শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬,
১৩ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের তালিকায় যুক্ত হলো ৩৩৮ বাংলাদেশি এজেন্সি      ডেঙ্গুতে নতুন করে ৩৪২ জন হাসপাতালে      হামের উপসর্গে পাঁচ শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১১৭০      মুদি পণ্যের বাজার অস্থিরতা, বাড়ছে তেল-চিনি-ময়দা-ডিমের দাম      নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আবারও বন্যার আশঙ্কায় উদ্ধারকাজ স্থগিত করল চীন      রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাবে মালয়েশিয়া      নভেম্বরে কপ-৩১ সম্মেলনে যোগ দিতে তুরস্ক যাবেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
মিডিয়া ফ্রেমিং, সরকারি যোগাযোগ ও রাজনৈতিক পারসেপশনের নতুন বাস্তবতা
২৫ টাকার বিদ্যুৎ নাকি ময়লা থেকে বিদ্যুৎ? শিরোনামেই কি বদলে যায় বাস্তবতা
প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন মিলন
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৩০ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

‘চীন থেকে ২৫ টাকা ইউনিটে বিদ্যুৎ কিনবে সরকার’—একটি সংবাদ শিরোনাম। কিন্তু এই কয়েকটি শব্দের মধ্যেই কি পুরো ঘটনাটি ধরা পড়ে? নাকি একটি বড় প্রকল্পের সবচেয়ে আলোচিত এবং সবচেয়ে বিতর্কিত একটি অংশকে সামনে এনে তৈরি হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট পারসেপশনে? প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে শুধু একটি বিদ্যুৎ প্রকল্পের কথা বলা হচ্ছে না; প্রশ্ন উঠছে তথ্য কীভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায় এবং সেই তথ্য থেকে কীভাবে জনমত তৈরি হয়।

ঘটনাটি কী?

ঢাকার সাভারের আমিনবাজারের দীর্ঘদিনের বিশাল বর্জ্যভূমিকে কাজে লাগিয়ে একটি চীনা প্রতিষ্ঠান ওয়েস্ট-টু-এনার্জি
প্রকল্পের মাধ্যমে ৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরকার প্রতি ইউনিট ২৫ টাকা দরে কিনবে। আগামী ১৮ মাসের মধ্যে সরবরাহ শুরুর প্রত্যাশা রয়েছে। অর্থাৎ, বিষয়টি চীন থেকে বিদ্যুৎ আমদানি নয়। ঢাকার ময়লা প্রক্রিয়াজাত করে দেশেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ।

এখন প্রশ্ন হলো—এই ঘটনাটিকে আমরা কীভাবে বলব? একটি শিরোনাম হতে পারে— ‘চীন থেকে ২৫ টাকা ইউনিটে বিদ্যুৎ কিনবে সরকার।’ অন্যদিকে বলা যায়—‘আমিনবাজারের ময়লা থেকে ৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ—ওয়েস্ট-টু-এনার্জি প্রকল্পে নতুন সম্ভাবনা।’ তথ্য একই। কিন্তু মানুষের প্রথম প্রতিক্রিয়া কি একই হবে? নিশ্চয়ই নয়।

প্রথম শিরোনামে চোখ আটকে যায় ‘চীন’ এবং ‘২৫ টাকা’-তে। স্বাভাবিক প্রশ্ন—বিদ্যুতের দাম এত বেশি কেন? দ্বিতীয় শিরোনামে সামনে আসে ‘ময়লা’, ‘ওয়েস্ট-টু-এনার্জি’ এবং ‘৪২ মেগাওয়াট’। তখন প্রশ্নটি হয়—ময়লা থেকে বিদ্যুৎ কীভাবে? এটাই মিডিয়া ফ্রেমিং।

তথ্য মিথ্যা না হলেও, তথ্যের নির্বাচন, বিন্যাস ও উপস্থাপন মানুষের পারসেপশনকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে ২৫ টাকা নিয়ে প্রশ্ন থাকবে—এবং থাকতেই হবে। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। মিডিয়া ফ্রেমিংয়ের কথা বলার অর্থ এই নয় যে ২৫ টাকা ইউনিটের মূল্য নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না। বরং প্রশ্ন করা গণমাধ্যমের দায়িত্ব।

এই মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হলো? প্রকল্পের মোট ব্যয় কত? দীর্ঘমেয়াদে সরকারের আর্থিক দায় কত? ওয়েস্ট-টু-এনার্জি প্রকল্পের পরিবেশগত সুবিধা কতটা? একই ধরনের প্রকল্পের আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বেনঞ্চমার্ক কী? এসব প্রশ্নের উত্তর জনগণের জানা উচিত। স্বচ্ছতা ছাড়া কোনো প্রকল্পই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু একটি বিষয়ও মনে রাখতে হবে—দামের প্রশ্ন আর প্রকল্পের পুরো পরিচয় এক করে ফেলা এক জিনিস নয়।

সরকারের বড় দুর্বলতা কোথায়?

