শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬,
৬ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: রাষ্ট্রপতির শপথ ঘিরে যেসব সড়ক এড়িয়ে চলার পরামর্শ      নাইজেরিয়ায় নৌকাডুবিতে নিহত ৪৬      বঙ্গভবনে নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণ আজ      ফখরুল ইসলামকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি      রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলামকে চীনের অভিনন্দন      মির্জা ফখরুল ইসলাম ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত      সংবিধানের ৭০ ধারায় পরিবর্তন আসবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
স্ক্রিনে বন্দি প্রজন্ম ও রাষ্ট্রের দায়
আবু হেনা মোস্তফা কামাল
প্রকাশ: শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬, ১০:০৩ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক যুগে প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ আমাদের জীবনযাত্রাকে সহজ ও গতিশীল করেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রযুক্তির এই তীব্র জোয়ারে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হচ্ছে নতুন প্রজন্ম, বিশেষ করে কোমলমতি শিশুরা। বর্তমানে গৃহস্থালির প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে ডিজিটাল ডিভাইসের অবাধ প্রবেশ ঘটছে। টেলিভিশন, স্মার্টফোন, ট্যাবলেট ও কম্পিউটার আজ যেমন যোগাযোগের মাধ্যম কিংবা বিনোদনের উপকরণ, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের সার্বক্ষণিক প্রধান সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই রূপান্তর এত দ্রুত ও অনায়াসে ঘটেছে যে, এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে অধিকাংশ অভিভাবক ও সমাজ সচেতন হওয়ার সময়ই পাননি। শৈশবের ঐতিহ্যবাহী খোলা মাঠের খেলাধুলা, বই পড়া কিংবা স্বজনদের সঙ্গে সরাসরি মিথস্ক্রিয়ার জায়গা দখল করে নিয়েছে উজ্জ্বল নীল আলোর কাচের পর্দা। এই সার্বিক পরিস্থিতি শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশকে এক বিরাট ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে, যা বর্তমান সময়ে অন্যতম প্রধান সামাজিক সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, এক বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য কোনো ধরনের স্ক্রিনটাইম গ্রহণযোগ্য নয় এবং দুই থেকে চার বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা দৈনিক সর্বোচ্চ এক ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। তবে বৈশ্বিক চিত্র এর সম্পূর্ণ বিপরীত। ইউনেস্কো ও ইউনিসেফের সাম্প্রতিক একাধিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ শিশু তাদের নির্ধারিত সীমার চেয়ে দ্বিগুণ বা তিনগুণ বেশি সময় স্ক্রিনের সামনে কাটাচ্ছে। বাংলাদেশে নগরায়ণ ও একক পরিবারপ্রথা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই প্রবণতা আরও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বিভিন্ন চিকিৎসাসংক্রান্ত গবেষণায় দেখা গেছে, শহরের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং গ্রামের প্রায় ৫০ শতাংশ শিশু প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা স্মার্টফোন বা অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসে ব্যয় করে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারিকালে অনলাইন শিক্ষার প্রয়োজনীয়তায় যে ডিভাইসের হাতেখড়ি হয়েছিল, তা পরবর্তীতে অনেক ক্ষেত্রে অনিয়ন্ত্রিত বিনোদন ও গেমসের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

শিশুদের এই অতিরিক্ত স্ক্রিন আসক্তি গুরুতর শারীরিক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে, যা শৈশবের স্বাভাবিক বিকাশের জন্য মারাত্মক অন্তরায়। টানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে শিশুদের চোখে শুষ্কতা, চোখ লাল হওয়া, ঝাপসা দেখা এবং দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ডিজিটাল আই স্ট্রেন’ বা ‘কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম’ বলা হয়। গত এক দশকে শিশুদের মধ্যে চশমা ব্যবহারের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, যার পেছনে অতিরিক্ত স্ক্রিনটাইমের ভূমিকা রয়েছে। এর পাশাপাশি দীর্ঘক্ষণ অলসভাবে বসে স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে শিশুরা। ফলে শৈশবকালীন স্থূলতার হার বাড়ছে, যা পরবর্তীতে কম বয়সে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ ছাড়া ডিভাইসের নীল আলো মস্তিষ্কে মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণে বাধা সৃষ্টি করে, যা শিশুদের স্বাভাবিক ঘুম ব্যাহত করতে পারে। অপর্যাপ্ত ও অনিয়মিত ঘুম শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি স্ক্রিন আসক্তির মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবও গুরুতর। শৈশব হলো মস্তিষ্কের দ্রুত বিকাশের সময়, যখন বাস্তব জগতের স্পর্শ, অনুভূতি ও মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে শিশুর জ্ঞানীয় ও সামাজিক দক্ষতা বিকশিত হয়। কিন্তু স্ক্রিনের অতিরিক্ত উদ্দীপনা শিশুদের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে শিশুদের পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা কমে এবং তাদের মধ্যে অস্থিরতা ও ধৈর্যহীনতা বাড়তে পারে। অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে এডিএইচডি ও বিষণ্নতার উপসর্গের সম্পর্ক নিয়েও বিভিন্ন গবেষণায় আলোচনা হয়েছে। অধিকন্তু, ভিডিও গেম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি কাল্পনিক জগতের সঙ্গে বাস্তব জীবনের পার্থক্যে শিশুরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়তে পারে। গেমসের সহিংস উপাদান শিশুদের আচরণে আগ্রাসন ও মেজাজ খিটখিটে হওয়ার প্রবণতা বাড়াতে পারে। নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী স্ক্রিন না পেলে শিশুদের কান্নাকাটি করা, জিনিসপত্র ভাঙচুর করা এবং অস্বাভাবিক জেদ প্রদর্শন করা এখন অনেক পরিবারের পরিচিত ঘটনা।

