দুই দিন ধরে বোনকে ফোন দিয়ে পাচ্ছিলেন না। শেষে শনিবার রাতে বাসায় এসে দেখেন গেট বন্ধ। বাইরে থেকে ডাকাডাকি করেন। কিন্তু বাড়ির ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ এসে ফটক বন্ধ দেখে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে ডাকে। ফায়ার সার্ভিসের লোকেরা এসে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকতে সহায়তা করে। এরপর বোন, ভগ্নিপতি ও দুই ভাগনে-ভাগনির লাশ দেখতে পান।
শনিবার (২২ আগস্ট) রাত সাড়ে ৮টার দিকে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার একটি তালাবদ্ধ বাসা থেকে রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের লাশ উদ্ধার করা হয়। তাঁদের শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। নিহতরা হলেন—জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী (১৪) ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫)।
স্থানীয়রা বলছেন, শনিবার রাতে প্রীতিলতার বোন পূজা চক্রবর্তী এসে ডাকাডাকি করেন। বাড়ির ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে তিনি পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ এসে ফটক বন্ধ দেখে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে ডাকে। ফায়ার সার্ভিসের লোকেরা এসে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকতে সহায়তা করে। ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্বজন ও প্রতিবেশীরা সেখানে ভিড় করেন। কেউ আহাজারি করছিলেন, কেউ তাঁদের সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন।
পুলিশ ও এলাকাবাসী জানায়, গত দুই দিন ধরে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাসার গেট তালাবদ্ধ ছিল। বাসার দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। প্রীতিলতার বোন পূজা চক্রবর্তী দুই দিন ধরে অনবরত বোনকে ফোন দেওয়ার পরও কেউ ফোন রিসিভ না করায় তাঁর সন্দেহ হয়। এরপর তিনি বাসায় আসেন।
পুলিশ বলছে, গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী ও কন্যার লাশ পাওয়া যায় ছাদের সিঁড়িতে। ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর লাশ পাওয়া যায় বিছানার নিচে। আর গণপতি চক্রবর্তীর লাশ পাওয়া যায় ছাদের এক প্রান্তে।
বাসার ভেতর লাশ পচে যাওয়ার তীব্র গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। মেঝেতে কাপড়-চোপড় ও গয়নার বাক্স পড়ে ছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, শহরের কামাল কাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ায় গণপতি চক্রবর্তীর দোতলা বাড়ির কাজ এখনো শেষ হয়নি। সেই বাড়ির দোতলায় সম্প্রতি পরিবার নিয়ে থাকা শুরু করেছিলেন গণপতি চক্রবর্তী। বাড়ির নিচতলা ফাঁকাই। তাঁরা নতুন এসেছেন বলে এখনো প্রতিবেশীদের সঙ্গে তেমন একটা পরিচয় হয়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন।
রংপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম নাজমুল কাদের বলেন, “ধারণা করা হচ্ছে, দুই-তিন দিন আগে ওই হত্যার ঘটনা ঘটেছে।”
রংপুর সিআইডির দায়িত্বরত কর্মকর্তা ইনচার্জ সুমিত চৌধুরী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সাংবাদিকদের রাত ১টার দিকে বলেন, “আপাতত আমরা যা দেখলাম, তাতে মনে হচ্ছে ডাকাতির ঘটনা। মনে হচ্ছে তিন-চার দিন আগের ঘটনা। বাসার বৈদ্যুতিক সংযোগ ছিল বিচ্ছিন্ন। টাকাপয়সা যেখানে থাকে, সবকিছু ভেঙে ফেলা হয়েছে। গলায় রশি কিংবা গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।”
রংপুর মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (গোয়েন্দা) সনাতন চক্রবর্তী বলেন, “তাদের খুন করা হয়েছে বলে আমরা ধারণা করছি। তাদের গলায় দড়ি প্যাঁচানো রয়েছে। তাদের পুরো ঘরবাড়ি তছনছ অবস্থায় রয়েছে। আমরা ধারণা করছি, এটা ডাকাতি হতে পারে।”
এদিকে স্বজনদের আহাজারিতে চারপাশ ভারী হয়ে উঠেছে। তারা খুনিদের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবি করেছেন। গণপতি চক্রবর্তীর চাচাতো বোন মালতি চক্রবর্তী বলেন, “এটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। আমরা খুনিদের বিচার চাই।”
বাসার ভেতরে আলমারি ভাঙা, মালামাল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা। সোনার অলংকারের বাক্সসহ মালামাল এলোমেলোভাবে পড়ে থাকায় স্বজনদের ধারণা, বাসায় ডাকাতি করে নগদ অর্থ, সোনার অলংকার ও অন্যান্য মালামাল লুট করে নিয়ে যাওয়ার সময় বাধা দেওয়ায় চারজনকে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা।
এ ব্যাপারে রংপুর মহানগর পুলিশের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, “বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আমরা চারজনের মরদেহ উদ্ধার করেছি। ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হবে। সেই সঙ্গে ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।”
কেকে/এলএ