দীর্ঘ ৩০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে হামলা, মামলা, কারাবরণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন সোনাগাজী উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব ইমাম হোসেন প্রবীর। রাজনৈতিক সহিংসতায় গুরুতর আহত হয়ে তার শরীরে ৯৯টি সেলাই এবং দুই পা ও এক হাতে সাড়ে ৫ কেজি ওজনের বিভিন্ন প্লেট বসানো হয়। পরিবারের শেষ সম্বল বিক্রি করে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিতে হয়েছে তাকে। অথচ চোরাই গাড়ির যন্ত্রাংশ উদ্ধারের ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে বহিষ্কার করা হয়েছে তাকে। তার দাবি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্রেই এই বহিষ্কারাদেশ দেওয়া হয়েছে।
ইমাম হোসেন প্রবীর সোনাগাজী উপজেলা জিয়া পরিষদের সভাপতি ও সোনাগাজী সদর ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তার দাবি, বিএনপির রাজনীতির কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাকে ৫২টি মামলায় আসামি করা হয় এবং বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকতে হয়েছে। ১৯৯৭ ও ১৯৯৯ সালেও তিনি কারাবরণ করেন।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর তার বাড়িঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে বলে দাবি করেন প্রবীর। ওই সময় তার মা ও সন্তানও হামলার শিকার হন। এরপর ২০১৪ সালের মার্চে ফেনীর ধলিয়ার বালুয়া চৌমুহনী এলাকায় তার ওপর হামলা হয়। হামলায় হাত-পা ভেঙে গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে ফেলে যায় হামলাকারীরা। পরে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতাল ও মিরপুরের সেলিনা জেনারেল হাসপাতালে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নেন তিনি।
প্রবীর বলেন, “দীর্ঘ ৩০ বছর রাজনীতি করে হামলা-মামলা, জেল-জুলুম সহ্য করে একেবারে নিঃস্ব ও সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছি। পরিবারের শেষ সম্বল জায়গাজমি বিক্রি করে চিকিৎসা করিয়েছি। এখনো শরীরে থাকা প্লেটগুলো অর্থের অভাবে খুলতে পারিনি।”
তার ভাষ্য, ২০১৭ সালে তার ভাই ইকবাল হোসেন বিপ্লবকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়। আরেক ভাইকেও অস্ত্র দিয়ে ফাঁসিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এসব ঘটনায় তাদের পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সম্প্রতি চট্টগ্রামের ইপিজেড এলাকা থেকে চুরি হওয়া একটি ট্রাকের যন্ত্রাংশ সোনাগাজীর সদর ইউনিয়নের ছাড়াইতকান্দিতে তাদের পরিত্যক্ত বাড়ির পুকুরপাড় থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। ওই ঘটনায় প্রবীরকে জড়িয়ে রাজনৈতিকভাবে অপপ্রচার চালানো হয় বলে অভিযোগ তার। তার দাবি, গত ১৭ বছর ধরে বাড়িটি পরিত্যক্ত এবং পরিবারের কেউ সেখানে বসবাস করেন না।
চট্টগ্রাম ইপিজেড থানার এসআই আল আমিন বলেন, চোরাই গাড়ির যন্ত্রাংশ একটি পরিত্যক্ত বাড়ির পুকুরের পাশ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল। এ সময় বাড়িটিতে কেউ ছিলেন না। যুবদল নেতা ইমাম হোসেন প্রবীরের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গাড়ি চুরির সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা খুঁজে পাওয়া যায়নি।’
প্রবীরের দাবি, পুলিশ তার সম্পৃক্ততা না পাওয়ার পরও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে ভুল তথ্য দিয়ে তাকে বহিষ্কার করিয়েছে। তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে আমার রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা চলছে। চোরাই গাড়ির ঘটনায়ও আমাকে পরিকল্পিতভাবে জড়ানো হয়েছে।”
দলের তৃণমূলের কয়েকজন নেতাকর্মীও অভিযোগ করছেন, বিএনপি সরকার গঠনের পর দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের তুলনায় নতুন করে সক্রিয় হওয়া অনেকেই সাংগঠনিকভাবে প্রভাবশালী হয়ে উঠছেন। এতে ত্যাগী নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
সোনাগাজী পৌরসভার সাবেক মেয়র ও উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক জামাল উদ্দিন সেন্টু বলেন, “দলের কঠিন সময়ে যারা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, আজ তাঁদেরই অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। এতে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মনোবল ভেঙে যাচ্ছে।”
ফেনী সদর উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক নিজাম উদ্দিন মাস্টার বলেন, “যারা দীর্ঘদিন আন্দোলনে ছিলেন না, তারা এখন দলে প্রভাব বিস্তার করতে চাইছেন। তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করা প্রয়োজন।”
তবে বহিষ্কারের বিষয়ে কেন্দ্রীয় যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, “দলীয় সোর্সের মাধ্যমে তথ্য পাওয়ার পর তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আমাদের সোর্সের দেওয়া ভুল তথ্যে কেউ বহিষ্কার হয়ে থাকলে কেন্দ্র বিষয়টি পুনরায় বিবেচনা করবে।”
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, হামলা-মামলা ও গুরুতর আহত হওয়ার পরও বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে সোনাগাজীর বিএনপির তৃণমূলে আলোচনা চলছে। প্রবীরের দাবি, তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা যাচাই করে তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হোক।
কেকে/সাশ