একটি হাউসবোট থেকে টাঙ্গুয়ার হাওরে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলো। স্থানীয় এক তরুণ প্রতিবাদ করলেন, ভিডিও প্রকাশ করলেন, বিষয়টি পরিবেশ অধিদপ্তরের নজরে এলো, সরেজমিন তদন্ত হলো এবং সংশ্লিষ্ট হাউসবোট মালিককে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হলো।
ঘটনাটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কারণ নাগরিক প্রতিবাদ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, প্রশাসনিক নজরদারি এবং আইনি পদক্ষেপ- এই চারটি স্তর যখন একসঙ্গে কাজ করে, তখন আইন প্রয়োগের একটি কার্যকর পথ তৈরি হয়। কিন্তু এখানেই কি আমাদের দায়িত্ব শেষ? একটি হাউসবোটের বিরুদ্ধে নোটিস দিয়ে কি টাঙ্গুয়ার হাওরের ক্রমবর্ধমান পরিবেশগত সংকটের সমাধান সম্ভব? বরং এই ঘটনাটি আরও বড় একটি প্রশ্ন সামনে আনে- যে জলাভূমিতে প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক, শত শত নৌযান, বিপুল প্লাস্টিক, মানববর্জ্য ও শব্দদূষণ ঢুকছে, সেখানে বিচ্ছিন্ন অভিযান আর জরিমানা দিয়ে কতদিন প্রকৃতিকে বাঁচানো যাবে?
টাঙ্গুয়ার হাওর দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট এবং প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ)। এটি কোনো সাধারণ বিনোদনকেন্দ্র নয়; এটি একটি জীবন্ত প্রতিবেশব্যবস্থা। মাছের প্রজনন, পাখির বিচরণ, জলজ উদ্ভিদের বিস্তার, কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা- সবকিছু এখানে পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। অথচ গত দুই দশকে হাওরের ওপর মানুষের চাপ এমনভাবে বেড়েছে যে প্রকৃতির নিজস্ব পুনরুদ্ধারের সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। পর্যটন বেড়েছে। হাউসবোট বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টাঙ্গুয়ার হাওরের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসছেন। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কি পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা তৈরি হয়েছে? উত্তরটি হতাশাজনক।
পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ হাজার পর্যটক হাওরে প্রবেশ করেন বলে স্থানীয় পর্যায়ে যে হিসাব পাওয়া যায়, তাদের উৎপন্ন বর্জ্যের পরিমাণ একবার কল্পনা করা যাক। প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট, স্ট্র, প্লেট, খাবারের উচ্ছিষ্ট, কাঁচের বোতল -এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে মানববর্জ্য। কিন্তু এই বিপুল বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও নিরাপদ নিষ্পত্তির জন্য হাওরে সরকারি নির্দেশিত স্থায়ী ও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা কাঠামো কোথায়? হাওর পরিদর্শনে এসে হাউসবোটে দু-চারটি প্লাস্টিকের বিন তুলে দেওয়া হয়। ছবি তোলা হয়, প্রচার হয়। কিন্তু সেই বিনে জমা হওয়া বর্জ্য কোথায় যাবে? কে তা সংগ্রহ করবে? কে পরিবহন করবে? কোথায় তা নিরাপদে নিষ্পত্তি হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর না থাকলে বিন দেওয়া পরিবেশ ব্যবস্থাপনা নয়; বরং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি দৃশ্যমান প্রতীক মাত্র।
