দেশের ১২২টি রাষ্ট্রীয় ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত দায়ের পরিমাণ সাড়ে আট লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার তথ্য কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় উঠে আসা এ চিত্র আমাদের অর্থনীতির একটি গুরুতর কাঠামোগত দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের পর নতুন করে সমন্বিত ঝুঁকি বিশ্লেষণ না হলেও বাস্তবে এই দায়ের অঙ্ক আরও বেড়ে দশ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। অর্থাৎ প্রকৃত চিত্র প্রকাশিত হিসাবের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে। এ সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলা অব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির পুঞ্জীভূত ফল আজকের এ ভয়াবহ ঋণভার।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি, বিমান ও শিল্প খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা সবচেয়ে করুণ। এসব খাতে শুল্ক বা মূল্য সমন্বয়ে দীর্ঘসূত্রতা, রাজনৈতিক বিবেচনায় সিদ্ধান্তহীনতা এবং তদারকির অভাব মিলিয়ে লোকসানের বোঝা ক্রমাগত ভারী হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ীই মূল্যায়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় ৪০ শতাংশ উচ্চ বা খুব উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে, যা প্রশাসনিক ব্যর্থতার একটি স্পষ্ট স্বীকারোক্তি।
আরও উদ্বেগজনক দিক হলো স্বচ্ছতার অভাব। নিয়ম অনুযায়ী প্রায় চারশর মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও বেশির ভাগই তা করেনি। এমনকি ঝুঁকি বিশ্লেষণের আওতায় থাকা মূল প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকেই সময়মতো হিসাব হালনাগাদ করেনি। একটি রাষ্ট্র যখন নিজের প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আর্থিক অবস্থাই জানে না, তখন কার্যকর নীতি প্রণয়ন কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। জবাবদিহির এ সংকট শুধু হিসাবরক্ষণের ত্রুটি নয়, এটি সুশাসনের সামগ্রিক ঘাটতিরই প্রতিফলন।
স্বস্তির বিষয় হলো, সরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণে কিছুটা লাগাম টানা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত এক বছরে সরকারি খাতের মোট বৈদেশিক দায় কিছুটা কমেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈদেশিক ঋণও নিম্নমুখী। এটি আর্থিক স্থিতিশীলতার দিক থেকে ইতিবাচক লক্ষণ। কিন্তু বৈদেশিক ঋণ কমলেও অভ্যন্তরীণ দায় ও পরিচালন-অদক্ষতার সমস্যা যদি অমীমাংসিত থেকে যায়, তবে এ স্বস্তি সাময়িক হতে বাধ্য।
এখানে মূল প্রশ্নটি হলো এই বিশাল দায় শেষ পর্যন্ত বহন করে কে? উত্তর সহজ : রাষ্ট্র, অর্থাৎ করদাতা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশ এ দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে জড়িত, যা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত করছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি রুদ্ধ করছে। উন্নয়ন বাজেটের বরাদ্দ কাটছাঁট করে এ দায় মেটাতে হলে তার প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়, যার ফল ভোগ করতে হবে এমন মানুষদের, যাদের এ অব্যবস্থাপনায় কোনো ভূমিকাই নেই।
আমরা মনে করি, শুধু ঝুঁকি চিহ্নিত করেই দায় শেষ হয় না। প্রয়োজন দ্রুত ও কাঠামোগত সংস্কার। প্রতিটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন নিয়মিত ও বাধ্যতামূলকভাবে প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন দক্ষতা বাড়াতে রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে গিয়ে পেশাদার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে যে আইনি জটিলতা রয়েছে, তার সহজ ও যৌক্তিক সমাধান জরুরি।
সর্বোপরি, যেসব প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে টিকে আছে, সেগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে স্পষ্ট নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে পুনর্গঠন, সংযুক্তিকরণ বা প্রয়োজনে বেসরকারিকরণের প্রশ্নেও নির্মোহভাবে ভাবতে হবে। অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষায় বৈদেশিক ঋণ কমানোর যে প্রয়াস দেখা যাচ্ছে, তা প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু ঘরের মধ্যে জমে থাকা এ বিপুল দায়ের বোঝা সামলাতে না পারলে সেই অর্জন টেকসই হবে না। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা এখন আর ঐচ্ছিক বিষয় নয় এটি জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থেই একটি অপরিহার্য শর্ত।
কেকে/ এমএস