জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে প্রতিশ্রুতির কমতি নেই। প্রায় প্রতিটি জলবায়ু সম্মেলনেই নতুন লক্ষ্য, অর্থায়নের ঘোষণা এবং নানা কর্মপরিকল্পনা সামনে আসে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশ ও জনগোষ্ঠীর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো এখনো একই—প্রতিশ্রুত অর্থ কোথায়? ঘোষিত অর্থের কতটুকু বাস্তবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছেছে? আর এসব প্রতিশ্রুতির ফলে মানুষের জীবনে কতটা পরিবর্তন এসেছে? তাই আসন্ন কপ-৩১ সম্মেলনে নতুন নতুন প্রতিশ্রুতির চেয়ে আগে দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, অথযে জলবায়ু সংকটের জন্য দায়ী নয়, স্বল্পোন্নত ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ওপর তার দায় চাপানো যাবে না। জলবায়ু অর্থায়নে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত প্রধান অগ্রাধিকার।
কপ-২৯ সম্মেলনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ২০৩৫ সাল নাগাদ বছরে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন বা ৩০ হাজার কোটি ডলার জলবায়ু অর্থায়নের নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন উৎস থেকে এই অর্থের পরিমাণ বাড়িয়ে বছরে ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। অন্যদিকে কপ-৩০ সম্মেলনে বেলেম অভিযোজন সূচক (Belém Adaptation Indicators) গ্রহণ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে অভিযোজন অর্থায়ন তিন গুণ করার আহ্বান জানানো হয়। কাগজে-কলমে এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও প্রতিশ্রুতি, প্রকৃত প্রয়োজন এবং বাস্তবে অর্থ ছাড়ের মধ্যে ব্যবধান এখনো অনেক বেশি।
অভিযোজন অর্থায়নের ক্ষেত্রে এই সংকট সবচেয়ে স্পষ্ট। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) ২০২৫ সালের অ্যাডাপটেশন গ্যাপ রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০৩৫ সাল নাগাদ উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিযোজন কার্যক্রমে বছরে প্রায় ৩১০ থেকে ৩৬৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। অথচ ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক সরকারি অভিযোজন অর্থায়নের পরিমাণ ছিল মাত্র ২৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় অর্থায়নের ঘাটতি প্রায় ১২ থেকে ১৪ গুণ। এটি শুধু অর্থের ঘাটতি নয়; বরং জলবায়ু ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের বৈষম্য।
অর্থায়নের পরিমাণের পাশাপাশি এর ধরন নিয়েও রয়েছে গুরুতর উদ্বেগ। উন্নত দেশগুলোর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য মোট ১৩৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার জলবায়ু অর্থায়ন করা হয়েছে বা সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার ছিল সরকারি অর্থায়ন। কিন্তু এই অর্থের ৬৭ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৬৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার দেওয়া হয়েছে ঋণ হিসেবে। বিপরীতে অনুদানের পরিমাণ ছিল মাত্র ২৯ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার।
প্রশ্ন হলো, জলবায়ু সংকটের জন্য তুলনামূলকভাবে কম দায়ী দেশগুলোকে কেন সেই সংকট মোকাবিলায় নতুন করে ঋণের বোঝা নিতে হবে? যেসব দেশ ইতোমধ্যে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো বিপর্যয়ের মুখোমুখি, তাদের ওপর ঋণের চাপ বাড়ানো কোনোভাবেই ন্যায়সংগত হতে পারে না।
বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু অর্থায়নের ঘাটতি মানে উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানির সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়া, কৃষকের অভিযোজন সক্ষমতা দুর্বল থাকা, দুর্যোগের পর পুনরুদ্ধার বিলম্বিত হওয়া এবং খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়া। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা ও অর্থনীতিতে। ফলে জলবায়ু অর্থায়ন শুধু পরিবেশের বিষয় নয়; এটি উন্নয়ন, দারিদ্র্যবিমোচন, খাদ্যনিরাপত্তা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
এখানেই জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি সামনে আসে। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন (ইউএনএফসিসিসি) এবং প্যারিস চুক্তিতে অভিন্ন কিন্তু পৃথক দায়িত্ব ও সক্ষমতার নীতি (সিবিডিআর-আরসি) এবং দূষণকারীকে দায় বহনের নীতির স্বীকৃতি রয়েছে। প্যারিস চুক্তির ৯ নম্বর অনুচ্ছেদেও উন্নত দেশগুলোর অর্থায়নের দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে। এসব নীতির মূল কথা হলো, যেসব দেশের ঐতিহাসিক দায় বেশি এবং আর্থিক সক্ষমতা বেশি, তাদের দায়িত্বও বেশি হতে হবে। অথচ কম নিঃসরণকারী দেশগুলোকে অভিযোজনের জন্য ঋণ নিতে বাধ্য করা হলে জলবায়ু ন্যায়বিচারের মূল ধারণাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
উন্নয়নশীল দেশগুলো এমনিতেই ঋণের চাপে রয়েছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের হিসাবে, ২০২৫ সালে এসব দেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে। একই বছরে ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার। এমন পরিস্থিতিতে জলবায়ু অভিযোজনের জন্য নতুন ঋণ গ্রহণ অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে আরও দুর্বল করতে পারে।
