দেশের প্রায় এক কোটি মানুষের চুলা জ্বলে সিলিন্ডারজাত এলপিজিতে। অথচ এই অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের বাজারে চলছে চরম নৈরাজ্য। টানা দুই মাসে দুই দফা দাম বাড়িয়েও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে পারেনি।
অক্টোবরে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা এবং নভেম্বরে আরও ২২৩ টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু খুচরা বাজারে সেই সিলিন্ডারই বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। দেড় মাসের বেশি সময় ধরে ক্রেতাকে সরকারি দামের চেয়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেশি গুনতে হচ্ছে। সরকারি দাম কার্যত কাগজেই সীমাবদ্ধ।
বিক্রেতারা বলছেন, বাজারে সরবরাহ সংকট আছে। কিন্তু আমদানির তথ্য ভিন্ন চিত্র দেখায়। দেশে মাসিক এলপিজির চাহিদা ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টন। অথচ আগস্টে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার টন, সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এবং অক্টোবরেও প্রায় একই পরিমাণ।
চাহিদার ঊর্ধ্বসীমা ছাড়িয়ে আমদানির পরও সংকট থাকে কীভাবে? এর উত্তর কারও কাছে নেই, কিংবা থাকলেও কেউ দিচ্ছে না। আমদানিকারক ও বোতলজাতকারী কোম্পানিগুলো সরবরাহ ঠিক আছে বলে দায় চাপাচ্ছে ডিলার, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের ওপর। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, কোম্পানির প্ল্যান্ট থেকেই তাঁদের সরকারি দামের চেয়ে ৯০ থেকে ২৪০ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। এই দায় ঠেলাঠেলির মধ্যে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ ভোক্তা।
বনশ্রীর এক রেস্তোরাঁ ব্যবস্থাপকের ভাষায়, দাম কমার কোনো লক্ষণ নেই, বাধ্য হয়েই কিনতে হচ্ছে। সংকট শুরু হয়েছে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি, আর এতদিন পর প্রমাণের কথা বলা হচ্ছে। কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি বহুবার শোনা গেছে, কিন্তু দায়ীদের নাম আজও জনসমক্ষে আসেনি। বেশ কয়েকটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়লেও কমিশন স্পষ্ট কিছু জানায়নি।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার অস্থির, এ কথা সত্য। তবে এই অস্থিরতার মধ্যে অন্য দেশগুলো শুধু দাম বেঁধে দিয়েই বসে থাকেনি। ভারত রান্নার গ্যাসের ভর্তুকি সরাসরি ভোক্তার ব্যাংক হিসাবে পাঠিয়ে মধ্যস্থতাকারীর সুযোগ কমিয়েছে।
শ্রীলঙ্কা ২০২২ সালের জ্বালানি সংকটে কিউআর কোডভিত্তিক বিতরণ চালু করে কালোবাজারি ঠেকানোর চেষ্টা করেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সদস্য দেশগুলো কৌশলগত মজুত রেখে অভ্যন্তরীণ বাজারকে বৈশ্বিক ধাক্কা থেকে সুরক্ষা দেয়। এসব ব্যবস্থা নিখুঁত নয়, কিন্তু শিক্ষা অভিন্ন: দাম নির্ধারণ আর দাম কার্যকর করা এক কাজ নয়। সরকার নির্ধারিত দাম কার্জকর করতে তথ্য, তদারকি ও দ্রুত শাস্তির বিধান থাকা চাই।
প্রথমত, আমদানি, বোতলজাত ও বিতরণের তথ্য সাপ্তাহিক ভিত্তিতে প্রকাশ করতে হবে, যাতে কোন স্তরে সংকট তৈরি হচ্ছে তা চিহ্নিত করা যায়।
দ্বিতীয়ত, দোষী কোম্পানিগুলোর নাম প্রকাশ করে লাইসেন্স স্থগিত বা বড় অঙ্কের জরিমানার মতো দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু চিঠি চালাচালিতে বাজার ঠিক হবে না।
তৃতীয়ত, আমদানিকারকদের মজুত ও সরবরাহ নিয়মিত অডিট করতে হবে এবং যারা অন্যের কাছ থেকে কিনে বোতলজাত করে, তাদের ক্রয়-বিক্রয়ের হিসাব যাচাই করতে হবে।
চতুর্থত, ভোক্তা অধিদপ্তর ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান জোরদার করতে হবে এবং অভিযোগ জানানোর জন্য কার্যকর হটলাইন চালু করতে হবে।
পঞ্চমত, দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত মজুতের পরিকল্পনা নিতে হবে এবং দাম বাড়ানো অনিবার্য হলে নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার কথা ভাবতে হবে।
হুঁশিয়ারি দিয়ে বাজার চলে না, চলে কার্যকর প্রয়োগে। দাম বাড়ার বোঝা সবসময় ভোক্তাই বহন করেন, অথচ বাড়তি দামের সুফল পায় একটি অসাধু চক্র। সংকটের অজুহাতে অন্যায্য মুনাফার সুযোগ আর নয়। বিইআরসি ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে এখনই স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কঠোর প্রয়োগের পথে হাঁটতে হবে।
কেকে/সাশ