আরও গুরুতর সমস্যা পয়ঃনিষ্কাশন। প্রতিটি হাউসবোট ও পর্যটকবাহী নৌযানে কার্যকর বর্জ্য ধারণ ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থা না থাকলে মলমূত্র সরাসরি হাওরের পানিতে মিশবে। হাজার হাজার মানুষের মানববর্জ্য প্রতিদিন একটি সংবেদনশীল জলাভূমিতে জমা হতে থাকলে তার দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত অভিঘাত কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা অনুমান করা কঠিন নয়। তাই প্রতিটি হাউসবোট ও পর্যটকবাহী নৌযানে বায়ো-টয়লেট, বর্জ্য ধারণকারী ট্যাংক এবং বর্জ্য ফেরত নেওয়ার বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা এখনই কার্যকর করা দরকার।
কাঁচের বোতলের সমস্যাটিও অবহেলা করার মতো নয়। পর্যটকদের ফেলে যাওয়া এলকোহলজাত দ্রব্যের বোতল ভাঙা কাঁচে কৃষিমৌসুমে কৃষকের পা কেটে রক্তাক্ত হওয়ার ঘটনা স্থানীয়ভাবে শোনা যায়। পর্যটন যদি কৃষকের জন্য এমন ঝুঁকি তৈরি করে, তাহলে সেই পর্যটনের সামাজিক মূল্য নিয়েও প্রশ্ন তুলতে হবে। পরিবেশের পাশাপাশি মানুষের জীবনও এখানে অনিরাপদ।
চলতি বছর টাঙ্গুয়ার হাওর ও আশপাশের জলপথে অগ্নিকাণ্ড, নৌযানের সংঘর্ষ, পানিতে ডুবে মৃত্যু এবং হাউসবোটের মেশিনে পড়ে শিশুমৃত্যুসহ একাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। ৫ জুন হাউসবোটের মেশিনে পড়ে আট বছরের সৌম্যতা সরকার নিঝুমের মৃত্যু, ১০ জুন হাউসবোট ও মালবাহী নৌযানের সংঘর্ষে নৌশ্রমিক আমিন মিয়ার মৃত্যু এবং ২১ আগস্ট চলন্ত হাউসবোট থেকে পড়ে ১০ বছরের রুকাইয়া নূর নিখোঁজ ও পরে মৃতদেহ উদ্ধার হওয়ার ঘটনা পর্যটন নিরাপত্তার ভয়াবহ দুর্বলতা সামনে এনেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা। তাহিরপুরে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন ও জনবল থাকলেও ডুবুরি নেই। জেলা সদর থেকে ডুবুরি দল পৌঁছাতে তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। পানিতে ডুবে যাওয়া একজন মানুষের ক্ষেত্রে এই সময় কোনো প্রশাসনিক বিলম্ব নয়; এটি জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান। তাহলে প্রশ্ন হলো- পর্যটন চালু রাখার আগে পর্যটকের জীবন রক্ষার ন্যূনতম অবকাঠামো নিশ্চিত করা হলো না কেন?
প্রশাসন অবশ্য বসে নেই। ২ আগস্ট ১৩ দফা নির্দেশনা জারি হয়েছে। সংরক্ষিত এলাকায় ইঞ্জিনচালিত নৌযানের প্রবেশ ঠেকাতে লাল নিশান টাঙানো হয়েছে, বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়েছে এবং নির্দেশনা অমান্যকারী হাউসবোটকে জরিমানা করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ স্বাগতযোগ্য। কিন্তু সমস্যা হলো- নির্দেশনা যতটা দৃশ্যমান, তার প্রয়োগ ততটা স্থায়ী নয়। এখানেই আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট।
গত দুই দশকে সভা হয়েছে, প্রকল্প হয়েছে, কমিটি হয়েছে, পরিদর্শন হয়েছে, নির্দেশনা হয়েছে, অভিযান হয়েছে। কিন্তু হাওরের পরিবেশগত ধারণক্ষমতা নির্ধারণ করা হয়নি। প্রতিদিন সর্বোচ্চ কতজন পর্যটক প্রবেশ করতে পারবেন? কতটি হাউসবোট চলতে পারবে? কোন মৌসুমে কোথায় প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকবে? কতটুকু বর্জ্য হাওর বহন করতে পারে? কোন নৌপথ ব্যবহার করা যাবে? এসব প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক উত্তর ছাড়া পর্যটন পরিচালনা করা মানে প্রকৃতির সহনশীলতাকে পরীক্ষার বিষয় বানানো।
