বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬,
১ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: বোয়ালখালীতে লবণ কারখানায় অগ্নিকাণ্ড, ১০ শ্রমিক দগ্ধ      চট্টগ্রামসহ আট অঞ্চলে বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে      ইরানে দফায় দফায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা      আজ জুলাই শহীদ দিবস : নির্ভিক আবু সাঈদের রক্তে অগ্নিগর্ভ দেশ      ডিফেন্সিভ কৌশল নিয়ে সমালোচনা, জবাব দিলেন টুখেল      সব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আসছে ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’: প্রধানমন্ত্রী      ঋণনির্ভর নয়, বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়তে চায় সরকার: প্রধানমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
আগস্ট-সেপ্টেম্বরে বাড়বে ডেঙ্গুর প্রকোপ!
ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬, ২:১০ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

সারা দেশে ডেঙ্গু এখন স্থায়ী জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। একটা সময় ছিল যখন ডেঙ্গু ছিল ঢাকাকেন্দ্রিক। কিন্তু বর্তমানে সংক্রমণ বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। প্রতিদিন রাজধানী ঢাকা থেকে লাখ লাখ মানুষ বাস, ট্রেনসহ বিভিন্ন যানবাহনে চড়ে দেশের প্রত্যন্ত জেলা ও উপজেলাগুলোতে যাতায়াত করেন। এই যাতায়াতের সমান্তরালে আক্রান্ত ব্যক্তি ও এডিস মশা নির্বিঘ্নে পৌঁছে যাচ্ছে দেশের আনাচে-কানাচে। ফলে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া প্রতিটি জেলা ও উপজেলা এখন এডিস মশার অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনসেক্ট রিয়ারিং অ্যান্ড এক্সপেরিমেন্টাল স্টেশন (আইআরইএস) দীর্ঘদিন ধরে দেশব্যাপী মশার প্রজনন, আচরণ ও ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ে নিয়মিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও সার্ভেইল্যান্স চালিয়ে আসছে। এডিস মশার ঘনত্ব, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা, বৃষ্টিপাতের ধরন, তাপমাত্রা এবং বাতাসের আর্দ্রতার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল প্যারামিটারগুলো বিশ্লেষণ করে গবেষকরা নিয়মিত একটি ‘ফোরকাস্টিং মডেল’ মডেল প্রদান করেন। অতীতে এ বৈজ্ঞানিক প্রেডিকশন মডেলগুলোর প্রতিটি পূর্বাভাসই শতভাগ নির্ভুল প্রমাণিত হয়েছে। চলতি বছরের জলবায়ু ও মশার ঘনত্ব বিশ্লেষণ করে গবেষকরা যে আশঙ্কার পূর্বাভাস দিয়েছেন, তা রীতিমতো আমাদের জন্য এক চরম সতর্কবার্তা।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, আসছে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে সারা দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে, যদি না এখনই জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে কঠোর ও সুনিয়ন্ত্রিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। দেশের বেশ কয়েকটি জেলা এই মুহূর্তে ডেঙ্গুর চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে বরিশাল বিভাগের বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর ও পটুয়াখালী অন্যতম। এর পাশাপাশি পাশের জেলা বাগেরহাট ও খুলনাও সমান ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে ঢাকা বিভাগের বাইরে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, চাঁদপুর, কুমিল্লা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ জেলায় এবার ডেঙ্গুর সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ার স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় চলতি বছর হয়তো ঢাকাতে আক্রান্তের হার তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম হতে পারে। ঢাকার বিশাল জনগোষ্ঠী অতীতে ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ফলে তাদের মধ্যে ‘চান্স অব ইনফেকশন’ এর হার কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু ঢাকার বাইরে অন্যান্য জেলার মানুষের মধ্যে এই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায়, সেখানে সংক্রমণের বিস্ফোরণ ঘটার ঝুঁকি অনেক বেশি আছে। তাই ঢাকাসহ সারা দেশে এখন থেকেই ডেঙ্গু মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অবকাঠামো ও স্থানীয় প্রশাসনকে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। নয়তো আগামী দুই মাস আমাদের জন্য ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শীত, গ্রীষ্ম কিংবা বর্ষা- কোনো ঋতুই এখন আর ডেঙ্গু থেকে নিরাপদ নয়। তবে বর্ষাকালে লাগাতার বৃষ্টির কারণে বাসাবাড়ির চারপাশে ও বিভিন্ন ছোট-বড় পাত্রে পানি জমে থাকে। এই জমে থাকা স্থির পানিই এডিস মশার প্রজননের মূল উৎস। জমা পানিতে এডিস মশা ডিম পাড়ে এবং সেই ডিম থেকে লার্ভা, লার্ভা থেকে পিউপা এবং পরিশেষে পূর্ণাঙ্গ মশার জন্ম হয়। আর এই পূর্ণাঙ্গ মশার ঘনত্বের মাঝে যদি একজন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী থাকেন, তবে মশার মাধ্যমে সেই ভাইরাস দ্রুত সুস্থ মানুষের শরীরে ছড়াতে শুরু করে এবং জ্যামিতিক হারে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকে। দেশে আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর- এই তিনটি মাসকে বলা হয় বর্ষা-পরবর্তী সময়, আর এই সময়েই ডেঙ্গুর ঝুঁকি পৌঁছায় সর্বোচ্চ চূড়ায়।

