শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬,
২২ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: ● ৭ নভেম্বর দেশের সব পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা      ● সীমান্তের ওপার থেকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে: প্রধানমন্ত্রী      ● মোংলায় পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      ● হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার ইকবাল সোবহান, মুচলেকায় মুক্ত রাজীব ঘোষ      ● শ্রমিকদের ব্যবহার করে রাষ্ট্রবিরোধী অপচেষ্টা চলছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী      ● একনেকে ৫৮ হাজার কোটি টাকার ১৩ প্রকল্প অনুমোদন      ● শেখ হাসিনার সাবেক তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী আটক      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
৭ নভেম্বরের গণবিস্ফোরণ ও আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার
শেখ রিফাদ মাহমুদ
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ২:৩৪ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

পঁচাত্তরের নভেম্বর। ঢাকার আকাশে তখন কুয়াশা নয়, জমাট অনিশ্চয়তা। সেনাছাউনিতে ফিসফিস, শহরজুড়ে থমথমে নীরবতা। কে কার পক্ষে, কে কার বিরুদ্ধে মানুষ জানে না। রাষ্ট্র যেন কাণ্ডারিহীন নৌকা, ঘূর্ণির মুখে। ফররুখ আহমদের সেই আকুল জিজ্ঞাসা তখন যেন গোটা জাতির বুকের ভেতর থেকে উঠে আসছে ‘রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরী?’

উত্তর এল সাতই নভেম্বরের প্রথম প্রহরে। রাত না পোহাতেই ছাউনি ছেড়ে বেরিয়ে এলেন সিপাহিরা, আর ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই রাজপথে নামল ঢাকার মানুষ। ট্যাংকের ওপর উঠে দাঁড়িয়েছে কিশোর, সৈনিকের গলায় মালা পরিয়ে দিচ্ছেন বৃদ্ধা, আকাশ কাঁপানো স্লোগান্ ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’। বন্দুক আর জনতার এমন আলিঙ্গন এই জনপদ আগে দেখেনি। সেদিন গৃহবন্দিত্ব থেকে যাকে সিপাহীরা কাঁধে তুলে নিয়ে এল, তিনি কোনো আস্ফালনকারী সেনাপতি নন; শান্ত, স্বল্পভাষী, সংযত এক মানুষ। দিশাহারা জাতি সেদিন ফিরে পেল তার কাণ্ডারিকে। সেই শীতার্ত ভোরে ঢাকার রাজপথে নেমেছিল সৈনিক আর জনতার মিলিত স্রোত। সে স্রোতের মুখে ছিল একটি নাম, জিয়াউর রহমান।

‘সিপাহি বিপ্লব’ শব্দ দুটির গায়ে ইতিহাসের গন্ধ লেগে আছে। আঠারোশ সাতান্নতে ব্যারাকপুরে মঙ্গল পাণ্ডের প্রথম গুলি; সে বছরেরই নভেম্বরে চট্টগ্রাম ও ঢাকার লালবাগে কোম্পানির বিরুদ্ধে দেশি সিপাহিদের অস্ত্র ধরা। একশ আঠারো বছর পর, আরেক নভেম্বরে, সিপাহি আবার অস্ত্র তুলল এবার বিদেশি বণিকের বিরুদ্ধে নয়, নিজের রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব আর স্বাধীনতার অভিমুখ রক্ষায়। ইতিহাস নাকি নিজের পুনরাবৃত্তি করে না, কেবল ছন্দ মেলায়; সাতই নভেম্বর সেই ছন্দ মেলানোরই দিন। আরও পেছনে, ১৭৮৩-র রংপুরের প্রান্তরে নূরলদীনের সেই হাঁক, সৈয়দ শামসুল হকের কলমে যা অমর ‘জাগো বাহে, কোনঠে সবাই?’ 

