রোববার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২২ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: নদীদখল ও দূষণ রোধে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর      গোপালগঞ্জে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাত্রীবাহী বাস খাদে, নিহত ৩      জ্বালানি সংকট নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ      কিছু রাজনৈতিক দল বিভ্রান্তির মাধ্যমে অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে : প্রধানমন্ত্রী      বাসায় গ্যাস-বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে এমন কার্ড চাইলেন আসিফ মাহমুদ      নিউইয়র্ক সফরে ট্রাম্প-তারেক রহমানের বৈঠকের সম্ভাবনা      হামে আরও চার শিশুর মৃত্যু, নতুন রোগী ৯১৭      
দেশজুড়ে
গঙ্গাচড়ার শতবছরের ‘জোড় মন্দির’ এখন বিলীনের পথে
নির্মল রায়, গঙ্গাচড়া (রংপুর)
প্রকাশ: রোববার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:১৮ পিএম আপডেট: ০৬.০৯.২০২৬ ৪:২০ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার ঠাকুড়াদহ গ্রামের ঐতিহাসিক জোড় মন্দির এখন অস্তিত্ব সংকটে। দীর্ঘদিনের অযত্ন, বৃষ্টির পানি, রোদ ও গাছপালার আগ্রাসনে মন্দিরটির বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়েছে। আগাছা, বাঁশঝাড় ও জঙ্গলে প্রায় ঢেকে গেছে পুরো স্থাপনাটি। কোথাও ধসে পড়েছে দেয়াল ও কক্ষ, আবার কোথাও কেবল ইটের দেয়ালের সামান্য অংশ টিকে আছে।

স্থানীয়দের দাবি, কয়েক শত বছরের পুরোনো এই মন্দির দ্রুত সংরক্ষণ করা না হলে অচিরেই হারিয়ে যেতে পারে এর শেষ চিহ্নটুকুও। তবে মন্দিরটির প্রকৃত বয়স, নির্মাণকাল ও প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নিশ্চিত করতে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

উপজেলার বড়বিল ইউনিয়নের ঠাকুড়াদহ গ্রামে অবস্থিত স্থাপনাটি স্থানীয়ভাবে ‘জোড় মন্দির’ নামে পরিচিত। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, মন্দিরটির বয়স প্রায় ৪০০ বছর। স্থানীয় ইতিহাসবিষয়ক গ্রন্থ গঙ্গাচড়া উপজেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য-এ মন্দিরটি অষ্টাদশ শতক কিংবা তারও আগে নির্মিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্থানীয় ইতিহাসের বর্ণনা অনুযায়ী, একসময় মন্দিরের সামনে দুটি দোতলা চূড়া ছিল। পরে এর সঙ্গে আরও চারটি ছোট চূড়া যুক্ত হয়। প্রবেশপথের দুই পাশে ছিল সিংহের মূর্তি। সময়ের পরিক্রমায় এসবের অধিকাংশই বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে কোনোভাবে একটি চূড়া টিকে আছে। পুরোনো দেয়ালের বিভিন্ন অংশে এখনো পোড়ামাটির কারুকাজের নিদর্শন দেখা যায়।

স্থাপত্যের ধরন ও ব্যবহৃত ইট দেখে স্থানীয়ভাবে এটিকে অষ্টাদশ শতক বা তারও আগের নবরত্ন মন্দির বলে ধারণা করা হয়। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান প্রয়োজন।

স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, মন্দিরের পাশে ‘শেখ কুয়া’ নামে একটি কুয়া ছিল। সেখানে কষ্টিপাথরের কয়েকটি মূর্তি ছিল বলেও প্রচলিত রয়েছে। মন্দিরের দক্ষিণ পাশে একই সময়ে নির্মিত তিনতলা একটি মঠও ছিল বলে জানান প্রবীণরা। পাকিস্তান আমলে মঠটি ধ্বংস হয়ে যায় বলে তাদের দাবি।

একসময় মন্দিরকে ঘিরে নিয়মিত পূজা, রাসলীলা ও মেলার আয়োজন হতো। এসব আয়োজনে দূরদূরান্ত থেকে মানুষের সমাগম ঘটত। মন্দির প্রাঙ্গণ থাকত উৎসবমুখর। স্থানীয় বাবু জামিনি চন্দ্রের ভাষ্য, একসময় মন্দিরটি দোতলা ছিল এবং ইটের গায়ে নানা ধরনের কারুকাজ ও প্রাণীর অবয়ব ছিল।

স্থানীয় প্রবীণ কুমোদ রায় বলেন, “আগে পূজা ও রাসমেলার সময় পুরো এলাকা মানুষের ভিড়ে মুখর হয়ে উঠত। এখন সেসব শুধু স্মৃতি।”

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ১৯৮০ সালের দিকে মন্দিরটির নিয়মিত কার্যক্রম অনেকটাই বন্ধ হয়ে যায়। এরপর পূজা ও রক্ষণাবেক্ষণও অনিয়মিত হয়ে পড়ে।” তবে ১৯৮০ সালের পরও অন্তত দুবার রাসমেলাসহ পূজার আয়োজন করা হতো বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

মন্দিরটি ঘিরে নানা লোককথাও প্রচলিত রয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের বিশ্বাস, এক রাতেই মন্দির ও পাশের পুকুর তৈরি হয়েছিল। আবার মাটির নিচে মূল্যবান নিদর্শন বা সম্পদ থাকার কথাও লোকমুখে প্রচলিত। তবে এসব তথ্যের কোনটি ঐতিহাসিক সত্য আর কোনটি নিছক লোককথা, তা গবেষণার মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, মন্দিরের ভেতর ও চারপাশে বিভিন্ন ধরনের গাছপালা ও আগাছা জন্মেছে। পুরোনো দেয়ালের গায়ে গাছের শিকড় ছড়িয়ে পড়েছে। বৃষ্টি ও রোদের ক্ষয়েও দুর্বল হয়ে পড়েছে ইটের গাঁথুনি। এতে অবশিষ্ট স্থাপনাটিও যেকোনো সময় আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয় নবীন কুমার বলেন, “মন্দিরটি কত বছরের পুরোনো এবং কে এটি নির্মাণ করেছিলেন, তা গবেষণার মাধ্যমে বের করা দরকার। শুধু লোকমুখে প্রচলিত তথ্যের ওপর নির্ভর করে ইতিহাস সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়।”

পূজা উদযাপন পরিষদ গঙ্গাচড়া উপজেলা শাখার সহসভাপতি শ্যামল চন্দ্র বলেন, “ঐতিহাসিক স্থাপনাটি রক্ষায় সরকারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এটি সংরক্ষণ করা হলে নতুন প্রজন্ম এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে।”

বড়বিল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সামছুল হুদা বলেন, “দীর্ঘদিন অযত্নে থাকায় মন্দিরটির বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর প্রকৃত ইতিহাস ও বয়স অনুসন্ধানের পাশাপাশি দ্রুত সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া দরকার।”

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রংপুর ফিল্ড অফিসার আবু সাইদ ইনাম তানভিরুল বলেন, “মন্দিরটির ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব যাচাইয়ে প্রাথমিকভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সরেজমিন পরিদর্শনের পর বিস্তারিত প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।”

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক ড. আহমেদ আবদুল্লাহ বলেন, “স্থাপনাটি সংরক্ষণের উপযুক্ত প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রধান কার্যালয়ে প্রতিবেদন পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

কেকে/সাশ 


আরও সংবাদ   বিষয়:  গঙ্গাচড়া   জোড় মন্দির  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close