রোববার, ৮ নভেম্বর ২০২৬,
২৪ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: ● সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ বাংলাদেশির মৃত্যু      ● ৭ নভেম্বরের বৈপ্লবিক চেতনাই হোক আগামীর প্রেরণা: প্রধানমন্ত্রী      ● দুর্নীতির অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান রাষ্ট্রপতির      ● ৭ নভেম্বর দেশের সব পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা      ● সীমান্তের ওপার থেকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে: প্রধানমন্ত্রী      ● মোংলায় পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      ● হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার ইকবাল সোবহান, মুচলেকায় মুক্ত রাজীব ঘোষ      
খোলাকাগজ স্পেশাল
কর্মীদের চাঙ্গা রাখতে ডিসেম্বরে ফেরার বুলি
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশ: রোববার, ৮ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:৫১ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চলতি বছরের ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এটিকে দলীয় নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করার এবং আদালতে আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি হিসেবে দাবি করা হচ্ছে। তবে সমালোচক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একে কেবলই রাজনীতিতে টিকে থাকার একটি ‘কৌশল’ বা ফাঁকা ‘বুলি’ হিসেবে দেখছেন। তবে দেশে থাকা নেতাকর্মীরা শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণায় ক্ষমতা প্রদর্শন করছেন। তারা প্রায় প্রতিদিনই ঝটিকা মিছিল, অগ্নিসংযোগ করছেন।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ রয়েছে। দলটির শীর্ষ নেতাদের অনেকেই গ্রেপ্তার অথবা আত্মগোপনে আছেন। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে একটি আশার আলো সঞ্চার করার এবং দলটির রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার একটি বড় প্রয়াস বলে মনে করা হচ্ছে।

এদিকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা, বাতিল হওয়া পাসপোর্ট এবং তীব্র প্রতিকূল রাজনৈতিক সমীকরণের মুখে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা বারবার একই অবস্থান তুলে ধরছেন যে, তিনি ডিসেম্বরেই দেশে ফিরবেন। তার সঙ্গে দলের নেতাকর্মীরা ফিরবেন বলে শোনা যাচ্ছে। 

ইতোমধ্যে শেখ হাসিনার ফেরার পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতারা ভারতে ফিরছেন বলে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। তাদের অনেকে কলকাতায় জড়ো হচ্ছেন। হাসিনার সঙ্গে দেশে ফেরার আশায় সেখানে অবস্থান করছেন তারা। বিদেশে থাকা আরও অনেক নেতাকর্মী হাসিনার ফেরার দিন বাংলাদেশে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দেশে ফিরে আদালতে আইনি লড়াইয়ের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

কলকাতায় অবস্থান করা আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর দুই সদস্য, একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং দুই সাংগঠনিক সম্পাদক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। 

তবে বাস্তবতা ভিন্ন। এর আগে অনেকে অনেক ঘোষণা দিলেও তা কোনো কাজে আসেনি। ঢাকার রাজপথে ঝটিকা মিছিল, অগ্নিসংযোগের নির্দেশনা দিলেও শেষে অনেক নেতার সহযোগিতা মাঠের নেতাকর্মীরা পাননি। ফলে ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে পলাতক ঐ নেতারা মাঠ গরম রাখতে ফাঁকা বুলি ছেড়ে যাচ্ছেন।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক একটি গণমাধ্যমক অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা আবারও জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, এমনকি তার মৃত্যুদণ্ডও কার্যকর হতে পারে। কিন্তু প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এবং মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়ে তিনি আসলে দেশে ফিরবেন কি না- তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করছেন তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা। 

হাসিনার ফেরা নিয়ে স্ট্যান্টবাজি 

এমন পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার ফেরার ক্ষেত্রে বড় বিষয় বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা। আর সেই বিবেচনায় তার ফেরা রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি বলে মনে করছেন রাজনীতিকদের অনেকেই। তারা বলছেন, পলাতক নেতাকর্মীদের কেউই হাসিনার সঙ্গে আসার সাহস করবেন না। 

কারণ, পলাতক নেতাকর্মীদের কেউ কেউ সাজাপ্রাপ্ত, আবার কারও বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। দেশে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা তার দল আওয়ামী লীগকে হঠাৎ ঝটিকা মিছিল করে শুধু তাদের অস্তিত্বের জানান দেওয়ার চেষ্টা করছে। এর বাইরে তারা সেভাবে প্রকাশ্যে বড় কোনো সাংগঠনিক শক্তি দেখাতে পারছে না।

‘ষড়যন্ত্র তত্ত্বেই’ আটকা আ.লীগ, নেই অনুশোচনা

তারা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের শাসনের পতনের প্রেক্ষাপট নিয়ে তারা এখনো ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্বেই’ আটকে আছে; অনুশোচনার পথেও নেই তারা। এই বিষয়টিকে বড় রাজনৈতিক ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করছে তাদের বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষ। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর থেকেই আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে তাদের বিরোধী দলগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে দেশের রাজনীতির মাঠ।