উত্তরবঙ্গের সেই মাটিরই সন্তান বগুড়ার বাগবাড়ির ছেলে কমল, যিনি একদিন গোটা জাতিকে ডেকে তুলবেন ঘুম থেকে।
কে ছিলেন এই মানুষটি? একাত্তরের পঁচিশে মার্চের রাতে চট্টগ্রামে, জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাসের হুকুম নিয়ে বন্দরের পথে যেতে যেতে যিনি গাড়ি ঘুরিয়ে উচ্চারণ করেছিলেন দুটি মাত্র শব্দ ‘উই রিভোল্ট’। দু-দিন পর কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে এক মেজরের দৃঢ় কণ্ঠ ভেসে এল ইথারে, স্বাধীনতার ঘোষণা হয়ে।

১৯৪০-এর আঠারোই জুন লন্ডনের বিবিসি থেকে জেনারেল দ্য গলের কণ্ঠ যেমন পরাজিত ফ্রান্সকে বলেছিল, প্রতিরোধের শিখা নিভবে না; কালুরঘাটের সেই কণ্ঠও তেমনি অন্ধকারে হাতড়ে বেড়ানো সাড়ে সাত কোটি মানুষকে জানিয়ে দিল যুদ্ধ শুরু হয়েছে, নেতৃত্ব আছে, ভয় নেই।

চট্টগ্রাম বরাবরই বিদ্রোহের শহর; ১৯৩০-এ মাস্টারদা সূর্য সেন এখানেই অস্ত্রাগার দখল করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। একচল্লিশ বছর পর সেই শহর থেকেই আরেক বিদ্রোহী ঘোষণা করলেন একটি রাষ্ট্রের জন্ম। জেড ফোর্সের অধিনায়ক, রণাঙ্গনের বীর উত্তম; নজরুলের ‘বল বীর, বল উন্নত মম শির’ যেন তাকে দেখেই লেখা।

কিন্তু জিয়ার প্রকৃত উচ্চতা সৈনিকের পোশাকে নয়, সেই পোশাক খুলে রাখার পরে। জর্জ ওয়াশিংটন যেমন তলোয়ার নামিয়ে রেখে গড়েছিলেন প্রজাতন্ত্রের ভিত, জিয়াও সাতই নভেম্বরের জনস্রোত থেকে উঠে এসে হাতে তুলে নিলেন কোদাল। একদলীয় শাসনের শৃঙ্খল ভেঙে ফিরিয়ে আনলেন বহুদলীয় গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের মুখ থেকে খুলে দিলেন তালা, রাজনৈতিক দলগুলোর বন্ধ দরজা খুলে দিলেন, হাঁটলেন নির্বাচনের পথে।

যে দেশকে পৃথিবী ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে বিদ্রুপ করত, সে দেশের রাষ্ট্রপতি মাইলের পর মাইল হেঁটে গ্রামে ঢুকলেন, নিজ হাতে খাল কাটলেন, জাতিকে শেখালেন ‘উৎপাদনের রাজনীতি’। উনিশ দফা, খাল খনন, গ্রাম সরকার, গণশিক্ষা, যুব ও মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সূচনা, তৈরি পোশাক আর জনশক্তি রপ্তানির বীজ বপন আজকের অর্থনীতির অনেক ফসলের চারা তারই হাতে রোপিত। একুশে পদক আর স্বাধীনতা পদক প্রবর্তিত হলো তার সময়েই; ভাষা ও মুক্তিযুদ্ধ পেল রাষ্ট্রীয় সম্মানের আসন। সুকান্তের ‘ছাড়পত্র’র অঙ্গীকার ‘এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি’ জিয়া যেন তা কাঁধে বয়ে বেড়িয়েছেন সাড়ে পাঁচটি বছর।

কূটনীতির ময়দানে তিনি ছিলেন ছোট দেশের বড় মানুষ। ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ভূগোল, ভাষা, বিশ্বাস, সংস্কৃতি আর মুক্তিযুদ্ধকে এক সুতোয় গাঁথা এই পরিচয়ের ভেতর দিয়ে তিনি বলতে চেয়েছিলেন, আমরা কারও ছায়া নই, আমরা আমাদের মতো।

মওলানা ভাসানীর ফারাক্কা লংমার্চে যে আত্মমর্যাদার সুর, জিয়ার পররাষ্ট্রনীতিতে সেই সুরই বেজেছে পরিশীলিত কণ্ঠে। দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতার যে স্বপ্ন আজ ‘সার্ক’ নামে পরিচিত, তার প্রথম চিঠিটি লেখা হয়েছিল তারই কলমে। নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের আসন, ইরান-ইরাক যুদ্ধ থামাতে শান্তির দূত হয়ে তেহরান-বাগদাদে ছুটে যাওয়া এক নবীন রাষ্ট্রের এমন আত্মবিশ্বাসী পদচারণা তখন বিশ্বকে অবাক করেছিল। নজরুল যাকে নিয়ে লিখেছিলেন ‘কামাল, তুনে কামাল কিয়া ভাই’, সেই আতাতুর্ক পরাজিত সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তূপ থেকে গড়েছিলেন আধুনিক রাষ্ট্র; জিয়াও দুর্ভিক্ষ আর অস্থিরতার ছাই থেকে এঁকেছিলেন স্বনির্ভর বাংলাদেশের নকশা তবে বাঙালির হৃদয়ের মাপে।

