রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬,
৮ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু      ভূরুঙ্গামারীতে গুদাম ভেঙে ১০ হাজার কেজি সার নিয়ে গেলেন কৃষকরা      পদ্মা ব্যাংকের সাবেক এমডিসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন      বঙ্গভবনে কার্যক্রম শুরু করলেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল      ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় স্কুলশিক্ষকসহ চারজনকে হত্যা      সাংবিধানিক নিয়মেই হবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন : স্থানীয় সরকারমন্ত্রী      বঙ্গভবনে উঠেছেন নতুন রাষ্ট্রপতি      
দেশজুড়ে
প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে স্বপ্ন ছোঁয়ার অদম্য ইচ্ছা জুড়ীর মনার
মো. এহসানুল হক, মৌলভীবাজার
প্রকাশ: রোববার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬, ৮:৫৪ পিএম
অদম্য প্রতিবন্ধী তরুণী মনা বেগম। ছবি: প্রতিবেদক

অদম্য প্রতিবন্ধী তরুণী মনা বেগম। ছবি: প্রতিবেদক

‘প্রতিবন্ধকতা’ মানেই অক্ষমতা নয়—এ কথাটি বারবার প্রমাণ করে চলেছেন মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার এক অদম্য তরুণী মনা বেগম। শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে জয় করে তিনি ইতোমধ্যে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। এখন তার লক্ষ্য উচ্চশিক্ষা অর্জন করা। কিন্তু অভাবের সংসারে মনার এই অদম্য যাত্রাপথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দারিদ্র্য।

মনা বেগম জুড়ী উপজেলার গোয়ালবাড়ী ইউনিয়নের রত্না চা-বাগানের ফাঁড়ি এলাপুর গ্রামের দিনমজুর হারিছ আলী ও আমিনা বেগম দম্পতির মেয়ে।

জন্মের পর থেকেই তার বাঁ হাত ও বাঁ পায়ে শক্তি নেই। নিজের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ানোর সামর্থ্যও নেই তার। কিন্তু মনের জোরে তিনি শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে হার মানিয়েছেন। হাতের ওপর ভর দিয়ে প্রতিদিন প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ হামাগুড়ি দিয়ে পাড়ি দিয়ে তিনি কলেজে গিয়েছেন। তাঁর শিক্ষাজীবনের পথচলা ছিল বন্ধুর।

শামস উদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পিএসসি, সাগরনাল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং সবশেষ শাহ নিমাত্রা সাগরনাল-ফুলতলা ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ২.৫০ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি।

মনার স্বপ্ন এখন ডিগ্রি পাস কোর্সে ভর্তি হওয়া এবং উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে একটি সরকারি চাকরি পাওয়া। এর মাধ্যমে তিনি তার দরিদ্র বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে চান। কিন্তু তার এই স্বপ্ন এখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। জরাজীর্ণ ঘরে দিনমজুর বাবার সামান্য আয়ে সংসার চালানোই যেখানে দায়, সেখানে ডিগ্রিতে ভর্তি, বইপত্র কেনা ও নিয়মিত যাতায়াতের খরচ জোগানো মনার পরিবারের জন্য এক অসম্ভব চ্যালেঞ্জ।

শামসুদ্দিন আহমদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিরঞ্জন চাষা বলেন, ‘মনা ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ও পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহী ছিল। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সে সব বাধা জয় করে স্কুলে নিয়মিত আসত। শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপে মনাকে শুনতে হয়েছে অসংখ্য মানুষের তাচ্ছিল্য ও কটূক্তি। “হাত নেই, পা নেই, পড়ে কী করবি”—এমন অবজ্ঞাসূচক কথা তাকে মানসিকভাবে আঘাত করলেও তার অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে টলাতে পারেনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘কলেজ শেষে ঘরে ফিরে সে গৃহস্থালির কাজেও মাকে সহায়তা করে।’

মনা বেগম বলেন, ‘জীবনযুদ্ধে হার মানতে চাই না বলেই পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছি। স্বাভাবিক মানুষের মতো চলাফেরা করতে পারি না। হামাগুড়ি দিয়ে চলতে দেখে অনেকে হাসাহাসি করে, টিকটক বানায়, খুব কষ্ট লাগে। আবার অনেকেই সাহস দেয়, খোঁজ নেয়।’