গবেষকরা এডিস মশাকে অত্যন্ত ‘চতুর মশা’ বলছেন। যে কোনো পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে এটি নিজেকে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারে। আগে আমাদের ধারণা ছিল, এডিস মশা শুধু পরিষ্কার বা স্বচ্ছ পানিতেই ডিম পাড়ে। কিন্তু সাম্প্রতিক মাঠপর্যায়ের গবেষণা ও কীটতত্ত্ববিদদের পর্যবেক্ষণ জানিয়েছে এডিস মশা নোংরা ও দূষিত পানিতেও ডিম পাড়ছে এবং বংশবৃদ্ধি করছে। এডিস মশার এ আচরণগত পরিবর্তন আমাদের ডেঙ্গু প্রতিরোধ লড়াইকে আরও জটিল করে তুলেছে।

নগরবাসীর মধ্যে একটি বড় বিভ্রান্তি হলো মশার সার্বিক ঘনত্ব নিয়ে। দেশের সামগ্রিক মশার প্রায় ৯৯ ভাগই হলো ‘কিউলেক্স মশা’, যা বর্ষাকালে প্রাকৃতিকভাবেই কমে যায়। আর এডিস মশার সংখ্যা মোট মশার এক ভাগের চেয়েও কম, কিন্তু বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে এটি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। ফলে সামগ্রিক মশার ঘনত্ব কম মনে হলেও, ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার উপস্থিতি ঠিকই আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যায়। আরেকটি ভুল ধারণা হলো এডিস মশা সাধারণত দিনে কামড়ায়, তাই দিনের বেলা সতর্ক থাকলেই চলবে। আবার ঘরে মশা না দেখলে অনেকে রাতে মশারি টাঙানোর প্রয়োজন বোধ করেন না। অথচ একটিমাত্র সংক্রমিত এডিস মশাই পুরো পরিবারের জন্য হুমকি হতে পারে। তাই আগামী তিন-চার মাস ঘরে মশা থাকুক আর না থাকুক, দিন কিংবা রাত- ঘুমানোর সময় বাধ্যতামূলকভাবে মশারি ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সামান্য অবহেলা বা অলসতা এই সময়ে ডেকে আনতে পারে অকাল প্রাণহানি।

দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে মশা নিয়ন্ত্রণ ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। কিন্তু এত বরাদ্দ, এত আয়োজন আর প্রচার-প্রচারণার পরও ডেঙ্গু কমছে না, বরং প্রতিবছরই তা আরও ভয়াবহ রূপ নিয়ে ফিরে আসছে। দেশে মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ভেতরের এক বিশাল ‘গ্যাপ’ রয়েছে। সিটি কর্পোরেশন ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো মশা নিধনে যে সনাতন ও গতানুগতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে, তার প্রায় পুরোটাই মূলত ‘কিউলেক্স মশা’কে টার্গেট করে তৈরি।

এডিস মশার মূল প্রজননস্থল হলো মানুষের বসতবাড়ি, বহুতল ভবনের বেজমেন্ট বা গাড়ি পার্কিংয়ে জমে থাকা পানি, ড্রাম, বালতি, ফুলের টব, ছাদ কিংবা জলকান্দার জমা পানি। ফলে আমরা যে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছি তাতে ঘরে নিরাপদে বংশবৃদ্ধি করে চলেছে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা। এই কৌশলগত ভুল সংশোধন করে যতক্ষণ না আমাদের কর্মপরিকল্পনা সরাসরি ‘এডিস মশা’কেন্দ্রিক করা হবে, ততক্ষণ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব।

তা ছাড়া, আমাদের দেশে মশা মারার জন্য যে ‘ফগিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় তা অকার্যকর ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এই ক্ষতিকর ধোঁয়া আমাদের ফুসফুসের ক্ষতি করার পাশাপাশি মৌমাছি, প্রজাপতিসহ প্রকৃতির অতি প্রয়োজনীয় পরাগায়নকারী কীটপতঙ্গগুলোকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। অথচ অকার্যকর এ লোকদেখানো পদ্ধতিতে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় করা হচ্ছে। এর বিপরীতে পরিবেশবান্ধব ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ লার্ভিসাইড পানিতে প্রয়োগ করা অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি।

আসন্ন মহাসংকট থেকে বাঁচতে এবং আসন্ন ভয়াবহতা রুখতে আমাদের এখনই সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত পদক্ষেপ জোরেশোরে গ্রহণ করতে হবে। প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ আঙিনা, বেজমেন্ট ও ছাদ পরিষ্কার রাখতে হবে। যেখানে পানি নিষ্কাশন সম্ভব নয়, সেখানে সিটি করপোরেশনের সহায়তায় পরিবেশবান্ধব বায়ো-লার্ভিসাইড প্রয়োগ করতে হবে। দেশের প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ডাক্তার, নার্স ও সংশ্লিষ্টদের ডেঙ্গু চিকিৎসার জাতীয় গাইডলাইন অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত রাখতে হবে, যেন রোগীর সংখ্যা আকস্মিক বৃদ্ধি পেলেও চিকিৎসা ব্যবস্থার চাপ সামলানো যায়।

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  আগস্ট-সেপ্টেম্বর   ডেঙ্গুর প্রকোপ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close