আর তার ব্যক্তিগত সততা? আব্রাহাম লিংকনের কাঠের কুঁড়েঘর যেমন মার্কিন গণতন্ত্রের প্রতীক, জিয়ার ভাঙা স্যুটকেস আর ছেঁড়া গেঞ্জিও তেমনি এই জনপদের রাজনীতির নৈতিকতার কষ্টিপাথর। রাষ্ট্রপতি হয়েও যিনি রেখে গেলেন না সম্পদের কোনো পাহাড়; কেবল একটি ভাঙা স্যুটকেস, কয়েকটি ছেঁড়া গেঞ্জি। নজরুল লিখেছিলেন, ‘হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান’; জিয়ার জীবনে সেই দারিদ্র্য ছিল স্বেচ্ছায় বরণ করা, রাজকীয় মহিমায়। তার সেই বিখ্যাত উক্তি ‘আমি রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতি কঠিন করে দেব’ আজও প্রতিটি ক্ষমতাবানের কানের কাছে ফিসফিস করে।

ত্রিশে মে, একাশি। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস। যে শহর থেকে তিনি একটি জাতির জন্মের ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেই শহরই দেখল তার শেষ নিশ্বাস। তারপর ঢাকার রাজপথে নামল এ দেশের ইতিহাসের বৃহত্তম জনসমাবেশগুলোর একটি তার জানাজা। শেরেবাংলা নগর থেকে দিগন্ত পর্যন্ত কেবল মানুষ আর মানুষ; চোখে জল, মুখে কোনো স্লোগান নেই। সেই নিঃশব্দ জনসমুদ্রই ছিল তার জনপ্রিয়তার সবচেয়ে বড় রায়। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান, ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।’ জিয়া তাই ক্ষয়হীন।

বাহান্নর বর্ণমালা, একাত্তরের রণাঙ্গন, পঁচাত্তরের সাতই নভেম্বর, আর চব্বিশের জুলাইয়ে বুক পেতে দেওয়া আবু সাঈদ, ওয়াসিম এই জনপদের মানুষের সংগ্রামের একটি অবিচ্ছিন্ন শৃঙ্খল আছে। সাতই নভেম্বর সেই শৃঙ্খলের এক মজবুত কড়া। এই জাতির যৌবন বারবার মিছিলে গেছে, এবং প্রতিবারই ফিরে এসেছে একটি করে ভোর হাতে নিয়ে।

৭ নভেম্বর সৈনিক আর জনতা পরস্পরকে ভাই বলে ডেকেছিল, রাষ্ট্র ফিরে পেয়েছিল তার সার্বভৌম অভিমুখ, আর একজন মানুষ ক্ষমতাকে ভোগের সিংহাসন নয়, খাল কাটার কোদাল হিসেবে দেখেছিলেন। আজ যারা তার নামে শপথ নিয়ে রাষ্ট্রের হাল ধরেছেন, তাদের কাছে সাতই নভেম্বরের সবচেয়ে বড় দাবি একটিই সেই ভাঙা স্যুটকেসটি যেন কখনো ভারী না হয়।

সুকান্ত লিখেছিলেন, ‘সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়; জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার, তবু মাথা নোয়াবার নয়।’ সাতই নভেম্বর সেই মাথা না নোয়ানোরই দিন। আর ইথারে আজও ভেসে বেড়ায় এক সৈনিকের প্রিয় গান ‘প্রথম বাংলাদেশ, আমার শেষ বাংলাদেশ, জীবন বাংলাদেশ, আমার মরণ বাংলাদেশ।’

লেখক: ভিপি, কমনওয়েলথ স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন 


কেকে/সাশ
  



আরও সংবাদ   বিষয়:  ৭ নভেম্বর   বাংলাদেশের রূপকার   জিয়াউর রহমান   
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close