বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬,
২১ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: ● সীমান্তের ওপার থেকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে: প্রধানমন্ত্রী      ● মোংলায় পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      ● হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার ইকবাল সোবহান, মুচলেকায় মুক্ত রাজীব ঘোষ      ● শ্রমিকদের ব্যবহার করে রাষ্ট্রবিরোধী অপচেষ্টা চলছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী      ● একনেকে ৫৮ হাজার কোটি টাকার ১৩ প্রকল্প অনুমোদন      ● শেখ হাসিনার সাবেক তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী আটক      ● গার্মেন্টস শ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণ হবে ডিসেম্বরের মধ্যে      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
খাদ্য যখন কূটনীতির অস্ত্র
আমানুর রহমান
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬, ২:৫৮ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

যুদ্ধক্ষেত্রে এখন আর কেবল বারুদ, ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জন কিংবা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল দিয়ে জয়-পরাজয় ও আধিপত্যের সমীকরণ নির্ধারিত হয় না। সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক কূটনীতির কৌশলও ক্রমশ জটিল, কঠোর ও বাস্তববাদী হয়ে উঠছে। 

বর্তমান ভূরাজনীতিতে মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম মৌলিক উপাদান ‘খাদ্য’ আর কেবল ক্ষুধা নিবারণের অনুষঙ্গ নয়; বরং তা রূপ নিয়েছে শক্তিশালী কৌশলগত হাতিয়ারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বমঞ্চে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা, বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ‘ব্ল্যাক সি গ্রেন ইনিশিয়েটিভ’ বা কৃষ্ণসাগর শস্য উদ্যোগ নিয়ে পরাশক্তিগুলোর টানাপোড়েন এবং ওডেসাসহ ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ কৃষ্ণসাগরীয় বন্দরগুলোর কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে, প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং দুর্বল দেশগুলোকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থের অনুকূলে আনতে খাদ্য সরবরাহকেও কূটনৈতিক চাপের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

একসময় ইউক্রেনকে বলা হতো ইউরোপের শস্যভান্ডার। অথচ যুদ্ধের কারণে দেশটির কৃষি উৎপাদন, রপ্তানি অবকাঠামো ও কৃষ্ণসাগরীয় নৌপথ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক খাদ্যবাজারে, বিশেষ করে গম ও ভুট্টার সরবরাহ এবং দামের ওপর। যখন রাজনৈতিক বৈরিতা ও সামরিক সংঘাতের কারণে লাখ লাখ টন শস্য কিংবা সার বন্দরে আটকে পড়ে, তখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির আলোঝলমলে টেবিলের সঙ্গে অনুন্নত অঞ্চলের ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকার একাকার হয়ে যায়। ফলে কৃষিপণ্য, খাদ্যশস্য ও রাসায়নিক সার এখন আর কেবল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সাধারণ পণ্য নয়; বরং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য ও কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ।

খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে না পারা অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো এই খাদ্যরাজনীতির কারণে ক্রমবর্ধমান আমদানিনির্ভরতা ও নীতিগত দুর্বলতার মুখে পড়ছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)  এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে স্পষ্ট, বিশ্বের বহু দেশ তাদের অভ্যন্তরীণ খাদ্যচাহিদা পূরণে আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। বিশেষ করে গম, ভুট্টা, ভোজ্যতেল ও রাসায়নিক সারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহ কয়েকটি প্রধান উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারক দেশের ওপর কেন্দ্রীভূত থাকায় আমদানিনির্ভর দেশগুলো সহজেই বৈশ্বিক সংকটের অভিঘাতের শিকার হয়।

এই নির্ভরশীলতার সুযোগে রপ্তানিকারক দেশগুলো অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখার অজুহাতে হঠাৎ রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা কিংবা সীমাবদ্ধতা আরোপ করলে আমদানিকারক দেশগুলোর খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। ফলে এসব দেশের নীতিনির্ধারকদের খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিকল্প উৎস খোঁজা, কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। এতে তাদের অর্থনৈতিক ও পররাষ্ট্রনীতির স্বাধীনতা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সীমিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ইতিহাসের ঔপনিবেশিক যুগে যেভাবে ভূখণ্ড দখল করে অন্য রাষ্ট্রের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হতো, বর্তমান বিশ্বে খাদ্য, কৃষিপণ্য ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তেমনই একধরনের অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা তৈরি হচ্ছে, যাকে নতুন ধরনের খাদ্য-ঔপনিবেশিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।

মানবসৃষ্ট এই রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এবং কিছু দেশের বাণিজ্যিক সুরক্ষাবাদী নীতি। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে খরা, আকস্মিক বন্যা, দাবদাহ ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত কৃষি উৎপাদনকে ক্রমাগত অনিশ্চিত করে তুলছে। বিশেষ করে আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী খরা ও বৃষ্টিপাতের ঘাটতি খাদ্য উৎপাদন এবং জীবিকার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।

