দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমেছেন-এই দৃশ্য গত কয়েকদিনে আমরা বারবার দেখেছি। সায়েন্স ল্যাব, উত্তরাসহ রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্ট অবরোধ, মহাসড়ক বন্ধ, এমনকি সচিবালয় পর্যন্ত মিছিল-আন্দোলনের তীব্রতা মোটেও কম নয়। টেলিভিশনের পর্দায়, সংবাদপত্রের পাতায় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিনই নতুন নতুন ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে, যেখানে উর্দি পরিহিত পুলিশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকছেন স্কুল ব্যাগ কাঁধে থাকা কিশোর-কিশোরীরা। এই দৃশ্য যেমন আবেগঘন, তেমনি উদ্বেগজনকও।
কিন্তু এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি : আন্দোলনের মূল যৌক্তিকতা যেখানে ছিল, রাষ্ট্রযন্ত্র সেখানে ইতোমধ্যে সাড়া দিয়েছে। তারপরও আন্দোলন কেন চলছে এবং এতে অভিভাবকদের নীরব বা প্রত্যক্ষ সমর্থন কতটা দায়িত্বশীল আচরণ-তা ভেবে দেখার সময় এসেছে।
আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল যৌক্তিক কারণেই। বন্যা ও জলাবদ্ধতার মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া, প্রশ্নপত্রে ভুল, আর পরীক্ষাকেন্দ্রে কিছু শিক্ষকের অসংবেদনশীল আচরণ নিয়ে ক্ষোভ স্বাভাবিক। যে শিক্ষার্থী পানিবন্দি এলাকা থেকে নৌকায় করে পরীক্ষার হলে পৌঁছেছে, বা যার বই-খাতা বন্যার পানিতে ভেসে গেছে, তার ক্ষোভ ও হতাশা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এ বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের পুনঃপরীক্ষার সুযোগ এবং ভুল প্রশ্নের জন্য পূর্ণ নম্বর দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। অর্থাৎ আন্দোলনের মূল অভিযোগগুলোর একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে মীমাংসিত।
তারপরও দাবি পুরোপুরি প্রত্যাহার না হয়ে ছয় দফায় রূপ নিয়েছে-যেখানে মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি বাদ পড়লেও পরীক্ষা মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে নতুন নতুন শর্ত যুক্ত হচ্ছে। এ ধারাবাহিক দাবি-সম্প্রসারণ একটি প্রশ্ন তোলে-আন্দোলনটি কি এখনো একটি সুনির্দিষ্ট সমস্যার সমাধান খুঁজছে, নাকি রাস্তায় অবস্থান নিজেই একটি লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে? একবার আন্দোলন গতি পেয়ে গেলে তা থামানো কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ নেতৃত্বে থাকা অংশটি প্রায়ই মনে করে দাবি আদায়ের আগে সরে গেলে আন্দোলনের গুরুত্ব কমে যাবে। ফলে দাবির তালিকা দীর্ঘ হতে থাকে, যদিও মূল সংকট ততক্ষণে অনেকটাই সমাধান হয়ে গেছে।
বাংলাদেশে এইচএসসি পরীক্ষা দেয় লাখ লাখ শিক্ষার্থী, যাদের সবাই বন্যা বা জলাবদ্ধতার সরাসরি শিকার নন। দেশের একটি বড় অংশ এ দুর্যোগের বাইরে থেকেই স্বাভাবিকভাবে পরীক্ষা দিতে সক্ষম। যে অঞ্চলগুলো সত্যিকার অর্থে দুর্যোগকবলিত, তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া ন্যায্য এবং কর্তৃপক্ষ তা নিয়েছেও। কিন্তু গোটা পরীক্ষা প্রক্রিয়া বন্ধ বা দীর্ঘ সময়ের জন্য স্থগিত করার দাবি বাস্তবে অ-ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদেরই ক্ষতিগ্রস্ত করে-ফল প্রকাশ পিছিয়ে যায়, ভর্তি প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়, মানসিক প্রস্তুতি ভেঙে পড়ে।
দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুতি নেওয়া একজন শিক্ষার্থীর জন্য পরীক্ষা পিছিয়ে যাওয়া মানে শুধু সময়ের ক্ষতি নয়, বরং মানসিক প্রস্তুতিও নতুন করে গড়ে তোলার চাপ। রাস্তা অবরোধ ও মহাসড়ক বন্ধ করার প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপরও, যাদের এ সিদ্ধান্তে কোনো ভূমিকা নেই-অ্যাম্বুলেন্স আটকে যাওয়া, অফিসগামী মানুষের ভোগান্তি, ব্যবসায়ীদের ক্ষতি, এসবই এই আন্দোলনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।
একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর দাবি আদায়ে সামষ্টিক জনজীবন ব্যাহত করা কতটা যৌক্তিক পথ, সেই প্রশ্ন এড়ানো যায় না। গণতান্ত্রিক সমাজে প্রতিবাদের অধিকার নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই অধিকার প্রয়োগের ধরন অন্যদের মৌলিক অধিকারকে ক্ষুণ্ন না করে, সেদিকেও দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।
