শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬,
৬ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: রাষ্ট্রপতির শপথ ঘিরে যেসব সড়ক এড়িয়ে চলার পরামর্শ      নাইজেরিয়ায় নৌকাডুবিতে নিহত ৪৬      বঙ্গভবনে নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণ আজ      ফখরুল ইসলামকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি      রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলামকে চীনের অভিনন্দন      মির্জা ফখরুল ইসলাম ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত      সংবিধানের ৭০ ধারায় পরিবর্তন আসবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
গঙ্গা নদী ব্যবস্থাপনা: পানি, পরিবেশ ও রাজনীতি
প্রকৌশলী আ.ন.হ. আখতার হোসেন
প্রকাশ: শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬, ৯:৫৮ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত আন্তর্জাতিক নদ-নদীগুলোর ব্যবস্থাপনা নিয়ে সত্যিকার অর্থে কোনো টেকসই ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। পাকিস্তান আমল থেকে এ নিয়ে প্রথমে ভারত-পাকিস্তান এবং ১৯৭১ সালের পর ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রীয় সফরে ভারত ভ্রমণ করলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তির আওতায় ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশন গঠিত হয়। যৌথ নদী কমিশনের জন্য ভারতের সেচমন্ত্রী এবং বাংলাদেশের পানিসম্পদমন্ত্রীকে যৌথভাবে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। যৌথ নদী কমিশনের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক ভারতে অনুষ্ঠিত হলে ভারতের সেচমন্ত্রী এবং বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হলে বাংলাদেশের পানিসম্পদমন্ত্রী কমিশনের বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন। মন্ত্রী পর্যায়ের যৌথ নদী কমিশনের বছরে ন্যূনতম চারবার বৈঠক করার সিদ্ধান্ত হয়। মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি অনুযায়ী যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক গত ৫৪ বছরে মাত্র একবার, ২০২২ সালের ২৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে দুটি আন্তর্জাতিক নদ-নদী—গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র—এবং আরও ৫২টি আন্তঃসীমান্ত নদ-নদী রয়েছে। গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রকে আন্তর্জাতিক নদ-নদী বলার কারণ, গঙ্গা নদী নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হলেও চীনের অংশ থেকে অনেক ছোট ছোট স্রোতধারা গঙ্গা নদীর বিভিন্ন শাখা নদীতে মিলিত হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদের শাখা নদীগুলোর উৎপত্তি ভুটান, চীন ও ভারতে। এসব নদী ব্রহ্মপুত্র নদে মিলিত হয়ে পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে যমুনা নামে প্রবাহিত হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, গঙ্গা-পদ্মা ও মেঘনার মিলিত প্রবাহ মেঘনা নামে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়। মেঘনা নদী শুধু ভারত ও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়।

ভারত গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে গঙ্গা নদীর ফারাক্কায় একটি ব্যারাজ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের সময় ভারত যুক্তি দেখিয়েছিল যে কলকাতা বন্দরকে রক্ষা করার জন্য ভাগীরথী-হুগলি নদীতে প্রবাহ বাড়াতে হবে। এ নিয়ে তারা তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনাই করেনি। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ভারতের একতরফা সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায়। ভারত-পাকিস্তান যৌথ নদী কমিশনেও বিষয়টি অর্থবহভাবে আলোচনায় আসেনি। পরবর্তীকালে ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় সিন্ধু নদী পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনায় ভারত সম্মত হয়।

পাকিস্তান আমলে গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে অর্থবহ কোনো আলোচনা হয়নি। এতদসত্ত্বেও ভারত ফারাক্কা ব্যারাজের নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখে। আন্তর্জাতিক নদী বিশেষজ্ঞরা ভারতের যুক্তিকে দীর্ঘমেয়াদে গ্রহণযোগ্য মনে করেননি। এমনকি ভারতের অনেক বিশেষজ্ঞও ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের ফলে নদীর উজান ও ভাটিতে দীর্ঘমেয়াদে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। গঙ্গা নদীর ফারাক্কায় ব্যারাজ নির্মাণের ফলে উজানে বিহার, ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে, তা সত্ত্বেও ভারত ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের কাজ চালিয়ে যায়।

