শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬,
২৭ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরের ওপর গুরুত্ব রাষ্ট্রপতির      বন্যায় ভাসছে ২০ জেলা      আ. লীগকে সক্রিয় করতে হাসিনার নতুন চাল      হরমুজে হামলা বন্ধে ইরানের প্রকাশ্য প্রতিশ্রুতি চায় যুক্তরাষ্ট্র      আজ বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস      ঢাকাসহ ১৬ অঞ্চলে ঝড়বৃষ্টির আভাস      চট্টগ্রামের সাত উপজেলায় সেনা মোতায়েন      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
জলাবদ্ধতার খেসারত আর কতকাল?
ওসমান গনি
প্রকাশ: শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬, ১১:২৩ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

বাংলাদেশে বন্যা, জলাবদ্ধতা ও মানুষের ভোগান্তি—এটা কোনো নতুন বিষয় নয়। আমরা বহু বছর ধরে দেখছি, বর্ষা এলেই দেশের শহরে বসবাসকারী মানুষগুলো অন্তহীন ভোগান্তিতে পড়েন। আমরা প্রতি বছরই দেখে থাকি, ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরে সামান্য বৃষ্টি হলেই পুরো শহর পানিতে তলিয়ে যায়। এর কারণ কী? এই সমস্যার জন্য দায়ী কারা? প্রশাসন থেকে কেন তাদের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না? প্রতিবছর বন্যা বা বর্ষা এলেই তখন প্রশাসন জেগে ওঠে, কিন্তু তারা সারা বছর কী করেন? বর্ষাকাল চলে গেলেই তারা হয়তো ভুলে যান মানুষের এসব ভোগান্তির কথা। বছর বছর ধরে মানুষ এ নারকীয় যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেও কোনো সুরাহা পাচ্ছে না। পাবেও না।

তার কারণ হলো, এ সমস্যার জন্য আমরা নিজেরাই দায়ী। দেশের সরকারপ্রধানকে এককভাবে দায়ী করলে হবে না। আমরা যখন আবাসন বা শিল্প এলাকা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করি, তখন হয়তো আমাদের মাথায় একটা জিনিস কখনোই আসে না যে, আমাদের পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা সবার আগে করতে হবে। বর্ষা এলেই আমাদের দেশের ছোট-বড় শহরগুলো এক চেনা সংকটের মুখোমুখি হয়। আকাশ মেঘলা হলেই সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে, আর এক পশলা ভারী বৃষ্টিপাত হলেই রাস্তাঘাট পরিণত হয় নদীতে। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এই জলাবদ্ধতার সংকট এখন আর কেবল সাময়িক কোনো নাগরিক অস্বস্তি নয়; বরং এটি একটি স্থায়ী মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। এই দুর্যোগের মূলে তাকালে দুটি প্রধান কারণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমটি হলো আমাদের নদী ও প্রাকৃতিক জলাশয়গুলোর ক্রমাগত সংকোচন এবং দ্বিতীয়টি হলো দূরদর্শিতাহীন অপরিকল্পিত নগরায়ণ। প্রকৃতি ও মানুষের তৈরি এই দ্বিমুখী সংকটের মরণফাঁদে আটকে গেছে দেশের কোটি মানুষের জীবন। অথচ বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি টাকার মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কোনো শেষ নেই। প্রশ্ন জাগে, এই চরম খেসারতের শেষ আসলে কোথায়?

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এ দেশের শহর ও জনপদগুলো গড়ে উঠেছিল নদীকে কেন্দ্র করেই। প্রাকৃতিকভাবেই এই অঞ্চলের পানি নিষ্কাশনের মূল ধমনি ছিল নদী, খাল এবং বিল। বৃষ্টির অতিরিক্ত পানি এসব প্রাকৃতিক নালা বেয়ে অনায়াসে নদীতে গিয়ে পড়ত। কিন্তু বিগত কয়েক দশকে নগরায়ণের নামে আমরা প্রথমেই আঘাত করেছি আমাদের এই প্রাকৃতিক জলধারাগুলোর ওপর। দেশের প্রায় প্রতিটি বড় শহরেই প্রভাবশালী ভূমিদস্যুদের থাবায় নদী ও খালগুলো সংকুচিত হতে হতে আজ নর্দমায় পরিণত হয়েছে। যেখানে একসময় বুক চিরে নৌকা চলত, সেখানে আজ বহুতল ভবন, শিল্পকারখানা কিংবা আবর্জনার স্তূপ। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে এভাবে রুদ্ধ করে দেওয়ার পর বৃষ্টির পানি যাওয়ার আর কোনো পথ অবশিষ্ট থাকে না। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি উপচে পড়ছে জনবসতিতে। নদীকে আমরা যেভাবে হত্যা করছি, প্রকৃতি যেন আজ জলাবদ্ধতার রূপ নিয়ে আমাদের ওপর সেই প্রতিশোধই নিচ্ছে।

