চোখে ঝাপসা দেখেন ৬৫ বছর বয়সী মো. ফরিদ। কোরআন পড়তে গেলেও অক্ষরগুলো স্পষ্ট দেখতে পান না। হাসপাতাল দূরে হওয়ায় নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া হয়ে ওঠে না তার। শুক্রবার বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার খবর পেয়ে প্রায় আধা কিলোমিটার পথ হেঁটে ফটিকছড়ির গোপালঘাটা উচ্চবিদ্যালয়ে হাজির হন তিনি। চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পাশাপাশি বিনা মূল্যে ওষুধও পেয়েছেন। এতে বেশ খুশি ফরিদ।
শুধু ফরিদ নন, তার মতো প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষের জন্য শুক্রবার বিদ্যালয়টি হয়ে উঠেছিল এক দিনের হাসপাতাল। শ্রেণিকক্ষের বদলে বসেছিল চিকিৎসকদের টেবিল, আর পাঠদানের জায়গায় ছিল রোগীদের দীর্ঘ সারি। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে চিকিৎসাসেবা।
স্থানীয় সমাজহিতৈষী হাজী মোমেনা ও আনোয়ার মুহুরীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাদের ইছালে ছওয়াবের উদ্দেশ্যে এ আয়োজন করে মোমেনা-আনোয়ার ফাউন্ডেশন। এতে সহযোগিতা করে রোটারি ক্লাব অব চিটাগাং এরিস্টোক্রেট ও নানুপুর পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার।
আয়োজকদের তথ্যমতে, ১৬ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ১ হাজার ১৯০ জন রোগী সরাসরি চিকিৎসাসেবা নেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিলেন চোখের রোগী—৩০৩ জন। এ ছাড়া সাধারণ রোগে ১৮৮, নাক-কান-গলার সমস্যায় ৬৫, চর্ম ও অ্যালার্জিতে ৪৪, শিশু রোগে ৫৬ এবং প্রসূতি ও স্ত্রীরোগে ৩২ জন চিকিৎসা নেন। হৃদরোগ, মেডিসিন, হাড়ভাঙা ও বাতব্যথাসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসাও দেওয়া হয়।
চোখের চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের মধ্যে ৭৮ জনকে চশমা দেওয়া হয়। ছানি অস্ত্রোপচারের জন্য বাছাই করা হয় ২০ জনকে। তাদের পরবর্তী সময়ে বিনা মূল্যে অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান আয়োজকেরা। এ ছাড়া আরও দেড় শতাধিক মানুষ বিভিন্নভাবে সেবা নেন। দিন শেষে রোগীদের মধ্যে প্রায় তিন লাখ টাকার ওষুধ বিনা মূল্যে বিতরণ করা হয়।
আয়োজন নির্বিঘ্ন করতে ৪৫ জন স্বেচ্ছাসেবক দায়িত্ব পালন করেন। বিদ্যালয়ের স্কাউট দলের সদস্যরাও রোগীদের শৃঙ্খলা রক্ষা ও সেবা প্রদানে সহযোগিতা করেন। চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি দুপুরে আয়োজকদের বাড়িতে জেয়াফতের আয়োজন করা হয়। সেখানে প্রায় দুই হাজার মানুষের খাবারের ব্যবস্থা ছিল।
পুরো আয়োজনের তত্ত্বাবধানে ছিলেন নবজাতক ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জয়নাল আবেদীন মুহুরী। তিনি বলেন, ‘মোমেনা-আনোয়ার ফাউন্ডেশন সব সময় ভালো কাজের পাশে থাকবে। প্রান্তিক এলাকার মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দিতে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে আমরা মানবিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত আছি, ভবিষ্যতেও থাকব।’
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ছৈয়দুল আলম কোরাইশী বলেন, ‘গরিব ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ফাউন্ডেশনটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সারা বছরই তারা বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে সক্রিয় থাকে। এবারের উদ্যোগও প্রশংসার দাবিদার।’
সেবাগ্রহীতা মো. আনোয়ার বলেন, ‘এই আয়োজন প্রমাণ করে, মানবতা এখনো হারিয়ে যায়নি। মানুষের পাশে মানুষ দাঁড়াচ্ছে, এটাই বড় কথা। সেবা মানুষের কাছে নীরবে পৌঁছে যাক, এটাই প্রত্যাশা।’
বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম শাকিল, প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ ফারুক, রোটারি ক্লাবের সদস্য এবং বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম পরিদর্শন করেন।
চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফেরার সময় মো. ফরিদ বলেন, ‘এই সেবায় মানুষ উপকৃত হয়েছে। একই সঙ্গে মানবিকতা ও উদারতার একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে।’
কেকে/ এমএস