আমার দৃষ্টিতে সমস্যাটি শুধু মিডিয়ার ফ্রেমিংয়ে নয়; সরকারের কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটেজিতেও। একটি ভালো প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেই সরকারের দায়িত্ব শেষ হয় না। জনগণকে বুঝিয়ে বলতে হয়—কেন প্রকল্পটি নেওয়া হলো, কোন সমস্যা সমাধান হবে, এর সুবিধা কী এবং সরকারের আর্থিক দায় কতটুকু। এখনকার মিডিয়া বাস্তবতা অনেক বদলে গেছে। মিডিয়া মানে শুধু সংবাদপত্র, টেলিভিশন, প্রেস রিলিজ কিংবা সংবাদ সম্মেলন নয়।

আজকের মিডিয়া হলো—হেডলাইন + ভিজ্যুয়াল + সোশ্যাল মিডিয়া + রিপিটিশন + ন্যারেটিভ + পারসেপশন। একটি ধারণা যদি বারবার মানুষের সামনে আসে, একসময় সেটিই মানুষের কাছে পুরো বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠতে পারে। তাই সরকার নিজের কাজের ন্যারেটিভ নিজে তৈরি করতে ব্যর্থ হলে অন্য কেউ সেই ন্যারেটিভ তৈরি করবে—এটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু এখানেই আরেকটি বিপদ—অতি কথন। সরকারের যোগাযোগ কৌশলে যেমন নীরবতা সমস্যা, তেমনি অতি কথনও সমস্যা। কোনো প্রকল্প নিয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বক্তব্য, অতিরঞ্জিত দাবি কিংবা দায়িত্বের সীমা অতিক্রম করে মন্তব্য—এসব শেষ পর্যন্ত সরকারের জন্য সুফল বয়ে আনে না। বিশেষ করে কারিগরি, অর্থনৈতিক, জ্বালানি কিংবা অবকাঠামো প্রকল্পের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার বাইরে গিয়ে বক্তব্য দেওয়া মোটেও মঙ্গলজনক নয়। কারণ সরকার যখন একাধিক জায়গা থেকে একাধিক ব্যাখ্যা দেয়, তখন তথ্যের চেয়ে বিভ্রান্তিই বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

একজন বললেন এক কথা, আরেকজন বললেন আরেক কথা—মিডিয়া তখন প্রকল্পের মূল বিষয় ছেড়ে বক্তব্যের অসঙ্গতিই আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসবে। ফলে যে প্রকল্পের ইতিবাচক ফলাফল নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল, সেটিই পরিণত হবে ‘সরকারের বক্তব্যে অসঙ্গতি’ শিরোনামে। সুতরাং সরকারের যোগাযোগ নীতির মূলনীতি হওয়া উচিত খুব সহজ—সঠিক তথ্য। সঠিক ব্যক্তি। সঠিক সময়ে। পরিষ্কার ভাষায়। 

শুধু সরকার নয়, বিএনপির জন্যও এটি বড় শিক্ষা। এই বাস্তবতা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের সমালোচনা করা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু প্রতিটি সমালোচনা যদি কেবল হেডলাইননির্ভর হয়, তাহলে রাজনৈতিক বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

রাজনৈতিক দলকে তাই জানতে হবে—কী ঘটেছে? কেন ঘটেছে? এর সুবিধা কী? সমস্যা কোথায়? জনগণ কীভাবে দেখছে? ভালো উদ্যোগ হলে তার ইতিবাচক দিক স্বীকার করতে হবে। সমস্যা থাকলে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রশ্ন করতে হবে। ব্লাইন্ড ডিফেন্স যেমন বিপজ্জনক, ব্লাইন্ড অপজিশনও তেমনি বিপজ্জনক। আজকের রাজনীতিতে প্রয়োজন ইনফর্মড কমিউনিকেশন।

শেষ প্রশ্ন—ন্যারেটিভ কার হাতে?

একটি সরকার রাস্তা বানাতে পারে, বিদ্যুৎকেন্দ্র করতে পারে, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে, নতুন শিল্প স্থাপন করতে পারে। কিন্তু জনগণের কাছে সেই কাজটির গল্প কে বলবে? সরকার? বিরোধী দল? গণমাধ্যম? নাকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো অজ্ঞাত উৎস? এই প্রশ্নটির উত্তর আজকের রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাস্তবতা এবং মানুষের পারসেপশন সবসময় এক জিনিস নয়।

একটি সরকার ভালো কাজ করেও রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যদি সেই কাজের ব্যাখ্যা জনগণের কাছে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। আবার একটি বিরোধী দল সঠিক প্রশ্ন তুলেও জনসমর্থন হারাতে পারে, যদি তার বক্তব্য তথ্যের পরিবর্তে শুধু রাজনৈতিক আক্রমণে সীমাবদ্ধ থাকে।

তাই শিক্ষা একটাই সরকারের জন্য—ভালো কাজ করুন। তথ্য প্রকাশ করুন। স্বচ্ছ থাকুন। অতি কথা বলবেন না। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাকে কথা বলতে দিন।

রাজনৈতিক দলের জন্য—তথ্য জানুন। প্রশ্ন করুন। যুক্তি দিন এবং নিজের ন্যারেটিভ নিজেই তৈরি করুন। আর গণমাধ্যমের জন্য—একটি শিরোনাম যেন সত্যের অংশ হয়, পুরো সত্যের বিকল্প নয়। কারণ শেষ পর্যন্ত—‘তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছায়; কিন্তু তথ্যের ফ্রেমিং মানুষের পারসেপশন তৈরি করে। আর সেই পারসেপশনই অনেক সময় রাজনীতির ফলাফল নির্ধারণ করে।’

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন মিলন   মিডিয়া ফ্রেমিং   পারসেপশন   কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটেজি   ইনফর্মড কমিউনিকেশন  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close