স্বাধীনতার পর প্রথম এক দশকে সদ্য যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে সামাজিক বন্ধনগুলো ছিল বেশ জোরালো। তবে সেই সময় আইনি কাঠামোর দুর্বলতা এবং নথিবদ্ধকরণের অভাবের কারণে শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত বহু অপরাধ আড়ালে থেকে যেত। সত্তরের দশকে গ্রামীণ সমাজে সালিশি ব্যবস্থার মাধ্যমে অনেক ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া হতো, যেখানে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো সামাজিক মর্যাদার ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পেত না। আশির দশকে এসে নগরায়ণ ও শিল্পায়নের প্রাথমিক ধাক্কায় পারিবারিক কাঠামোতে প্রথম ভাঙন ধরতে শুরু করে এবং এই সময়েই শিশুশ্রম ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলো দৃশ্যমান হতে থাকে। এ দশকের শেষের দিকে আইনি সচেতনতা কিছুটা বাড়লেও বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যেত, যা সমাজবিজ্ঞানীদের মতে অপরাধের বীজ বপনের প্রথম পর্যায়। নব্বইয়ের দশকে এসে অপরাধের ধরন আরও হিংস্র হতে শুরু করে এবং এই সময়েই নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রথম কঠোর আইন প্রণয়নের দাবি জোরালো হয়। ১৯৯৫ সালে ইয়াসমিন হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, তা শিশুদের সুরক্ষার বিষয়টিকেও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণীর মূল আলোচনায় নিয়ে আসে।
একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে, বিশেষ করে ২০০০ সালে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’ পাসের মাধ্যমে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলেও অপরাধের গ্রাফ নিচের দিকে নামেনি। ২০০০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে গণমাধ্যমে শিশু ধর্ষণের খবরগুলো আরও বেশি প্রকাশিত হতে থাকে, যা প্রমাণ করে যে কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও প্রয়োগের অভাবে অপরাধীরা বেপরোয়া ছিল। ২০১০ থেকে ২০২০ সালের এই এক দশকে প্রযুক্তির অবাধ বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে শিশু নির্যাতনের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়তে শুরু করে, যা এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর মতো মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রতি বছর গড়ে ৭০০ থেকে ১০০০ শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। করোনাকালীন সময়ে, বিশেষ করে ২০২০ ও ২০২১ সালে যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল, তখনো শিশুরা ঘরের ভেতরেই সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ হয়ে পড়েছিল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে ৮১৮টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩১ শতাংশ বেশি ছিল এবং এর সিংহভাগই ঘটেছিল চেনা ও পারিবারিক পরিবেশে।
২০২৩ সালের পরবর্তী সময়ে চিত্রটি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে, যেখানে কেবল বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্যানুযায়ী এক বছরেই শত শত কন্যাশিশু যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের শিকার হয় এবং বহু শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এ পরিসংখ্যানগুলো প্রমাণ করে যে, সমাজ থেকে অপরাধীদের ভয় এবং নৈতিকতা পুরোপুরি উধাও হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক ২০২৫ ও ২০২৬ সালের পরিসংখ্যান পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, শিশু নির্যাতনের ঘটনা এখন মহামারির আকার ধারণ করেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাম্প্রতিক ডেটা অনুযায়ী, পূর্ববর্তী বছরগুলোর তুলনায় শিশু ধর্ষণের হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে ভুক্তভোগীদের একটি বড় অংশের বয়স মাত্র শূন্য থেকে বারো বছরের মধ্যে। গত ৫৫ বছরের এই রক্তভেজা ইতিহাস স্পষ্ট করে দেয় যে, সমাজ হিসেবে আমরা আমাদের সন্তানদের একটি নিরাপদ পৃথিবী দিতে ব্যর্থ হয়েছি।
রামিসা হত্যার মূল আসামি সোহেল রানার দিকে তাকালে সমাজবিজ্ঞান ও অপরাধবিজ্ঞানের প্রথম যে কারণটি স্পষ্ট হয়, তা হলো মারাত্মক মাদকাসক্তি। মাদক কেবল মানুষের বিবেককে অবশ করে না, বরং তাকে এক চরম হিংস্র পশুতে পরিণত করে। দ্বিতীয় প্রধান কারণটি হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা। বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকা, দুর্বল তদন্ত এবং উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে অপরাধীরা যখন জামিনে বেরিয়ে আসে। তৃতীয়ত, আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফি বা বিকৃত অনলাইন কনটেন্টের সহজলভ্যতা মানুষের মনস্তত্ত্বকে মারাত্মকভাবে কলুষিত করছে। চতুর্থ কারণটি লুকিয়ে আছে আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের মধ্যে, যেখানে শৈশব থেকেই নৈতিক শিক্ষার অভাব প্রকট। যৌথ পরিবারের বিলুপ্তি এবং যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততায় অভিভাবকরা সন্তানদের গুণগত সময় দিতে পারছেন না।
