দেশের ওষুধ বাজারে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের রমরমা বাণিজ্যের যে খবর বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। রাজধানীর অভিজাত ফার্মেসি থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের ওষুধের দোকান, এমনকি হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার পর্যন্ত- মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের উপস্থিতি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার একটি নির্মম চিত্র তুলে ধরে।
এ সংকট নিছক প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রশ্ন নয়, এটি সরাসরি মানুষের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। সবুজবাগে ষোলো মাস বয়সী শিশু নাদিয়া খাতুন কিংবা আশুগঞ্জে চার বছরের আয়েশা মণির মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; এগুলো একটি ভঙ্গুর ব্যবস্থার করুণ পরিণতি, যেখানে মুনাফার লোভ শিশুর জীবনের চেয়েও ভারী হয়ে ওঠে।
দেশে এখন নিবন্ধিত ফার্মেসির সংখ্যা প্রায় দুই লাখ ৩৫ হাজার, আর অনিবন্ধিত ফার্মেসি আছে আরও অন্তত ৫০ হাজার। এত বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের যে জনবল ও সক্ষমতা, তা নিতান্তই অপ্রতুল। ফলে তদারকির নামে যা চলছে, তা মূলত লোকদেখানো অভিযান আর সামান্য জরিমানায় সীমাবদ্ধ। আইন যে দুর্বল, তা নয়। ঔষধ ও কসমেটিকস আইন কিংবা বিশেষ ক্ষমতা আইনে কঠোর শাস্তির বিধান থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, মোবাইল কোর্টগুলো সর্বোচ্চ শাস্তির পরিবর্তে সামান্য অঙ্কের জরিমানা করেই দায় সারছে। এই বৈপরীত্য দূর করা জরুরি।
আইন যত কঠোরই হোক, প্রয়োগে শিথিলতা থাকলে তা কার্যত অসাধু ব্যবসায়ীদের জন্য একধরনের প্রশ্রয়েই পরিণত হয়। যেসব ক্ষেত্রে মৃত্যুর মতো গুরুতর পরিণতি ঘটেছে, সেসব ক্ষেত্রে বিশেষ ক্ষমতা আইনের অধীনে বিচার নিশ্চিত করার যে দাবি আইনজীবীরা তুলেছেন, তা যথাযথ বিবেচনার দাবি রাখে। এই সংকটের আরেকটি দিক হলো দায় ভাগাভাগির খেলা। ওষুধ কোম্পানিগুলো মেয়াদ শেষের আগেই ওষুধ ফেরত নেওয়ার নীতিগত ব্যবস্থা রাখলেও বাস্তবে ফার্মেসি মালিকদের একাংশ বাড়তি মুনাফার লোভে তা গোপন রেখে বিক্রি করে দেন।
অপর দিকে দেশের কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের গুদামেও ৩০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও ভ্যাকসিন মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকার তথ্য প্রমাণ করে, সমস্যাটি কেবল বেসরকারি খাতে সীমাবদ্ধ নয়- সরকারি সরবরাহব্যবস্থাতেও একই দুর্বলতা বিদ্যমান। এই বাস্তবতা বলে দেয়, সমস্যার সমাধান খণ্ডিতভাবে নয়, সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার সংস্কারের মধ্য দিয়েই আসতে হবে।
আমরা মনে করি, এই সংকট মোকাবিলায় কয়েকটি পদক্ষেপ অবিলম্বে নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের জনবল ও তদারকি সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে দুই লাখের বেশি ফার্মেসির প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়। দ্বিতীয়ত, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে যৌথ তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে বিচ্ছিন্ন অভিযানের বদলে ধারাবাহিক ও সমন্বিত নজরদারি নিশ্চিত হয়। তৃতীয়ত, প্রতিটি ওষুধের প্যাকেটে কিউআর কোডের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ডেটাবেইসে ব্যাচ নম্বর ও মেয়াদের তথ্য সংরক্ষণের যে প্রস্তাব বিশেষজ্ঞরা দিয়েছেন, তা দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য একটি প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান। চতুর্থত, লাইসেন্সবিহীন ফার্মেসি চিহ্নিত করে বন্ধ করা এবং নিয়মিত লাইসেন্স নবায়ন বাধ্যতামূলক করার কাজেও আর দেরি করার সুযোগ নেই।
সবশেষে বলতে হয়, ওষুধকে শুধু একটি পণ্য হিসেবে দেখলে বিপদ- এটি মানুষের বেঁচে থাকার জরুরি অনুষঙ্গ। যে ব্যবস্থায় এ জীবন রক্ষাকারী উপাদান বিষে পরিণত হয়, সেই ব্যবস্থার সংস্কার বিলম্বিত করার কোনো সুযোগ নেই। সরকার, ওষুধ কোম্পানি, ফার্মেসি মালিক ও ভোক্তা- সবার সম্মিলিত দায়িত্বশীলতা ছাড়া এই মহাচক্র ভাঙা সম্ভব নয়। আমরা প্রত্যাশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেবল আশ্বাসের বাক্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, যাতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের কারণে আর কোনো নাদিয়া বা আয়েশাকে অকালে প্রাণ হারাতে না হয়।
কেকে/এমএ