নদী সংকোচনের এই আত্মঘাতী প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণের ভয়াবহতা। একটি আধুনিক শহর গড়ে তোলার প্রথম শর্তই হলো দীর্ঘমেয়াদি ও বিজ্ঞানসম্মত ড্রেনেজ ব্যবস্থা। কিন্তু আমাদের দেশের নগর পরিকল্পনাগুলোতে দূরদর্শিতার চরম অভাব স্পষ্ট। দেশের বেশিরভাগ শহরেই দেখা যায়, যেখানে বসতি গড়ে উঠছে, সেখানে পানি নিষ্কাশনের কোনো সুব্যবস্থা নেই। জলাশয়, ডোবা এবং নিচু জমি ভরাট করে একের পর এক আবাসন প্রকল্প তৈরি হচ্ছে, যা প্রাকৃতিকভাবে পানি ধরে রাখার ক্ষমতা পুরোপুরি নষ্ট করে দিচ্ছে। কংক্রিটের চাদরে ঢেকে যাওয়া শহরগুলোর মাটি এখন আর পানি শোষণ করতে পারে না। তার ওপর ত্রুটিপূর্ণ ও সরু ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে পানি নিষ্কাশন হতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি কোনো কোনো এলাকায় কয়েক দিন পর্যন্ত লেগে যায়। একটু ভারী বৃষ্টি হলেই ডাস্টবিনের ময়লা-আবর্জনা, নোংরা পানি এবং স্যুয়ারেজের বর্জ্য মিশে একাকার হয়ে যায় রাজপথে। এই নোংরা পানির ওপর দিয়েই মানুষকে প্রতিদিন চলাচল করতে হয়, যা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।

জলাবদ্ধতার এই নরকযন্ত্রণার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ এবং শ্রমজীবী মানুষ। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষের জন্য এই দুর্যোগ এক অভিশাপের মতো। ঘরের ভেতর পানি ঢুকে পড়ার কারণে সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ও মালামাল নষ্ট হয়, থমকে যায় রান্নাবান্নার কাজ। অন্যদিকে, রাস্তায় পানি জমে থাকার কারণে গণপরিবহন চলাচল ব্যাহত হয়। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েন অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী এবং দিনমজুরেরা। রিকশাচালক, ভ্যানচালক বা ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যায়। জলাবদ্ধ সড়কের নিচে লুকিয়ে থাকা খোলা ম্যানহোল বা ভাঙা রাস্তা একেকটি অদৃশ্য মরণফাঁদে পরিণত হয়, যেখানে পড়ে প্রতিবছরই অসংখ্য মানুষ দুর্ঘটনার শিকার হন, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে এই ধরনের মানবেতর জীবনযাপন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ভয়াবহ সংকট দূর করতে প্রশাসনের সদিচ্ছা ও পরিকল্পনার কোনো অভাব কাগজে-কলমে দেখা যায় না। প্রতি বছরই বাজেট আসে, ড্রেন পরিষ্কার ও সংস্কারের নামে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হয়। মাস্টারপ্ল্যান বা মহাপরিকল্পনার গল্প শোনানো হয় নাগরিকদের। কিন্তু বর্ষা এলেই সেই পরিকল্পনার আসল কঙ্কালটা বেরিয়ে পড়ে। এক সংস্থা রাস্তা খোঁড়ে, তো অন্য সংস্থা এসে ড্রেন বানায়। আবার কিছুদিন পর অন্য কোনো কাজের জন্য সেই ড্রেনই ভেঙে ফেলা হয়। এই যে বিভিন্ন সরকারি সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের চরম অভাব, তার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে। অনেক সময় দেখা যায়, কোটি টাকা খরচ করে যে ড্রেনেজ লাইন তৈরি করা হয়েছে, তা নদীর সঙ্গে যুক্তই করা হয়নি। কিংবা যে নদীতে গিয়ে যুক্ত হয়েছে, সেই নদীর মুখ আগেই দখলে বন্ধ হয়ে গেছে। এই ধরনের অদূরদর্শী এবং দায়সারা কাজের কারণে জনগণের ট্যাক্সের পয়সা যেমন জলে যাচ্ছে, তেমনি জলাবদ্ধতার তীব্রতাও দিন দিন বাড়ছে।