১৯৭৪ সালে ভারত ফারাক্কা ব্যারাজ পরিচালনা অর্থাৎ গঙ্গার প্রবাহ প্রত্যাহার করে ভাগীরথী-হুগলি নদীতে স্থানান্তরের জন্য বাংলাদেশের অনুমতি চায়। ভারত তখন বলেছিল, ফারাক্কায় গঙ্গার প্রবাহ প্রত্যাহারের সময়কাল হবে মাত্র ৪১ দিন। সরল বিশ্বাসে বাংলাদেশ ভারতকে ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর অনুমতি দেয়। ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে ফারাক্কার পানি বণ্টনের প্রতিশ্রুতি প্রদান করে। কিন্তু ভারত তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। পরবর্তী সময়েও তারা ফারাক্কায় প্রবাহ প্রত্যাহার কার্যক্রম অব্যাহত রাখে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারত গঙ্গা নদীর ফারাক্কায় প্রবাহ প্রত্যাহার জোরদার করে। এর ফলে গঙ্গা নদীর ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অধিকাংশ নদীতে শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ মারাত্মকভাবে হ্রাস পেতে শুরু করে। ফলে সমুদ্রের লবণাক্ততা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোতে ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ ছাড়া পরিবেশের ওপর নানা ধরনের বিরূপ প্রভাব পড়তে থাকে।

১৯৭৬ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তব্য প্রদানকালে ভারত কর্তৃক একতরফাভাবে গঙ্গা নদীর ফারাক্কায় ব্যারাজের মাধ্যমে পানি প্রত্যাহারের বিষয়টি সাহসিকতার সঙ্গে দৃঢ়ভাবে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। শহীদ জিয়াউর রহমানের বক্তব্যের পর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি হয়। জাতিসংঘের অনেক সদস্য ফারাক্কায় ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের বিষয়ে উদ্বেগ ও নিন্দা প্রকাশ করেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সদস্যদের চাপের মুখে ভারত এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে গঙ্গা নদীর পানি বণ্টনের বিষয়ে চুক্তির অঙ্গীকার করে এবং শিগগিরই বাংলাদেশের সঙ্গে ফারাক্কার পানি বণ্টনের চুক্তি স্বাক্ষর করবে বলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদকে আশ্বস্ত করে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভারতের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুসরণ করে ভারত ১৯৭৭ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করে। এ চুক্তির মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর, যা ১৯৮৩ সালে শেষ হয়। এই চুক্তিকালীন সময়ে ভারতে ক্ষমতায় ছিল দেবগৌড়ার নেতৃত্বাধীন অ-কংগ্রেসি কেন্দ্রীয় সরকার। ১৯৭৭ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির পেছনে দুজন ভারতীয় রাজনীতিবিদের অবদান স্মরণীয়। একজন হলেন তৎকালীন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আই. কে. গুজরাল এবং অন্যজন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু।

১৯৭৭ সালে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার সময় বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতা ছিলেন মরহুম প্রকৌশলী বি. এম. আব্বাস। অন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন মরহুম প্রকৌশলী এম. এফ. এ. সিদ্দিকী, একজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ ও জ্ঞানী প্রকৌশলী; মরহুম প্রকৌশলী আমজাদ হোসেন খান, যিনি দীর্ঘদিন যৌথ নদী কমিশনের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন; এবং মরহুম প্রকৌশলী ড. হামিদুর রহমান খান, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও পানিবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ। এ ছাড়া একজন আন্তর্জাতিক নদী আইন বিশেষজ্ঞ আইনবিদও প্রতিনিধি দলে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ভারতীয় প্রতিনিধি দলেও একইভাবে অভিজ্ঞ প্রকৌশলী ও আইনজ্ঞ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

