে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। প্রতিটি যানকে বুয়েট-নির্ধারিত কারিগরি ও নিরাপত্তা মান মানতে হবে এবং স্পিডোমিটার লাগাতে হবে। জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে ও বিআরটি করিডোরে ই-রিকশা নিষিদ্ধ। এক জাতীয় পরিচয়পত্রে সর্বোচ্চ পাঁচটি রিকশা নিবন্ধন করা যাবে, আর এক সিটি করপোরেশনের রিকশা অন্য সিটিতে বাণিজ্যিকভাবে চলবে না। দুর্ঘটনার পর থামা, আহতকে সাহায্য করা ও পুলিশকে জানানোর বাধ্যবাধকতাও আছে। ব্যাটারি উৎপাদন, আমদানি ও পুনর্ব্যবহার পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের আওতায় থাকবে।
এগুলো এগোনোর পথ, সন্দেহ নেই। দীর্ঘদিন যে খাত আইনের ‘অন্ধ জায়গা’ ছিল, প্রথম বিধিমালা তাকে অন্তত স্বীকৃতি দিয়েছে। তবু গবেষক ও সাংবাদিক এম এম মুসা তার লেখায় যে প্রশ্নগুলো তুলেছেন, সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ। আমি সেগুলোকে তিনটি জবাবদিহির প্রশ্ন হিসেবে সাজাচ্ছি।
প্রথম প্রশ্ন, আইনি কাঠামো। বিআরটিএ এই যান নিবন্ধন করে না। সিটি করপোরেশন আইনের ২০২৬ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে নিবন্ধনের ক্ষমতা গেছে স্থানীয় সরকারের হাতে। অথচ সংগ্রাম পরিষদ ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী বিআরটিএ-কেন্দ্রিক একক ব্যবস্থা চায়, যেখানে নিবন্ধন, রুট পারমিট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, প্রশিক্ষণ ও ফিটনেস থাকবে। পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের জন্য আলাদা সমন্বিত নীতিমালার কাজ চলছে। অর্থাৎ আজ কেবল সিটির অংশে বিধি আছে। ই-রিকশার বড় অংশই চলে এর বাইরে, আর এক সিটির রিকশা অন্য সিটিতে চলতে পারবে না বলে সীমানা পেরোলে কী হবে, সেই উত্তর এখনো অসম্পূর্ণ।
দ্বিতীয় প্রশ্ন, স্বার্থের সংঘাত ও অংশগ্রহণ। মুসার লেখা অনুযায়ী, একই সিটি করপোরেশন সংখ্যা ঠিক করছে, নিবন্ধন দিচ্ছে বা প্রত্যাখ্যান করছে, ফি নিচ্ছে এবং ফি তার নিজের রাজস্ব। আপিলের কর্তৃপক্ষও কাছাকাছি। এই কাঠামোতে সংখ্যা সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত রাজস্ব-স্বার্থের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। ফি ও নিবন্ধনের সিদ্ধান্ত আলাদা হওয়া উচিত, আপিল হওয়া উচিত স্বাধীন কোনো ফোরামে। একই লেখা বলছে, প্রস্তুতকারকের অনুমোদনে সুপারিশকারী সাত সদস্যের কমিটিতে সবাই সরকারি প্রতিষ্ঠানের লোক। চালক, যাত্রী, ব্যাটারি খাত, বিদ্যুৎ বিভাগ বা পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধি নেই। যাদের জীবিকা এই সিদ্ধান্তে ঠিক হবে, তারা ঘরের বাইরে। এই কাঠামো আস্থা তৈরি করে না।
তৃতীয় প্রশ্ন, শাস্তির স্পষ্টতা। প্রথম আলো ও মুসার লেখা মিলিয়ে বোঝা যায়, বিধিমালায় অপরাধের তালিকা আছে: নিবন্ধনহীন চালানো, গতিসীমা অতিক্রম, অতিরিক্ত যাত্রী, অননুমোদিত ব্যাটারি বা কাঠামো পরিবর্তন ইত্যাদি। মুসার অভিযোগ, সেই অপরাধের পাশে নির্দিষ্ট জরিমানা বা কারাদণ্ড লেখা নেই, বলা আছে কেবল ‘আইনানুগ ব্যবস্থা’। সংবিধানের ৩৫(১) অনুচ্ছেদ বলে, অপরাধের সময় বলবৎ আইন ছাড়া কাউকে দণ্ড দেওয়া যাবে না। শাস্তি আগে থেকে জানা না থাকলে নিয়ম প্রয়োগ হয় কর্মকর্তার মর্জিতে, আর সেই মর্জির শিকার সাধারণত দুর্বল চালকই হন। আমি বিধিমালার পূর্ণ গেজেট নিজে যাচাই করিনি। তাই পাঠকের উচিত মূল গেজেটে এই দিকটি মিলিয়ে নেওয়া।
বাকি দুই জবাবদিহি
নিয়ম লিখে দিলেই হবে না, পুরো শৃঙ্খলে দায় ঠিক করতে হবে। চার্জিং পয়েন্টের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষমতা পেলে বিদ্যুৎ-চুরির দায়ও নির্ধারিত হওয়া দরকার, নইলে চোরাই সংযোগ ‘লাইসেন্সপ্রাপ্ত’ হয়ে যেতে পারে। যে গ্যারেজ বা কারখানা অনিরাপদ রিকশা বানায়, তার দায়ও নিবন্ধিত উৎপাদক-ব্যবস্থার ভেতরে আনতে হবে। আর ‘লাইনম্যান’ বা স্ট্যান্ড-নিয়ন্ত্রণকারী প্রভাবশালীদের নামে অনানুষ্ঠানিক চাঁদাবাজির সংস্কৃতিও ঠেকাতে হবে। ঢাকা টাইমসের পুরোনো এক প্রতিবেদনেই এই কাঠামোর কথা এসেছে।
ই-রিকশার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নটা এখন ‘থাকবে কি থাকবে না’ নয়। বাংলাদেশ অবজারভারের ভাষায়, প্রশ্ন হলো কীভাবে এটি নিরাপদে, দক্ষভাবে ও টেকসইভাবে পরিচালিত হবে। নিষেধাজ্ঞার দুই দফা ব্যর্থতা সেটাই দেখিয়েছে।
তাই তিনটি কাজ জরুরি। এক, সারাদেশের জন্য একটি সমন্বিত আইনি কাঠামো, যেখানে বিআরটিএ, স্থানীয় সরকার, বিদ্যুৎ ও পরিবেশ বিভাগের ভ‚মিকা স্পষ্ট। দুই, ক্ষমতা ভাগ: নিবন্ধন, ফি আদায় ও আপিল আলাদা হাতে, আর নীতিনির্ধারণী কমিটিতে চালক, যাত্রী ও খাতসংশ্লিষ্টদের প্রতিনিধিত্ব। তিন, প্রতিটি অপরাধের পাশে নির্দিষ্ট দণ্ড, আর দুর্ঘটনা, বিদ্যুৎ ও ব্যাটারি নিয়ে নিয়মিত প্রকাশ্য তথ্য।
যে বাহনে লাখো মানুষ চড়েন, তার নিয়ম হতে হবে স্পষ্ট, ন্যায্য ও সবার জানা। জীবিকা বাঁচানো এবং যাত্রীর নিরাপত্তা, এই দুইয়ের মধ্যে বেছে নিতে হবে না। বেছে নিতে হবে কেবল এমন নিয়ম, যা মানুষকে নিরাপদও রাখে, আবার অন্যায়ভাবে দুর্বলের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগও দেয় না।
লেখক: প্রকৌশলী
কেকে/সাশ