পঞ্চমত, অপরাধীদের মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতি এবং লৈঙ্গিক ক্ষমতার অপপ্রয়োগ এখানে একটি বড় ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়াও সামাজিক উদাসীনতা ও লোকলজ্জার ভয়, যা অপরাধীদের আড়াল করতে সাহায্য করে। অনেক সময় পরিবারের চেনা বা নিকটাত্মীয় কেউ এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকলে, সামাজিক সম্মানের কথা চিন্তা করে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়া হয়। ভুক্তভোগী পরিবারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অসচ্ছলতা বিচার পাওয়ার পথকে অবরুদ্ধ করে দেয়। প্রভাবশালী অপরাধী চক্র অনেক সময় অর্থ ও পেশিশক্তির জোরে দরিদ্র ভুক্তভোগী পরিবারকে মামলা তুলে নিতে বা আপস করতে বাধ্য করে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কিছু সদস্যের গাফিলতি এবং সময়মতো ফরেনসিক বা বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহে অবহেলাও বড় কারণ। এই অন্ধকার মহামারি থেকে সমাজকে বাঁচাতে হলে সর্বপ্রথম বাংলাদেশ সরকারকে একটি সমন্বিত এবং যুদ্ধকালীন জরুরি পরিকল্পনার মতো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে বিশেষ ট্রাইব্যুনালগুলোর সংখ্যা বাড়িয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তাদের প্রথাগত তদন্ত পদ্ধতির বাইরে এসে আধুনিক ফরেনসিক ও ডিএনএ প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো অপরাধী পার না পায়। ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক চাপ উপেক্ষা করে মামলা দ্রুত রেকর্ড করা এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে হয়রানিমুক্ত আইনি নিরাপত্তা দেওয়া পুলিশের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত। প্রশাসন তথা বিচার বিভাগীয় ও নির্বাহী কর্মকর্তাদের প্রতিটি মামলার গতিবিধি কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং উচ্চ আদালতে আপিল বা ডেথ রেফারেন্সের প্রক্রিয়াগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রায়োরিটি বেঞ্চ গঠনের ব্যবস্থা করতে হবে। আইনি দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি যত দ্রুত কার্যকর করা যাবে, অপরাধীদের মনে আইনের ভয় তত দ্রুত ফিরবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল জিপিএ-৫ অর্জনের কারখানা না বানিয়ে শিশুদের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের পাঠশালা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি স্কুলে নিয়মিতভাবে ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’ সংক্রান্ত সচেতনতামূলক সেশন পরিচালনা করতে হবে। মসজিদ ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজে নৈতিক জাগরণ সৃষ্টিতে এক বিশাল ভূমিকা পালন করতে পারে। জুমার খুতবায় এবং ধর্মীয় আলোচনায় নারী ও শিশুর অধিকার, মানবতাবোধ এবং পর্নোগ্রাফি ও মাদকের কুফল সম্পর্কে ধর্মীয় অনুশাসনের আলোকে বয়ান দিলে তা মানুষের অন্তরে গভীর প্রভাব ফেলবে। স্থানীয় সরকার তথা ইউনিয়ন পরিষদ ও সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের নিজ নিজ এলাকায় প্রতিরোধ কমিটি গঠন করতে হবে। পাড়া-মহল্লায় বখাটেদের আড্ডা বন্ধ করা, মাদকের আখড়া উচ্ছেদ করা এবং বহিরাগত বা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি বাড়াতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও নৈশকালীন প্রহরার ব্যবস্থা করতে হবে। সাধারণ জনসাধারণ ও সমাজকে ‘কারো ঘরের বিষয়’ ভেবে চুপ থাকার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কোথাও কোনো অন্যায় বা নির্যাতন দেখলে সঙ্গে সঙ্গে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং অপরাধীকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করার মতো বিকৃত মানসিকতা পরিহার করে সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে।
সর্বশেষে, ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারকে চরম মানসিক ট্রমার মাঝেও সাহসের পরিচয় দিতে হবে এবং কোনো সামাজিক চাপের মুখে আপস না করে অপরাধীর শেষ শাস্তি পর্যন্ত আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব হলো এই ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে সম্পূর্ণ আইনি, মানসিক এবং পুনর্বাসন সহায়তা প্রদান করা, যেন তারা নিজেদের একাকী ও অসহায় না ভাবে। আমরা যদি আজ রামিসার আত্মার আর্তনাদ শুনেও জেগে না উঠি, তবে এই ক্রন্দন সত্যিই বৃথা হয়ে যাবে এবং আগামীকাল হয়তো আমাদের নিজেদের কোনো সন্তান এই পাশবিকতার শিকার হবে। শিশুরাই একটি দেশের আলো, তাদের শৈশবকে এভাবে লালসার বধ্যভূমিতে পরিণত হতে দেওয়া যায় না। তাই এখনই সময় রাষ্ট্র, সমাজ, প্রশাসন এবং পরিবার— সবাইকে এক সুতোয় গেঁথে একটি নিশ্ছিদ্র সুরক্ষাবলয় তৈরি করার। রামিসার বিয়োগান্তক পরিচ্ছেদটি যেন আমাদের ইতিহাসের শেষ অন্ধকার অধ্যায় হয় এবং আগামী দিনের সূর্য যেন প্রতিটি শিশুর জন্য এক নিরাপদ, আনন্দময় ও পৈশাচিকতামুক্ত বাংলাদেশের বার্তা নিয়ে আসে।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক
কেকে/এলএ