১৯৭৭ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির তিনটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য। প্রথমটি হলো, প্রবাহ বণ্টনের ভিত্তি হিসেবে ১৯৪৯ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত ফারাক্কায় গঙ্গার পানি প্রবাহের ৭৫ শতাংশ সময়কালের সর্বনিম্ন প্রবাহ নির্বাচন করা হয়। দ্বিতীয়টি হলো, প্রতিবছর জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত সময়ের জন্য প্রবাহ বণ্টনের ব্যবস্থা করা হয়। তৃতীয়টি হলো, চুক্তিকালীন সময়ে ফারাক্কায় গঙ্গা নদীর পানি প্রবাহ কোনো কারণে হ্রাস পেলে বাংলাদেশকে তাদের প্রাপ্য হিস্যার ৮০ শতাংশ প্রবাহ নিশ্চিত করা হবে। এটি ছিল বাংলাদেশের প্রবাহ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে একটি অনন্য সাধারণ গ্যারান্টি।

১৯৮৩ সালে যখন গঙ্গা নদীর প্রবাহ বণ্টনের বিষয়ে চুক্তি স্থায়ী করার আলোচনা শুরু হয়, তখন ১৯৭৭ সালের প্রবাহ বণ্টন চুক্তি বাতিল করে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ওই চুক্তিতে ১৯৭৭ সালের গঙ্গা নদীর প্রবাহ বণ্টনের বিষয়ে যেসব মৌলিক বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল, সেগুলো বাতিল করে দেওয়া হয়। ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে স্বীকৃত বিষয়গুলো বাতিল করা ছিল আন্তঃদেশীয় নদ-নদীর প্রবাহ বণ্টনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত ও নৈতিক পরাজয়।

ভারতীয় সমর্থন নিয়ে জেনারেল এরশাদ যেহেতু ক্ষমতা দখল করেছিলেন, তাই ভারতকে তুষ্ট করার জন্য অবৈধ এরশাদ সরকার ফারাক্কার পানি বণ্টনের ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেয়। এ কাজে যারা জেনারেল এরশাদকে সমর্থন দিয়েছিল, তারা আমাদের অতিপরিচিত ব্যক্তি।

১৯৮৩ সালে যখন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়, তখন বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলে কয়েকজন নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাঁদের মধ্যে একজন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সেচ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি অর্জনকারী শিক্ষক ছিলেন। তিনি আলোচনায় মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮৩ সালের সমঝোতাটি ছিল দুই বছর মেয়াদের জন্য। ১৯৮৫ সালে পুনরায় তিন বছরের জন্য সমঝোতা নবায়ন করা হয়, যার মেয়াদ ছিল ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত।

১৯৮৮ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত কোনো সমঝোতা বা চুক্তি ছিল না। ওই সময়ে ১৯৮৯-৯০ সাল পর্যন্ত জেনারেল এরশাদ এবং ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়ার বিএনপি সরকার ক্ষমতাসীন ছিল। বহু প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ভারত গঙ্গা নদীর পানি বণ্টনের বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো বৈঠকে মিলিত হয়নি।

১৯৯৬ সালে গঙ্গায় পানি বণ্টনের বিষয়ে আলোচনায় ১৯৮৩ ও ১৯৮৫ সালে যে ব্যক্তি মূল ভূমিকা পালন করেন, সেই একই ব্যক্তি এ ক্ষেত্রেও মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯৬ সালের চুক্তিটি ছিল ১৯৭৭ সালের চুক্তির চেয়ে অনেক খারাপ। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, ১৯৮৩ ও ১৯৮৫ সালের সমঝোতা স্বাক্ষর এবং ১৯৯৬ সালের গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়ে কেউ কোনো উচ্চবাচ্য করেনি।

প্রেস ক্লাবে আয়োজিত একটি সেমিনারে মরহুম প্রকৌশলী ড. শাহজাহান ও আমি ১৯৯৬ সালের গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন চুক্তির বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরে একটি পর্যালোচনামূলক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছিলাম। এজন্য চাকরির ক্ষেত্রে আমাকে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল। একটি সমীক্ষা থেকে জানা যায়, ১৯৯৬ সালের গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি মোতাবেক বাংলাদেশ ৬৫ শতাংশ ক্ষেত্রে পানি প্রবাহের স্বীকৃত হিস্যা পায়নি।