বন্দি বিনিময়ই ফেরার পথ হাসিনার

রাজনীতির বাইরে আইনগত দিক থেকেও জটিলতার প্রশ্ন উঠছে। বিএনপি সরকার ভারতের সঙ্গে অভিযুক্ত, ফেরারি আসামি বা বন্দি বিনিময়ের প্রত্যর্পণ চুক্তির মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে ফেরত আনতে চায়। আইনের এই প্রক্রিয়ায় না গেলে শেখ হাসিনার নিজের ঘোষণা অনুযায়ী তার ফেরার জন্য প্রয়োজন হবে বাংলাদেশ সরকারের পাসপোর্ট বা ট্রাভেল পাস। সেটি নির্ভর করবে বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর। এরই মধ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের তরফ থেকেও বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। 

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে ভারত থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সাধারণ পাসপোর্ট বা ট্রাভেল পাস ইস্যু করা হবে না। গত বৃহস্পতিবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধিদলকে বিদায় জানানোর পর সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, তাকে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। 

রাজপথের দখলে বিএনপি-জামায়াত-এনসিপি

গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক মাঠ মূলত বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং জুলাই ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের দল এনসিপির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক মাঠ মূলত বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং জুলাই ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের দল এনসিপির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রকাশ্য রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় ঝটিকা মিছিল ছাড়া বড় কোনো সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ দলটির সামনে নেই। তার ওপর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং শত শত মামলা তার ফেরার পথকে করে তুলেছে আরও বেশি কণ্টকাকীর্ণ। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষরো বলছেন, শেখ হাসিনার জন্য একেবারে বৈরী রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সেখানে তার নিরাপত্তার প্রশ্ন আছে। একইসঙ্গে আছে ফাঁসির রায়। এমন প্রেক্ষাপটেই দেশের রাজনীতিতে তিনি সত্যিই সেই ঝুঁকি নেবেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের নেতারাও সভা-সমাবেশে বক্তব্যে এমন সন্দেহের কথা বলছেন। 

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘শেখ হাসিনা তার কর্মীদের হতাশা কাটাতে দেশে ফেরার কথা বলছেন। কিন্তু তিনি ঝুঁকি নিয়ে ফিরবেন না।’ রিজভী বলেন, ‘শেখ হাসিনা মূলত গ্রেপ্তারের আইনি ঝুঁকি এবং নিজের কৃতকর্মের বিচার এড়াতেই দেশ ছেড়েছিলেন। ফলে তিনি বড় কোনো ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে বাস্তবে দেশে ফিরে আসবেন—এমন সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।’ 

যদিও আওয়ামী লীগ নেতারা দাবি করছেন, নেত্রী নিজের বয়স, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং দলের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে যে কোনো ঝুঁকি নিয়েই ডিসেম্বরে ফিরবেন। আবার শেখ হাসিনা কোনো ডিসেম্বরেই আর দেশে ফিরবেন না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন। গত ৮ অক্টোবর ঝিনাইদহ শহরের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়েছেন আত্মরক্ষার জন্য, বাংলাদেশে ফেরার জন্য নয়। যে একবার পালিয়ে গেছে, সে আর কখনো ফিরবে না। কোনো ডিসেম্বরেই আর ফিরবে না।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, দিল্লিতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরতে পারবে না। গত শুক্রবার চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে এক মাহফিলে তিনি বলেন, গণহত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা অনুশোচনা প্রকাশ না করা পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষ তাদের রাজনীতিতে ফিরতে দেবে না।

বাংলাদেশ সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, ট্রাভেল পাস বা পাসপোর্ট ছাড়া সীমান্ত বা বিমানপথে তার পক্ষে সহজে প্রবেশের সুযোগ নেই। সরকারের পক্ষ থেকে যেহেতু ট্রাভেল পাস বা সাধারণ পাসপোর্ট ইস্যু করার সুযোগ নেই বলে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, ফলে তাকে দেশে ফিরতে হলে সম্পূর্ণভাবে আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া বা বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির ওপরই নির্ভর করতে হবে। অন্যথায় সমঝোতা ছাড়াই আকস্মিক কোনো পদক্ষেপ নিলে তাকে দেশে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। 

কারণ, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ইতোমধ্যেই তার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে এবং রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার নির্ধারিত সময়সীমাও পেরিয়ে গেছে। ফলে ফেরা মাত্রই তাকে আইন অনুযায়ী কাস্টোডিতে নিতে হবে।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  কর্মী   ডিসেম্বর   ফেরার বুলি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close