রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬,
৮ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: সাংবিধানিক নিয়মেই হবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন : স্থানীয় সরকারমন্ত্রী      বঙ্গভবনে উঠেছেন নতুন রাষ্ট্রপতি      নৌ ও বিমানবাহিনী নির্বাচনি পর্ষদ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী      তরুণদের প্রশিক্ষণ দিতে ৬৮৩ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প সরকারের      প্রতিবেশী দেশগুলোকে ইরানের হুঁশিয়ারি      সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের নির্দেশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর      হামের উপসর্গ নিয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যু      
দেশজুড়ে
শতবর্ষের দীপশিখা— মাদারগঞ্জের ঝাড়কাটা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়
মাদারগঞ্জ (জামালপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: রোববার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬, ২:১০ পিএম আপডেট: ২৩.০৮.২০২৬ ২:১৩ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার চরপাকেরদহ ইউনিয়নের ঝাড়কাটা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়—শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম নয়; এটি এ অঞ্চলের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। সময়ের স্রোত পেরিয়ে শতবর্ষেরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি জ্বেলে রেখেছে জ্ঞানের প্রদীপ, আলোকিত করেছে অগণিত শিক্ষার্থীর জীবন।

১৯০৭ সালে মাইনর স্কুল হিসেবে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি কালের পরিক্রমায় আজ উপজেলার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ পথচলায় এ বিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে এসেছেন প্রশাসন, সশস্ত্র বাহিনী, চিকিৎসা, শিক্ষা ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পেশার অসংখ্য কৃতী মানুষ। তাদের সাফল্যে গর্বিত হয়েছে বিদ্যালয়, সমৃদ্ধ হয়েছে সমাজ ও দেশ।

প্রায় পাঁচ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টির পেছনে রয়েছে স্থানীয় মানুষের ত্যাগ, ভালোবাসা ও স্বপ্নের গল্প। মোবারক সরকার, লোকমান সরকার, মোহাম্মদ আলী, সাবেত চেয়ারম্যান, সেকান্দর আলী চৌধুরী, আজগর সরকার, মোফাজ্জল, আলতাফ হোসেন, আব্দুস সামাদ, ঘেতা সরকারসহ বহু মানুষ জমি ও অর্থ দিয়ে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখেন। বিদ্যালয়ের প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন ময়মনসিংহের আবুল হোসেন।

১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রথমবারের মতো মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অংশ নেয়। সেই থেকে শিক্ষার অগ্রযাত্রায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।

বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক হৃদয়স্পর্শী জনশ্রুতিও। স্থানীয়দের মুখে মুখে আজও ফিরে আসে ভবঘুরে ক্যাশো পাগলীর গল্প। জানা যায়, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়ে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা যখন বৈঠকে বসেছিলেন, তখন ক্যাশো পাগলী তার কাছে থাকা এক পয়সা বিদ্যালয়ের জন্য দান করেন। একই সঙ্গে ওই স্থানেই বিদ্যালয় গড়ে তোলার অনুরোধ জানান তিনি। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, সেই এক পয়সার দানই ছিল বিদ্যালয়ের প্রথম অনুদান—যে ক্ষুদ্র দানে লুকিয়ে ছিল এক বিশাল স্বপ্নের বীজ।

স্থানীয় সূত্র জানায়, মোবারক সরকার প্রায় আট বিঘা জমি ও সাত হাজার টাকা, লোকমান সরকার দুই একর জমি এবং মোহাম্মদ আলী দুই বিঘা জমি দান করেন। সাবেক চেয়ারম্যান ও সেকান্দর আলী চৌধুরী পাঁচ হাজার টাকা করে দেন। এ ছাড়া আজগর সরকার, মোফাজ্জল, আলতাফ হোসেন, আব্দুস সামাদ ও ঘেতা সরকার তিন বিঘা করে জমি দান করেন। ঝাড়কাটা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকার মানুষও নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী জমি ও অর্থ দিয়ে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মহতী কাজে শামিল হন।

শুধু পাঠ্যবইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি এই শিক্ষালয়ের আলো। খেলাধুলা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও বিদ্যালয়টির রয়েছে দীর্ঘদিনের সুনাম। জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধেও এ প্রতিষ্ঠানের অনেক প্রাক্তন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন ও সাহস উৎসর্গ করেছেন।

বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব কামরুল হাসান কমল, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা আব্দুল হালিম, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা আকিল আহমেদ, বাংলাদেশ সংযুক্ত শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মোকাদ্দেম হোসেন, সেনাবাহিনীর সাবেক কর্নেল মোস্তাকিম বিল্লাহ, জামালপুর জেলা স্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক সোলাইমান, জামালপুর মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক, মেডিসিন ও বাতরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. কবিরুল হাসান বিন রকীব (মুক্তা), নাক-কান-গলা রোগ বিশেষজ্ঞ ও সার্জন ডা. মেহেদী হাসান এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধা রবিউল ইসলাম হারাইসহ আরও অনেকে। শতাধিক প্রাক্তন শিক্ষার্থী বর্তমানে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।

বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রায় ৩৫০ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। তাদের পাঠদানের জন্য রয়েছে তিনতলা দুটি ও একতলা একটি একাডেমিক ভবন। রয়েছে সমৃদ্ধ লাইব্রেরি ও মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ। ১৩ জন শিক্ষক ও ছয়জন কর্মচারী নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টি থেকে ৪২ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এর আগের বছর, ২০২৫ সালে পরীক্ষার্থী ছিল ৫০ জন।

বিদ্যালয়টির দীর্ঘ অবদানের কথা তুলে ধরে অত্র বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও অত্র বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মোঃ নজমুল হক বলেন, “ঝাড়কাটা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি এ অঞ্চলের মানুষের গর্ব ও বিশ্বাসের নাম।” 

তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি হাজারো শিক্ষার্থীকে শিক্ষিত করে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলেছে। শতবর্ষের ঐতিহ্য রক্ষা করে আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে নিতে বিদ্যালয়ের উন্নয়ন কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহ মো. আনিছুর রহমান বলেন, “এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ঝাড়কাটা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় এ অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে আসছে। আমাদের অনেক প্রাক্তন শিক্ষার্থী প্রশাসন, সেনাবাহিনী, চিকিৎসা ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পেশায় সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।” 

তিনি জানান, শিক্ষার মানোন্নয়ন ও সহশিক্ষা কার্যক্রমকে গুরুত্ব দিয়ে বিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার চেষ্টা চলছে। সবার সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য ও সাফল্যের ধারা ভবিষ্যতেও অম্লান থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

এক পয়সার সেই ভালোবাসা থেকে শুরু হয়েছিল যে স্বপ্নের যাত্রা, তা আজ শতবর্ষ পেরিয়ে এক বিশাল বটবৃক্ষে রূপ নিয়েছে। তার ছায়ায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম জ্ঞান, মানবিকতা ও দেশপ্রেমের পাঠ নিচ্ছে। সময় বদলেছে, বদলেছে শিক্ষার ধরন; কিন্তু ঝাড়কাটা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের আলোকবর্তিকা আজও জ্বলছে—অন্ধকার ভেদ করে নতুন প্রজন্মের পথ দেখিয়ে।


কেকে/সাশ 


আরও সংবাদ   বিষয়:  শতবর্ষ   ঝাড়কাটা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close