সামাজিক বিকাশ ও যোগাযোগ দক্ষতার ক্ষেত্রেও স্ক্রিন আসক্তি এক বিরাট বাধা গড়ে তুলছে। মানুষ মূলত সামাজিক জীব, আর শৈশবেই মানুষ অন্যের আবেগ বুঝতে, সহমর্মিতা প্রকাশ করতে এবং দলবদ্ধভাবে চলতে শেখে। কিন্তু যখন শিশুরা জীবনের একটি বড় অংশ স্ক্রিনের পেছনে ব্যয় করে, তখন বাস্তব জীবনের সামাজিক যোগাযোগের পরিসর সংকুচিত হয়ে যায়। এতে শিশুদের মধ্যে একাকিত্ব বাড়তে পারে। সমবয়সিদের সঙ্গে মিশতে না পারা, সামনাসামনি কথা বলতে দ্বিধাবোধ করা এবং বাস্তব জীবনের জটিল অনুভূতিগুলো বুঝতে না পারার কারণে অনেক শিশু সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে শিশুদের ভাষাগত বিকাশও ব্যাহত হতে পারে। সঠিক সময়ে কথা বলতে না পারা এবং মানুষের মুখের ভাষা বা অঙ্গভঙ্গি অনুধাবন করতে না পারা শিশুদের পরবর্তী জীবনের সামাজিক সফলতার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত, সুপরিকল্পিত ও টেকসই উদ্যোগ। সমাধানের প্রথম ও প্রধান ধাপ শুরু হতে হবে পরিবার থেকেই। মা-বাবা ও অভিভাবকরা হলেন শিশুদের প্রথম ও প্রধান শিক্ষক। অনেক সময় দেখা যায়, সন্তানকে শান্ত রাখতে বা খাবার খাওয়ানোর জন্য অভিভাবকরাই তাদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেন—এই অভ্যাসটি অবিলম্বে ত্যাগ করতে হবে। অভিভাবকদের নিজেদের স্ক্রিনটাইমও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, কারণ শিশুরা উপদেশ শোনার চেয়ে বড়দের অনুসরণ করে বেশি শেখে। পরিবারে একটি নির্দিষ্ট ‘ডিজিটাল ফ্রি জোন’ নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যেমন—খাবার টেবিল ও শোবার ঘর। খাবার খাওয়ার সময় বা ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে পরিবারে সব ধরনের ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার বন্ধ রাখার নিয়ম চালু করতে হবে। একই সঙ্গে শিশুকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া, তাদের সঙ্গে গল্প করা, একসঙ্গে বই পড়া এবং ঘরোয়া খেলায় উৎসাহিত করা জরুরি।

পারিবারিক গণ্ডির বাইরে প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক উদ্যোগ এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রযুক্তি ব্যবহারের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক সম্পর্কে শিশুদের সচেতন করতে হবে। বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম ও দৈনন্দিন রুটিনে মাঠের খেলাধুলা, শারীরিক ব্যায়াম এবং পরিবেশবান্ধব সামাজিক কাজকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বর্তমান নগরায়ণের যুগে শিশুদের খেলাধুলার মাঠের যে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে সরকার ও স্থানীয় নগর পরিকল্পনাবিদদের অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। প্রতিটি আবাসিক এলাকায় উন্মুক্ত পার্ক, খেলার মাঠ এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ স্থান নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা প্রকৃতির সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পায়। পাশাপাশি সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে স্ক্রিন আসক্তির স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে গণসচেতনতামূলক প্রচারণা জোরদার করতে হবে।

প্রযুক্তিকে বাদ দিয়ে চলা এই আধুনিক যুগে সম্ভব নয় এবং তা সমীচীনও নয়। মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত প্রযুক্তির সুষম ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিশ্চিত করা। প্রযুক্তি যেন আমাদের শিশুদের ওপর আধিপত্য বিস্তার না করে, বরং শিশুরা যেন প্রযুক্তিকে জ্ঞান অর্জনের ইতিবাচক মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে পারে—সেই পরিবেশ তৈরি করাই আমাদের দায়িত্ব। তাদের সুস্থ শারীরিক বৃদ্ধি, বিকাশমান মেধা ও মানবিক গুণাবলিভিত্তিক মানসিক বিকাশের জন্য স্ক্রিন আসক্তি থেকে তাদের দূরে রাখা অত্যন্ত জরুরি। একটি স্ক্রিনমুক্ত, প্রাণবন্ত ও আনন্দময় শৈশব উপহার দেওয়ার মাধ্যমে আমরা একটি সুস্থ, স্বাভাবিক ও সচেতন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারি, যা উন্নত ও মানবিক সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত।

লেখক: চিকিৎসক ও কলামিস্ট

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  প্রজন্ম   রাষ্ট্রের দায়  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close