রোববার, ৮ নভেম্বর ২০২৬,
২৪ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: ● সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ বাংলাদেশির মৃত্যু      ● ৭ নভেম্বরের বৈপ্লবিক চেতনাই হোক আগামীর প্রেরণা: প্রধানমন্ত্রী      ● দুর্নীতির অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান রাষ্ট্রপতির      ● ৭ নভেম্বর দেশের সব পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা      ● সীমান্তের ওপার থেকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে: প্রধানমন্ত্রী      ● মোংলায় পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      ● হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার ইকবাল সোবহান, মুচলেকায় মুক্ত রাজীব ঘোষ      
খোলাকাগজ স্পেশাল
অপরাধের রেড জোন খুলনা
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশ: রোববার, ৮ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:৩৭ এএম আপডেট: ০৮.১১.২০২৬ ১০:৪২ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে শান্ত শহর খুলনা। দিন যত যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ততই অবনতি হচ্ছে। প্রকাশ্যে দিনে-দুপুরে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। বাড়ছে খুন, চাঁদাবাজি, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণ, লুটপাটের মতো ঘটনা। পথে-ঘাটে হানা দেওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও প্রতিনিয়ত হানা দিচ্ছে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা। 

সব শেষ গতকালও খুলনা শহরের নিউ অ্যাপোলো ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চায়নিজ কুড়াল নিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর চালায় দুর্বৃত্তরা। এ সময় রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অপরাধের সব সূচকই ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে অস্থিরতা বিরাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও কঠোর অবস্থানের মাধ্যমে তারা দ্রুত এর সমাধান চান।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বেশির ভাগ দেশের বাইরে অবস্থান করছে। সেখানে থেকেই তারা খুলনার অপরাধজগতের কলকাঠি নাড়ছে। তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালালেও তাদের দমানো যাচ্ছে না। 

বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বারবার জামিন পেয়ে বেপরোয়া হচ্ছে অপরাধীরা। খুলনায় হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় খোদ পুলিশ প্রশাসনও উদ্বিগ্ন। ছিনতাইয়ের কবল থেকে রক্ষা পায়নি পুলিশ প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরাও। লোকচক্ষুর আড়ালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখকে উপেক্ষা করে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে একের পর এক খুন করে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যাচ্ছে সন্ত্রাসীদের গডফাদাররা।

চায়নিজ কুড়াল হাতে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ব্যাপক ভাঙচুর :

খুলনা নগরের নিউ অ্যাপোলো ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টারে ঢুকে চায়নিজ কুড়াল দিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছে পাঁচ যুবক। হামলাকারী যুবকরা ওই প্রতিষ্ঠানের কাচের দরজা-জানালা, এসি, টেলিভিশন, অভ্যর্থনাকক্ষের কাউন্টারসহ বিভিন্ন আসবাব ভাঙচুর করে। 

শনিবার বেলা ১টার দিকে শহরের খানজাহান আলী সড়কের পিটিআই মোড় এলাকার প্রতিষ্ঠানটিতে এ হামলা চালানো হয়। এ সময় প্রতিষ্ঠানের এক কর্মীর মুঠোফোনও নিয়ে যায় হামলাকারী যুবকরা। হামলার সময় ভেতরে রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে এক মাসের ব্যবধানে খুলনা শহরের চতুর্থ চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা ঘটল। হামলায় অংশ নেওয়া পাঁচজনের মধ্যে দুজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। ওই দুইজনকে আগেও দেশি অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সম্প্রতি তারা জামিনে মুক্তি পেয়েছে।

খুলনায় এক দিনে তিন ঘটনা :

পাঁচ যুবক চায়নিজ কুড়াল নিয়ে ডায়াগনস্টিক সেন্টারটিতে ঢুকে ভাঙচুর শুরু করে। আকস্মিক এ ঘটনায় ভেতরে থাকা রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হামলাকারী যুবকদের একজন পুরো ঘটনার ভিডিও ধারণ করে। ভাঙচুর শেষে তারা নিজেরাই সেখান থেকে চলে যায়। 

নিউ অ্যাপোলো ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন জানান, কয়েক দিন আগে শহরের টুটপাড়ার নূর আজিমের বাহিনী পরিচয় দিয়ে একজন তাকে ফোন করে। তিনি ওই নামে কাউকে চেনেন না। এরপর অপর প্রান্ত থেকে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। সিসিটিভির ফুটেজে দেখা গেছে, প্রথমে মুখে মাস্ক পরতে পরতে একজন যুবক চাইনিজ কুড়াল নিয়ে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ভেতরে ঢুকছে। এরপর আরও চারজন কুড়াল নিয়ে ভেতরে ঢোকে। ঢোকার পর তারা ভাঙচুর চালাতে থাকে।