এই মরণফাঁদ থেকে মুক্তির উপায় কী? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের উন্নয়ন ভাবনায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। নদী ও প্রকৃতিকে ধ্বংস করে কখনোই টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়—এই সত্যটি আমাদের সবার আগে অনুধাবন করতে হবে। সবার আগে দেশের প্রতিটি শহরের অভ্যন্তরীণ খাল ও নদীগুলোকে দখলদারদের হাত থেকে মুক্ত করতে হবে। শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালালেই হবে না, নদীর স্বাভাবিক নাব্য ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত ড্রেজিং বা খননকাজ চালাতে হবে, যাতে নদীর পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। নদী ও খালের সীমানা নির্ধারণ করে সেখানে স্থায়ী সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলতে হবে, যাতে নতুন করে কেউ তা দখল করতে না পারে। একই সঙ্গে, প্রতিটি শহরের জন্য একটি সামগ্রিক ও বিজ্ঞানসম্মত পানি নিষ্কাশন মহাপরিকল্পনা বা ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা জরুরি।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শহরগুলোতে যত্রতত্র আবাসন ও কংক্রিটের স্থাপনা নির্মাণের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। প্রতিটি নগরীতে নির্দিষ্ট অনুপাত অনুযায়ী জলাশয় এবং খোলা জায়গা সংরক্ষণ করা বাধ্যতামূলক করা উচিত। বৃষ্টির পানি যেন মাটির নিচে যেতে পারে, তার জন্য আধুনিক ‘স্পঞ্জ সিটি’ বা পানি শোষণকারী নগর ধারণার প্রয়োগ করা যেতে পারে। এছাড়া প্লাস্টিক ও পলিথিনের মতো অপচনশীল বর্জ্য যত্রতত্র ফেলা বন্ধ করতে হবে, কারণ এগুলোই শহরের ড্রেনগুলোকে জ্যাম করে জলাবদ্ধতা তৈরি করে। এ ক্ষেত্রে কেবল প্রশাসনের ওপর নির্ভর না করে নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। তবে মূল দায়িত্বটি পালন করতে হবে রাষ্ট্র ও নগর প্রশাসনকে। সরকারি সংস্থাগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে এবং দুর্নীতি বন্ধ না হলে কোনো পরিকল্পনাই আলোর মুখ দেখবে না।

জলাবদ্ধতা এখন আর কোনো সাধারণ বর্ষাকালীন সমস্যা নয়; এটি একটি জাতীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট। দিনের পর দিন রাস্তাঘাট ডুবে থাকার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি হচ্ছে, উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং কোটি কোটি টাকার জাতীয় সম্পদ নষ্ট হচ্ছে। এই স্থবিরতা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। আমরা একদিকে উন্নত ও আধুনিক স্মার্ট দেশের স্বপ্ন দেখছি, অন্যদিকে সামান্য বৃষ্টিতেই আমাদের শহরগুলো পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে—এই বৈপরীত্য দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। জনগণের ধৈর্যের বাঁধও আজ ভেঙে যাওয়ার উপক্রম। মানুষ আর কোনো আশ্বাস বা মেগা প্রকল্পের ফাঁকা বুলি শুনতে চায় না; তারা চায় এই দীর্ঘস্থায়ী নরকযন্ত্রণা থেকে স্থায়ী মুক্তি। নদীগুলোকে তাদের প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়া এবং সুপরিকল্পিত নগরায়ণের মাধ্যমে এই মরণফাঁদ ভেঙে ফেলার এখনই উপযুক্ত সময়। প্রশাসন ও নীতিনির্ধারকেরা যত দ্রুত এই সত্যটি উপলব্ধি করবেন, দেশের মানুষের জন্য ততই মঙ্গল।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  জলাবদ্ধতা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close