কক্সবাজারের টেকনাফে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত তিতাস শেখের মরদেহ সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে ফরিদপুরের নগরকান্দায় আনা হয়। বাদ মাগরিব জানাজা শেষে গ্রামের স্থানীয় কবরস্থানে নানীর কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়েছে।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সন্ধ্যায় লস্করদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে বাদ মাগরিব জানাজা সম্পন্ন হয়।
পদ্মা সেনানিবাসের ১৫ আর-ই রিভারাইন ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নের মেজর সোহেলের নেতৃত্বে সেনাসদস্যরা মরদেহ গ্রহণ করেন। পরে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামের বাড়িতে। মরদেহ পৌঁছানোর খবর ছড়িয়ে পড়লে স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় বাসিন্দারা বাড়িতে ভিড় করেন। এ সময় মা রেখা বেগম, বাবা আফজাল শেখ ও স্ত্রী সুমাইয়া আক্তারসহ স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
এ সময় নিহতের পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান সেনাবাহিনীর সদস্যরা। এ সময় তিতাসের ইউনিটের কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন সাজিদসহ সেনাবাহিনীর সদস্য, পরিবারের লোকজন, আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা উপস্থিত ছিলেন।
জানা যায়, সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর ক্যাপ্টেন সাজিদের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর সদস্যরা তিতাসের কবরে সামরিক মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করেন। এ সময় কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। সামরিক আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে সেনাসদস্যরা কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি আকাশের দিকে ছোড়েন। এভাবেই রাষ্ট্রীয় ও সামরিক মর্যাদায় শেষ বিদায় জানানো হয় টেকনাফে দায়িত্ব পালনকালে নিহত এই সেনাসদস্য তিতাস শেখকে।
তিতাসের মৃত্যুর পর থেকে শোকে ভেঙে পড়েছেন তার মা রেখা বেগম। গত বুধবার রাতে মুঠোফোনে মাকে অভিযানে যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন তিতাস। বলেছিলেন, ‘আগামীকাল বিকালে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাব, দোয়া কইরো মা।’ ছেলের এমন কথায় দোয়া করেছিলেন মা। কিন্তু সেটিই যে তাদের শেষ কথা হবে, তা বুঝতে পারেননি তিনি। বৃহস্পতিবার রাতে ছেলের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর থেকে কান্নায় থামছে না তার।
অন্যদিকে স্বামীকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার। চার বছর আগে পাশের গ্রামের সুমাইয়ার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তিতাসের। তাদের সংসারে কোনো সন্তান এখনো আসেনি। আগামী ডিসেম্বর মাসে স্ত্রীকে নিজের কর্মস্থলে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। সেই অপেক্ষায় ছিলেন সুমাইয়া। কিন্তু ডিসেম্বর আসার আগেই স্বামীকে হারাতে হলো। আর সন্তান হারানোর শোকে নির্বাক হয়ে পড়েছেন বাবা আফজাল শেখ।
তিতাসের পরিবারে সেনাবাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। তার বাবা আফজাল শেখ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য। বাবার পথ অনুসরণ করে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগ দেন তিতাস। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। তার ছোট ভাই আকরাম হোসেনও বর্তমানে সেনাবাহিনীতে কর্মরত। পরিবারের তিন সদস্যের সেনাবাহিনীতে যুক্ত থাকার মধ্যে তিতাসের এমন মৃত্যুতে স্বজনদের শোকের পাশাপাশি এলাকায়ও শোকের মাতম তৈরি হয়েছে।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে কক্সবাজারের টেকনাফে মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে যৌথবাহিনীর অভিযান চলছিল। এ সময় পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলি তিতাসের বুকের বাঁ পাশের ওপরের অংশে লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে লেদা আইআরসি রোহিঙ্গা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য বেসামরিক অ্যাম্বুলেন্সে রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) পাঠানো হয়। সেখানে জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ৮টা ৪৮ মিনিটে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
তিতাস সেনাবাহিনীর ১ বীর ইউনিটের সদস্য ছিলেন। তিনি টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন। দায়িত্ব পালনকালে অভিযানে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়। পরে তার মরদেহ রামু সিএমএইচে রাখা হয়। সামরিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুক্রবার হেলিকপ্টারে করে নিজ এলাকায় পাঠানো হয় তাকে।
নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন জানান, সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুক্রবার বিকালে হেলিকপ্টারে করে তিতাসের মরদেহ নগরকান্দায় পৌঁছায়। পরে গ্রামের বাড়িতে নেওয়ার পর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সামরিক মর্যাদায় গার্ড অব অনার ও শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্থানীয় গোরস্থানে নানীর কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়েছে।
কেকে/ এমএস