খুলনা মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (খুলনা জোন) শফিকুল ইসলাম বলেন, হামলায় অংশ নেওয়া পাঁচজনের মধ্যে দুজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। ওই দুইজনকে আগেও দেশি অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সম্প্রতি তারা জামিনে মুক্তি পেয়েছে।

আগেও তিন ক্লিনিকে হামলা :

গত অক্টোবরের মাঝামাঝি নগরের রয়েল মোড়ের সিটি কুইন্স ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এরপর ২৪ অক্টোবর নগরের সন্ধানী ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্সে দেশি অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় মুখোশধারী ৮ থেকে ১০ জন। তারা চিকিৎসকদের চেম্বারের সামনের কাচ, চেয়ার-টেবিল ও ক্যাশ কাউন্টার ভাঙচুর করে। যাওয়ার সময় ক্লিনিকের বাইরে ফাঁকা গুলিও ছোড়ে। ৩ নভেম্বর সন্ধ্যায় নগরের শামসুর রহমান সড়কের রংধনু ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে হামলার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে কোনো মামলা করা হয়নি।

এসব বিষয়ে খুলনা মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (খুলনা জোন) শফিকুল ইসলাম বলেন, কিছু ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা পুলিশকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেন না। তবে সন্ধানী ক্লিনিকের বাইরে গুলির খোসা পাওয়ার ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করেছে। ওই মামলায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

১০ মাসে ৭৭ জন হত্যার শিকার :

খুলনা মহানগর ও জেলায় চলতি বছরের প্রায় ১০ মাসে ৭৭ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু গুলি করে হত্যা করা হয়েছে ২৫ জনকে। মহানগর এলাকায় ৩৯ ও জেলা পুলিশের আওতাধীন এলাকায় ৩৮ জন নিহত হয়েছেন। 

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের ৫ নভেম্বর পর্যন্ত নগর এলাকায় ৩৭টি হত্যা মামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩৯ জন। এর আগে ২০২১ সালে ১৫টি, ২০২২ সালে ১৯টি, ২০২৩ সালে ১৭টি, ২০২৪ সালে ২৯টি ও ২০২৫ সালে ৩৪টি হত্যা মামলা হয়েছিল।

নেপথ্যে মাদক, অবৈধ অস্ত্র, রাজনৈতিক ও গ্যাং আধিপত্য :

খুলনায় এসব হত্যার নেপথ্যে রয়েছে— মাদক কারবার, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, পূর্বশত্রুতা এবং সন্ত্রাসী গ্রুপের অভ্যন্তরীণ বিরোধ। স্থানীয় রনি চৌধুরী বাবু, শেখ পলাশ, নূর আজিম, আশিক, হুমা, টেংকি শাওন, আরমান, শাকিল ও নাসিম গ্রুপসহ অসংখ্য গ্রুপ এসব হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে। আবার সীমান্তপথে অবৈধ অস্ত্র প্রবেশ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ পর্যন্ত ৫০টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করলেও বর্তমানে মহানগরী ও জেলায় প্রায় ৩০০টি অবৈধ অস্ত্র সক্রিয় রয়েছে বলে জানা গেছে।

নিরাপত্তাহীনতায় নগরবাসী :

খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি এবং ধারাবাহিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে নগরবাসীর মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে অপরাধী ও মামলার আসামিরা গ্রেপ্তার হলেও খুব দ্রুত জামিনে বেরিয়ে তারা আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কাটছে না।

এসব বিষয়ে খুলনা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া গণমাধ্যমকে বলেন, বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ডের পেছনে মাদক-সম্পর্কিত বিরোধ রয়েছে। আধিপত্য বিস্তারসহ রাজনৈতিক কারণেও হত্যার ঘটনা ঘটছে। পুলিশ তালিকাভুক্ত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে। কিন্তু তাদের কেউ কেউ জামিনে বেরিয়ে আবার বেপরোয়া হয়ে ওঠে। সাধারণ মানুষও অপরাধীদের বিরুদ্ধে কথা বলতে চান না। এটিও বড় সমস্যা। তবে সন্ত্রাসীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  অপরাধ   রেড জোন   খুলনা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close