তাই এখন মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত- টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটন কীভাবে বাড়ানো যায়; হাওর কতটা পর্যটন সহ্য করতে পারে। প্রকৃতির ধারণক্ষমতা নির্ধারণ না করে পর্যটন চালু রাখা যাবে না। প্রতিদিনের পর্যটকসংখ্যা ও নৌযানের সংখ্যা সীমিত করতে হবে। প্রবেশপথে নিবন্ধন ও নির্দিষ্ট কোটা চালু করতে হবে। সংবেদনশীল মৌসুম ও এলাকাগুলোতে পর্যটন সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হবে। হাউসবোটের লাইসেন্সের সঙ্গে পরিবেশগত শর্ত যুক্ত করতে হবে এবং বারবার আইন ভঙ্গ করলে লাইসেন্স বাতিল করতে হবে। একই সঙ্গে হাওরের ওপর বাইরের উৎস থেকে আসা দূষণও নজরদারির আওতায় আনতে হবে। পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে আসা রাসায়নিক দূষণ, স্থানীয় কৃষিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ও অন্যান্য দূষণকারী উপাদান পরীক্ষা করে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
জলাভূমির স্বাস্থ্য কেবল পর্যটন নিয়ন্ত্রণে রক্ষা হবে না; পুরো অববাহিকাকে বিবেচনায় নিয়ে ব্যবস্থাপনা করতে হবে। আর এই ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় মানুষকে বাদ দেওয়া যাবে না। হাওর যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চেনে, তাদের অভিজ্ঞতাকে প্রশাসনিক কাঠামোর বাইরে রেখে সংরক্ষণ সফল হবে না। স্থানীয় বাসিন্দা, জেলে, কৃষক, নৌশ্রমিক, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও নিরপেক্ষ নাগরিক প্রতিনিধিদের যুক্ত করে স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি অবশ্যই কঠিন : প্রয়োজনে টাঙ্গুয়ার হাওরে সাধারণ পর্যটন সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হবে। এটি পর্যটনবিরোধী অবস্থান নয়। বরং প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই পর্যটন প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত। নির্দিষ্ট সময় হাওরকে মানুষের পর্যটন চাপ থেকে মুক্ত রেখে তার পরিবেশগত স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য, পানির গুণমান, বর্জ্য পরিস্থিতি নিয়ে স্বাধীন বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন করা দরকার। প্রকৃতি কতটা পুনরুদ্ধার করতে পারে, সেটিও দেখতে হবে। তারপর পর্যটন চালু হলে সেটি হবে নিয়ন্ত্রিত, সীমিত ও প্রকৃতিবান্ধব পর্যটন- অবাধ পর্যটন নয়। কারণ রামসার সাইট কোনো বিনোদন পার্ক নয়। হাওর কোনো মানুষের আনন্দের জন্য তৈরি মঞ্চও নয়। এটি নিজস্ব নিয়মে চলা একটি জীবন্ত প্রতিবেশব্যবস্থা। সেখানে প্রকৃতির অস্তিত্ব মানুষের বিনোদনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা যদি এখনো ভাবি, আরও কয়েকটি অভিযান, আরও কয়েকটি জরিমানা কিংবা আরও কয়েকটি বিলবোর্ড দিয়েই টাঙ্গুয়ার হাওরকে বাঁচানো যাবে, তাহলে আমরা মূল সমস্যাটিই এড়িয়ে যাব। সমস্যা আইন নেই- এটি নয়; সমস্যা হলো প্রকৃতির ধারণক্ষমতার চেয়ে মানুষের চাপ বেশি। টাঙ্গুয়ার হাওরকে তাই এখন কিছুদিন বিশ্রাম দিতে হবে। আগে প্রকৃতিকে বাঁচাতে হবে, তারপর পর্যটনকে বাঁচাতে হবে। কারণ মৃত হাওরে পর্যটনকেন্দ্র থাকতে পারে, কিন্তু টাঙ্গুয়ার হাওর থাকবে না।
লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
কেকে/ এমএস