তাই কপ-৩১ সম্মেলনে আমাদের অবস্থান হওয়া উচিত স্পষ্ট—নতুন প্রতিশ্রুতির চেয়ে বিদ্যমান অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন জরুরি। কপ-২৯-এ নির্ধারিত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য এবং জলবায়ু অর্থায়ন ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার উদ্যোগের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা, বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা, স্বচ্ছ প্রতিবেদন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে অভিযোজন ও সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন হতে হবে নতুন ও অতিরিক্ত, পর্যাপ্ত, পূর্বানুমানযোগ্য এবং অনুদানভিত্তিক।
শুধু অর্থের পরিমাণ বাড়ালেই হবে না, অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। জটিল আবেদনপ্রক্রিয়া, দীর্ঘ অনুমোদন এবং কঠিন শর্তের বেড়াজালে জলবায়ু অর্থায়ন আটকে থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কোনো উপকার হবে না। অর্থ পৌঁছাতে হবে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ও জলবায়ু আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর কাছে সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়। যাদের জীবন জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও মূল্যায়নে তাদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
একই কথা প্রযোজ্য লস অ্যান্ড ড্যামেজ বা ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার অর্থায়নের ক্ষেত্রেও। শুধু একটি তহবিল গঠন করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রয়োজন তাৎক্ষণিক। অথচ অর্থ পেতে যদি দীর্ঘ অনুমোদনপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তাহলে সেই অর্থের কার্যকারিতা কতটুকু থাকবে? ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার অর্থায়ন হতে হবে পর্যাপ্ত, নতুন ও অতিরিক্ত, দ্রুতপ্রাপ্তিযোগ্য, সরাসরি ব্যবহারযোগ্য এবং প্রধানত অনুদানভিত্তিক।
জলবায়ু অর্থায়নের পাশাপাশি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সীমা বজায় রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ। কপ-২৮-এর দুবাই ঐকমত্যে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ন্যায়সংগত, সুশৃঙ্খল ও সমতাভিত্তিক উত্তরণের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবায়নের অগ্রগতি এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। নতুন জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্প সম্প্রসারণ সীমিত করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়ানো, জ্বালানি দক্ষতা উন্নত করা এবং দেশভিত্তিক সময়সীমা ও পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ জরুরি।
তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার পরামর্শ দিলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। এ জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, প্রযুক্তি, দক্ষ জনশক্তি এবং বিকল্প জ্বালানি অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। উত্তরণ হতে হবে দ্রুত, ন্যায়সংগত এবং অর্থায়নসমর্থিত।
কপ-৩০ সম্মেলনে গৃহীত ৫৯টি বেলেম অভিযোজন সূচক অভিযোজন কার্যক্রমের অগ্রগতি পরিমাপের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে জাতীয় পর্যায়ের গড় পরিসংখ্যান দিয়ে অভিযোজনের প্রকৃত সাফল্য বোঝা সম্ভব নয়। উপকূলের কোনো চর, লবণাক্ততাপ্রবণ গ্রাম কিংবা ক্ষুদ্র কৃষকের পরিবারের জীবন কতটা বদলেছে, তা জানতে স্থানীয় পর্যায়ের তথ্য ও মানুষের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। মানুষের আয়, জীবিকা, খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতার পরিবর্তন পরিমাপ করতে হবে। অভিযোজন কার্যক্রমের সাফল্য কীভাবে নির্ধারিত হবে, সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণেও ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ থাকতে হবে।
শেষ পর্যন্ত কপ-৩১-এর সামনে প্রশ্ন একটাই—বিশ্ব আবারও কি বড় অঙ্কের অর্থ ও উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করবে, নাকি এবার বাস্তবায়নের পথে এগোবে? যে সংকটের জন্য দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো দায়ী নয়, সেই সংকটের মূল্য তাদের ঋণের বোঝা বাড়িয়ে পরিশোধ করতে বলা কোনোভাবেই ন্যায়বিচার হতে পারে না। আমরা করুণা চাই না; চাই দায়িত্বের স্বীকৃতি, বিদ্যমান অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন এবং ন্যায্য জলবায়ু অর্থায়ন।
কপ-৩১ থেকে তাই বার্তা হতে হবে দ্ব্যর্থহীন—স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর (এমভিসি) ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করা যাবে না। যে সংকট তারা সৃষ্টি করেনি, তার দায়ও তাদের কাঁধে চাপানো যাবে না। জলবায়ু অর্থায়নকে প্রতিশ্রুতির হিসাব থেকে বের করে মানুষের জীবনে পরিমাপযোগ্য পরিবর্তনের হাতিয়ারে পরিণত করতে হবে। কারণ জলবায়ু ন্যায়বিচার কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি ঐতিহাসিক দায় ও দায়িত্বের স্বীকৃতি।
লেখক: এম রেজাউল করিম চৌধুরী, নির্বাহী পরিচালক, কোস্ট ফাউন্ডেশন এবং এম এ হাসান, প্রধান, জলবায়ু পরিবর্তন বিভাগ, কোস্ট ফাউন্ডেশন
কেকে/সাশ