একজন কিশোর-কিশোরী পরীক্ষার মতো উচ্চ-চাপের সময়ে রাজপথে অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থান বা মহাসড়ক বন্ধ করার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে জড়ালে সবার আগে যার ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া উচিত, তিনি অভিভাবক। বয়ঃসন্ধিকালের এ শিক্ষার্থীরা আবেগপ্রবণ, দলগত মানসিকতায় সহজেই প্রভাবিত হয় এবং ঝুঁকির মাত্রা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা না-ও থাকতে পারে। এ বাস্তবতায় তাদের গাইড করার দায়িত্ব মূলত পরিবারের। সন্তানের ন্যায্য অভিযোগ থাকতেই পারে, কিন্তু সেই অভিযোগ কীভাবে প্রকাশ পাবে-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক সমিতি বা বোর্ডের মাধ্যমে দরখাস্ত, নাকি রাস্তা অবরোধ-এই পথ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে অভিভাবকের গাইডেন্স জরুরি ছিল।
বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সন্তান আন্দোলনে গেলে অনেক অভিভাবক নীরব সমর্থন দিচ্ছেন, কেউ কেউ উৎসাহও দিচ্ছেন-অথচ পরীক্ষার প্রাক্কালে সন্তানকে মানসিক স্থিতিশীলতা ও পড়াশোনায় মনোযোগী রাখাই তাদের প্রধান দায়িত্ব হওয়ার কথা। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, অভিভাবকরা নিজেরাই সন্তানের সঙ্গে মিছিলে অংশ নিচ্ছেন বা আন্দোলনস্থলে উপস্থিত থেকে সমর্থন জোগাচ্ছেন। এ আচরণ স্বল্পমেয়াদে সন্তানের প্রতি সহানুভূতির প্রকাশ মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে তাদের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়ারই নামান্তর। মন্ত্রণালয় যেখানে ইতোমধ্যে মূল দাবিগুলো মেনে নিয়েছে, সেখানে সন্তানকে রাস্তায় না পাঠিয়ে পড়ার টেবিলে ফেরানোই ছিল যুক্তিসংগত পদক্ষেপ।
এখানে আরেকটি দিক বিবেচনায় নেওয়া দরকার-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা। বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ প্রশমনে বিদ্যালয় বা কলেজ কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ফলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের অসহায় মনে করে বিকল্প পথ হিসেবে রাস্তায় নেমেছে। যদি শুরুতেই প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের অভিযোগ শোনার এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া তৈরি করত, তাহলে হয়তো আন্দোলন এতটা দীর্ঘায়িত হতো না। শিক্ষক সমিতি ও অভিভাবক সংগঠনগুলোরও উচিত ছিল শুরুতেই মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেওয়া, যাতে শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি প্রশাসনিক পর্যায়ে দ্রুত পৌঁছায় এবং রাস্তায় নামার প্রয়োজন না পড়ে।
আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে যে মানবিক দাবিগুলো ছিল, তার প্রতি প্রশাসনের সাড়া ইতিবাচক এবং তা স্বীকার করা উচিত। এটি প্রমাণ করে যে যৌক্তিক দাবি তুলে ধরলে রাষ্ট্র সাড়া দেয়, এবং এই ইতিবাচক দৃষ্টান্ত ভবিষ্যতের জন্যও একটি শিক্ষা হতে পারে। কিন্তু দাবি আদায়ের পর আন্দোলন দীর্ঘায়িত করা, নতুন নতুন শর্ত যুক্ত করা এবং পরীক্ষার্থীদের রাস্তায় রেখে দেওয়া-এ প্রবণতা শিক্ষার্থীদের নিজেদেরই ক্ষতি করছে। যে সময়টা বইয়ের পাতায় কাটানোর কথা, সেসময় রাজপথে কাটাতে হচ্ছে; যে মানসিক প্রস্তুতি পরীক্ষার জন্য দরকার, তা আন্দোলনের উত্তেজনায় ভেঙে পড়ছে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়বে তাদেরই ফলাফলে ও ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনে।
অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অভিভাবক সংগঠনগুলোর উচিত সন্তানদের আশ্বস্ত করা যে তাদের ন্যায্য দাবি ইতোমধ্যে বিবেচিত হয়েছে এবং এখন সময় হলো পরীক্ষা শেষ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার। একইসঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে যোগাযোগ আরও স্বচ্ছ করার, যাতে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারে তাদের দাবি ঠিক কতটা এবং কীভাবে পূরণ হয়েছে। স্বচ্ছ ও সময়োপযোগী যোগাযোগের অভাবেই অনেক সময় গুজব ও আস্থাহীনতা তৈরি হয়, যা আন্দোলনকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘায়িত করে।
প্রতিবাদের সংস্কৃতি যেন প্রতিটি পরীক্ষা-সংকটের ডিফল্ট সমাধান না হয়ে ওঠে, সেদিকে অভিভাবক ও শিক্ষক-উভয় পক্ষকেই সচেতন থাকতে হবে। শেষ পর্যন্ত মনে রাখা দরকার, একটি জাতির শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় স্টেকহোল্ডার শিক্ষার্থীরাই, আর তাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখাই যে কোনো সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত।
কেকে/এমএ