১৯৭৫ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ফারাক্কায় প্রবাহ প্রত্যাহারের ফলে গঙ্গা নদীর ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশে, বিশেষ করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ভয়াবহ বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। ওই অঞ্চলের নদ-নদীতে ব্যাপকভাবে প্রবাহ হ্রাস পায় এবং নদ-নদীর লবণাক্ততা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। ফারাক্কা-পূর্ব সময়ে ওইসব নদ-নদীতে লবণাক্ততার পরিমাণ ছিল ২ পিপিটি; বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ পিপিটিতে। এ অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানিতেও লবণাক্ততার পরিমাণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একটি সমীক্ষা থেকে জানা যায়, ফারাক্কায় প্রবাহ প্রত্যাহারের ফলে দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের ১৬টি জেলায় কৃষি, শিল্প, মৎস্য আহরণ, জনস্বাস্থ্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে সর্বমোট ৮ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছে। প্রসঙ্গত, ফারাক্কায় পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ সেচ প্রকল্প জি-কে প্রকল্পে সেচের পানি সরবরাহের কাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে খুলনায় যেসব বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র ও শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছিল, সেসব শিল্পকারখানা ধীরে ধীরে বন্ধ হতে থাকে।

গত শতাব্দীর ষাটের দশকের গোড়ার দিকে ঢাকা ও চট্টগ্রামের পাশাপাশি খুলনা অন্যতম শিল্পনগর হিসেবে বিকাশ লাভ করেছিল। ফারাক্কার পানি প্রত্যাহারের ফলে খুলনার শিল্পোন্নয়ন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভবিষ্যতে এর ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, ১৯৭৭ সালে গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের পর বাংলাদেশ সরকার দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ওপর যেসব বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল, তা নিয়ে অব্যাহতভাবে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের জন্য পানি বোর্ডের অধীনে গঙ্গা সমীক্ষা দপ্তর স্থাপন করে। ফারাক্কায় গঙ্গা নদীর প্রবাহ প্রত্যাহারের ফলে গঙ্গা নদীর ওপর নির্ভরশীল দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোয় প্রাকৃতিক পরিবেশ, ভূ-পরিস্থিতি ও ভূগর্ভস্থ পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধি, সুন্দরবনের ওপর প্রভাব, কৃষি ও জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব নিয়ে নিয়মিত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের জন্য বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে গঙ্গা সমীক্ষা দপ্তর নামে একটি অফিস খোলা হয়।

এ দপ্তরটি ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৯৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত খোলা ছিল এবং জুলাই ১৯৯৬ থেকে সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৯৭৭ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত যেসব সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছিল, তা এখন খুঁজে পাওয়া কঠিন। ১৯৯৬ সালে গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ছিল ৩০ বছর।

ফারাক্কায় ক্রমাগতভাবে পানি প্রবাহ হ্রাস পাচ্ছে। প্রবাহ হ্রাসের অন্যতম প্রধান কারণ হলো ফারাক্কার উজানে ভারতীয় ভূখণ্ডে অব্যাহতভাবে পানি সংরক্ষণাগার ও ব্যারাজ নির্মাণ করে প্রবাহ স্থানান্তর করা। ভারত ইতোমধ্যে তাদের ভূখণ্ডে ছোট, মাঝারি ও বৃহদাকারের ৫৮৪টি ড্যাম নির্মাণ করেছে। এসবের মধ্যে পাঁচটি ড্যামের উচ্চতা ১০০ মিটারের ওপরে। এসব তথ্য ভারত সরকার কর্তৃক প্রকাশিত National Registry of Large Dams 2023-এ পাওয়া গেছে।