এমন পরিস্থিতিতে কোনো পণ্যের উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলেই কিছু রপ্তানিকারক দেশ নিজেদের অভ্যন্তরীণ বাজার সুরক্ষার যুক্তিতে হঠাৎ রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা বা সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। আবার কোথাও অতিরিক্ত মজুত, বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া কিংবা বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা পণ্যের দাম বাড়িয়ে তোলে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহের সামান্য বিঘ্ন ও আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য বড় সংকটে পরিণত হয়। খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি দরিদ্র মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং সরকারের ওপর ভর্তুকি ও আমদানি ব্যয় বাড়ানোর চাপ সৃষ্টি করে। ফলস্বরূপ, জলবায়ুগত ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলো শুধু প্রকৃতির বৈরিতার শিকারই হচ্ছে না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ও রপ্তানিকারক দেশগুলোর সিদ্ধান্তের কারণে আরও বেশি অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপে পড়ছে।

বৈশ্বিক খাদ্য ও কৃষি সংকটের নেপথ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গুটিকয়েক বহুজাতিক করপোরেশনের হাতে কৃষি উপকরণের বাজারের ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীভবন। বিভিন্ন গবেষণা ও বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাণিজ্যিক বীজ ও কীটনাশকের বৈশ্বিক বাজারে অল্প কয়েকটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে।

২০২৬ সালে প্রকাশিত GRAIN-এর কৃষিবাণিজ্যবিষয়ক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাণিজ্যিক বীজের বাজারের প্রায় ৫০ শতাংশ এবং কীটনাশকের বাজারের প্রায় ৫৬ শতাংশ চারটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠান—বায়ার, কর্টেভা, সিনজেনটা ও বিএএসএফের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অন্যদিকে রাসায়নিক সারের বাজারের কাঠামো তুলনামূলকভাবে ভিন্ন এবং এর সরবরাহে কয়েকটি উৎপাদনকারী দেশ ও প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এই বাজারকেন্দ্রীভবনের ফলে উন্নয়নশীল দেশের একজন প্রান্তিক কৃষক কোন জাতের বীজ ব্যবহার করবেন, কীটনাশক ও কৃষি উপকরণ কত দামে কিনবেন এবং উৎপাদন ব্যয় কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন—এসব ক্ষেত্রে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে।

বিশেষ করে উন্নত বীজ ও কৃষি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষকের উৎপাদন খরচও অনেক ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে ক্ষুদ্র কৃষকেরা নিজেদের ঐতিহ্যগত বীজ সংরক্ষণ ও চাষাবাদের স্বাধীনতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন। এটি কেবল কোনো একটি দেশের কৃষি খাতের সমস্যা নয়; বরং বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থার ওপর করপোরেট প্রভাব, বাজারের প্রতিযোগিতা এবং কৃষকের অধিকার নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

কূটনীতির এই নিষ্ঠুর ও স্বার্থকেন্দ্রিক খেলায় যখন খাদ্যকে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার ‘শূন্য ক্ষুধা’ বা জিরো হাঙ্গার অর্জনের পথ আরও কঠিন হয়ে ওঠে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ২ নম্বর অভীষ্টের ২.১ লক্ষ্যমাত্রায় ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধার অবসান এবং সবার জন্য সারা বছর নিরাপদ, পুষ্টিকর ও পর্যাপ্ত খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা এখনো উদ্বেগজনক। FAO-সহ জাতিসংঘের পাঁচটি সংস্থার ২০২৬ সালের ‘দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ (SOFI)) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বের প্রায় ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার মুখোমুখি হয়েছে, যা বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। একই সময়ে প্রায় ২১০ কোটি মানুষ মাঝারি বা তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ছিল।

নাইজেরিয়া, গাজা এবং হর্ন অব আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, দারিদ্র্য ও খাদ্য সরবরাহের সংকট মানুষের জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। বিশ্বজুড়ে খাদ্য উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও দারিদ্র্য, বৈষম্য, সংঘাত, অপচয় এবং অসম বণ্টনের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ পর্যাপ্ত খাবার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পরাশক্তিগুলোর আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা, পারস্পরিক বৈরিতা এবং নিষেধাজ্ঞার অভিঘাত এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। এটি কেবল বৈদেশিক নীতি কিংবা ভূরাজনৈতিক সমীকরণের বিষয় নয়; বরং মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তির মৌলিক অধিকার, মানবিক মর্যাদা ও বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

পৃথিবীকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল, নিরাপদ ও মানবিক করে গড়ে তুলতে হলে খাদ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অনৈতিক ক্ষমতার রাজনীতির অবসান জরুরি। খাদ্য মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম মৌলিক অধিকার; এটি কোনো দেশের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল, আধিপত্য বিস্তার কিংবা ক‚টনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ার হতে পারে না। 

লেখক: কবি ও কলামিস্ট


কেকে/সাশ 


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close