তিনি বলেন, ‘ডিগ্রি পাস কোর্সে ভর্তি হয়ে শিক্ষাজীবন শেষ করে চাকরি করার স্বপ্ন দেখছি। কিন্তু আম্মা-আব্বা বলছেন, আর্থিক দুর্বলতা এবং প্রতিকূলতার কারণে আর লেখাপড়া করাবেন না। আমি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাই। কিন্তু বই কেনারও সামর্থ্য আমাদের নেই।’

মনা আরও বলেন, ‘বাড়ি থেকে অনেক কষ্ট করে হামাগুড়ি দিয়ে মূল সড়কে গিয়ে গাড়িতে উঠতে হয়। ফেরার সময় শরীর এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়ে যে, অনেক সময় শ্বাস নিতেও কষ্ট হয়।’

মনার মা আমিনা বেগম বলেন, ‘আমার মেয়ে জন্মগতভাবে প্রতিবন্ধী। আমি কোনোদিন তাকে সেই নজরে দেখিনি। আমার অন্য স্বাভাবিক সন্তানদের মতোই তাকে বড় করছি। সে পড়ালেখা করতে চেয়েছে। আমি নিজের কোলে বহন করে স্কুল থেকে শুরু করে কলেজ পর্যন্ত নিয়ে গেছি।’

তিনি বলেন, ‘আমি অনেক কষ্ট করে আমার মেয়েকে মানুষ করছি। তবে প্রায়ই মেয়েটার শরীর ভালো থাকে না। কিছু পথ গেলেই হাঁপায়। চিকিৎসা, ওষুধ লাগে। লেখাপড়া করাতেও টাকা লাগে। যা রোজগার হয়, তা দিয়ে কোনোভাবে সংসার চলে।’

আমিনা বেগম আরও বলেন, ‘সরকারের প্রতিবন্ধী ভাতা হিসেবে মনা প্রতি মাসে ৮৫০ টাকা পায়, যা তিন মাস পরপর হাতে আসে। তবে তার পড়াশোনা নির্বিঘ্নে চালিয়ে নিতে একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা (অটোরিকশা) বা বাহন এবং শিক্ষা খরচের জন্য নিয়মিত সহযোগিতা প্রয়োজন। আমার মেয়ের শারীরিক কষ্ট লাঘব এবং উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার ও বিত্তবানদের কাছে সাহায্যের আকুল আবেদন করছি।’

মনার কয়েকজন প্রতিবেশী বলেন, ‘মনাকে আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখেছি। পড়ালেখার প্রতি তার খুবই আগ্রহ। সহপাঠীদের সঙ্গে মিশে চলতে পারে। ওর পরিবারের খুব একটা ভালো অবস্থা নেই। তারপরও অনেক কষ্ট করে মনা পড়ালেখা শিখেছে।’

তারা বলেন, ‘মেয়েটি যেন জীবনযুদ্ধে হেরে না যায়, সে জন্য এলাকাবাসীও মনার পাশে দাঁড়ানোর জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।’

মনার কলেজের অধ্যক্ষ জহির উদ্দিন বলেন, ‘মনার ইচ্ছা আর দশজন স্বাভাবিক মানুষের মতো। আমাদের কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকে দেখেছি, ওর মায়ের কোলে করে কলেজে এসেছে। শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও ওর পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ আমাকে মুগ্ধ করেছে। সে খুব উদ্যমী ছাত্রী। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনোই তার ইচ্ছাশক্তিকে দমাতে পারেনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘ওর সাহসিকতা দেখে আরও প্রতিবন্ধী ছেলে-মেয়েরা শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হবে। আমরা তাকে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আসছি। আগামীতেও আমাদের পক্ষ থেকে এ সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত থাকবে।’

তবে ইতোমধ্যে জুড়ী উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মনা বেগমকে শুভেচ্ছা উপহার দেওয়া হয়েছে।

মনার সাফল্য প্রমাণ করে, অর্থনৈতিক সংকট মেধার বিকাশ থামিয়ে দিতে পারে না। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম ও অধ্যবসায় থাকলে প্রতিকূলতা জয় করে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  প্রতিবন্ধকতা   অদম্য ইচ্ছা   মনা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close