১৯৭৭ সালের চুক্তিতে গঙ্গা নদীর পানি প্রবাহ বৃদ্ধির জন্য গঙ্গা নদীর অববাহিকায় সব দেশের সঙ্গে মিলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে অঙ্গীকার করা হয়েছিল। বাংলাদেশের প্রস্তাব ছিল, গঙ্গা নদীর পানি প্রবাহ বৃদ্ধির জন্য নেপালকে আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা। ভারত কখনো এ প্রস্তাব মেনে নেয়নি, যদিও তারা নেপালের সঙ্গে চুক্তি করে গঙ্গার উজানে কয়েকটি নদীর ওপর ড্যাম ও ব্যারাজ নির্মাণ করে ভারতের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে এবং সেচের জন্য ভারতে পানিও স্থানান্তর করছে।

১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ ছিল ৩০ বছর, যা এ বছর ডিসেম্বরে শেষ হবে। ভারত যে পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে কিছু অনায্য সুবিধা আদায় করতে না পারবে, সে পর্যন্ত এ চুক্তি নবায়ন করবে কি না, তা বলা মুশকিল। গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের সময় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে প্রবাহের হিস্যা বাড়ানোর প্রস্তাব তোলা উচিত। পুনরায় গঙ্গা নদীর প্রবাহ বৃদ্ধির জন্য নেপালকেও অন্তর্ভুক্ত করার দাবি উত্থাপন করা দরকার।

আধুনিক প্রযুক্তির ধারণার ভিত্তিতে গঙ্গা নদীর প্রবাহ বৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা যেতে পারে। গঙ্গা নদীর অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনার প্রস্তাব দেওয়া যেতে পারে। প্রবাহ বণ্টনের ক্ষেত্রে শুধু পানির পরিমাণ নিয়ে আলোচনা না করে পানির গুণাগুণ, নদীর পরিবেশ রক্ষা, বিশেষ করে ভাটির দিক থেকে লবণাক্ত পানি যাতে উজানে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য ন্যূনতম প্রবাহ নিশ্চিত করার প্রস্তাব রাখা যেতে পারে।

ভারতের উত্তর প্রদেশ, বিহার ও ঝাড়খণ্ডে গঙ্গা নদীর দুই তীরের অসংখ্য কলকারখানার বর্জ্য অপরিশোধিত অবস্থায় নদীতে ফেলা হয়। এসব বর্জ্যের মধ্যে ভারী ধাতুর বর্জ্য মারাত্মক। গঙ্গা নদীর ভারতীয় অংশে এসব ভারী ধাতুর বর্জ্য নদীতে ফেলা হয়—তার প্রমাণ হলো ভারত সরকারের গঙ্গার পানি বিশুদ্ধকরণ প্রকল্প। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গঙ্গা নদীর দূষণ নিয়ে প্রস্তুত করা প্রকল্প প্রতিবেদনগুলোও আলোচনায় দেওয়ার প্রস্তাব রাখা যেতে পারে।

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী Climate Change বা জলবায়ুজনিত পরিবর্তনের বিষয়টিও আলোচনায় তোলা উচিত। জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি যেসব বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা বর্তমানে পরিচালিত হচ্ছে, তাতে লক্ষ করা যায় যে, গঙ্গা নদীর অববাহিকা অঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ হ্রাস পাবে। অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়বে। এ থেকে প্রতীয়মান হয়, আমরা শুষ্ক মৌসুমে অস্বাভাবিক খরা এবং বর্ষা মৌসুমে বন্যার শিকার হব।

এ ছাড়া সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোর পানির সমতল বৃদ্ধি পাবে। তাতে বাংলাদেশে একটি বিপুল এলাকা সমুদ্রের পানিতে নিমজ্জিত হতে পারে। গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়নের বিষয়ে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সুশীল সমাজকে আরও তৎপর হতে হবে এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করতে হবে।

লেখক: পি.ইঞ্জ. (ইচঊজই), এফ.আই.ই (বি), সদস্য, উপদেষ্টা পরিষদ, চেয়ারম্যান, বিএনপি; এর সাবেক প্রেসিডেন্ট, আইইবি; সাবেক সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  পানি   পরিবেশ ও রাজনীতি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close