তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ এখন আর কেবল মজুরির দাবির বিষয় নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্য গুরুতর সংকটে রূপ নিয়েছে। ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ নানা দাবিতে টানা চতুর্থ দিনের মতো আন্দোলন চলছে। সড়ক অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপে শিল্পাঞ্চলের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়েছে।
বিজিএমইএর তথ্যমতে, গত সোমবার অন্তত ৬৯০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল, যেখানে কর্মরত শ্রমিক ১৭ লাখের বেশি। গতকাল মিরপুর, সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরের ৩০৬টি কারখানা বন্ধ থাকায় প্রায় সাত লাখ শ্রমিক কর্মহীন ছিলেন। উৎপাদন বন্ধ থাকলে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হয়, রপ্তানি চালান পিছিয়ে যায়, ক্রেতার আস্থা কমে এবং নতুন অর্ডার প্রতিযোগী দেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এর ধাক্কা পরিবহন, প্যাকেজিং, বস্ত্র ও সুতা খাতেও লাগে। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের সুনাম একদিনে গড়ে ওঠেনি; তা ধরে রাখা কঠিন, হারাতে সময় লাগে সামান্যই।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আন্দোলনের নেপথ্যে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সংযোগ থাকতে পারে। ডিএমপি জানিয়েছে, পোশাকশ্রমিকের ছদ্মবেশে নাশকতার অভিযোগে ৩৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নাশকতা ও সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়; এর পেছনে যারাই থাকুক, তাদের আইনের আওতায় আনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে ‘থাকতেই পারে’ ধরনের বক্তব্য প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না, বরং জনমনে সংশয় বাড়ায়। আর একটি দাবিতে মাঠে নামা হাজার হাজার শ্রমিককে একই কাতারে ফেললে সমস্যার গোড়ায় পৌঁছানো যাবে না। সুযোগসন্ধানী মহল থাকলেও শ্রমিকদের ক্ষোভের একটি অর্থনৈতিক ভিত্তি আছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর মতো মজুরি নিশ্চিত না হলে অসন্তোষ নতুন রূপে ফিরে আসবে। তাই নিরাপত্তা ও সংলাপ, দুটিই একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। এ প্রেক্ষাপটে সরকারের প্রতি আমাদের আহ্বান: অবিলম্বে সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে সময়সীমাবদ্ধ ত্রিপক্ষীয় সংলাপ শুরু করতে হবে এবং ন্যূনতম মজুরির দাবি যাচাই করতে হবে। নাশকতার অভিযোগ ও রাজনৈতিক সংযোগের দাবি তথ্য-প্রমাণসহ আইনি প্রক্রিয়ায় ও জনসমক্ষে উপস্থাপন করতে হবে, যাতে প্রকৃত শ্রমিকরা হয়রানির শিকার না হন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে সংযত থাকতে হবে; নিরস্ত্র শ্রমিকদের ওপর অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করবে।
গাজীপুর, আশুলিয়া ও মিরপুরে কারখানা, মহাসড়ক ও গণপরিবহনের নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে, যাতে কাজে যেতে ইচ্ছুকরা নির্বিঘ্নে যেতে পারেন। বিজিএমইএ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে সঠিক চিত্র তুলে ধরতে হবে এবং সরবরাহের সময়সূচি নিয়ে আগাম আলোচনা করতে হবে।
মজুরি নির্ধারণ, অভিযোগ নিষ্পত্তি ও শিল্প-সম্পর্ক ব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার আনতে হবে, যাতে দাবি আদায়ে ভবিষ্যতে রাস্তায় নামার প্রয়োজন না হয়। পোশাকশিল্প রপ্তানি আয়ের প্রধান ভরসা, আর লাখ লাখ পরিবারের জীবিকা এর সঙ্গে জড়িত। শ্রমিকের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করা যেমন অনুচিত, তেমনি অস্থিরতার সুযোগে নাশকতা চালানোও অগ্রহণযোগ্য।
সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, দৃঢ়তা ও সহমর্মিতার ভারসাম্য রেখে দ্রুত সংকটের সমাধান করা। সময় নষ্ট হলে ক্ষতি শুধু কারখানার নয়, পুরো দেশের।
কেকে/সাশ