বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৬ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: বাজারে স্বস্তির জায়গা নেই      ভারতের বিদ্যুৎ করিডর বাংলাদেশের মরণফাঁদ      গ্যাসের চাহিদা মেটাতে ১৮ কার্গো এলএনজি কিনবে সরকার      বিগত সরকারের প্রকল্পের দুর্নীতির তদন্ত হচ্ছে, রিপোর্ট পেলে ব্যবস্থা : প্রধানমন্ত্রী      ফ্যাসিস্টদের হাত থেকে মুক্তি পেলেও অনেক বেশি মূল্য দিতে হয়েছে : রাষ্ট্রপতি      ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলবে ইলেকট্রিক ট্রেন : প্রধানমন্ত্রী      রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী পদের আগে ‘মহামান্য’ ও ‘মাননীয়’ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা      
খোলাকাগজ স্পেশাল
ঢাকা সেন্ট্রাল ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল
ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুকে দূষিত স্যালাইন পুশ
শিপার মাহমুদ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৪৪ এএম আপডেট: ১০.০৯.২০২৬ ৯:৫০ এএম

ঢাকা সেন্ট্রাল ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত এক শিশুকে দূষিত বা নষ্ট স্যালাইন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্বজনদের দাবি, প্রায় আট ঘণ্টা ধরে ওই স্যালাইন শিশুটির শরীরে প্রবেশ করেছে। পরে স্যালাইনের ভেতরে ফাঙ্গাস বা ছত্রাকের মতো পদার্থ দেখতে পান তারা। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্যালাইনটি সরিয়ে নেয়। 

ভুক্তভোগী শিশুটির নাম মো. আরহাম আল আজিজ (৮)। বর্তমানে সে ওই হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন।

শিশুটির বাবা মাহবুব আজিজের অভিযোগ, গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত প্রায় ২টার দিকে তার ছেলের স্যালাইন পরিবর্তন করা হয়। তখন শিশু ঘুমিয়ে থাকায় অন্ধকার কক্ষে নতুন স্যালাইন লাগিয়ে দিয়ে যান দায়িত্বরত নার্স। এরপর সকাল প্রায় ১০টা পর্যন্ত স্যালাইনটি চলতে থাকে। তিনি বলেন, ‘রাতের বেলা আমার ছেলে ঘুমিয়ে ছিল। নার্স এসে স্যালাইন লাগিয়ে দিয়ে যায়। আমরা কয়েকবার ডিউটি ডাক্তার ও নার্সকে স্যালাইন ঠিকমতো চলছে কি না, তা দেখতে বলেছি। তারা দেখে জানিয়েছে, সব ঠিক আছে।’

তার ভাষ্য, সকাল ৯টা থেকে ১০টার দিকে ঘুম থেকে উঠে শিশুটি নিজেই স্যালাইনের ভেতরে কিছু একটা নড়াচড়া করতে দেখে। পরে ভালোভাবে তাকালে স্যালাইনের মধ্যে বড় ধরনের ফাঙ্গাস বা ছত্রাকের মতো পদার্থ দেখা যায়। তখন বিষয়টি নিয়ে তারা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানান।

শিশুটির বাবা বলেন, ‘সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, কয়েক ঘণ্টা ধরে ওই স্যালাইন আমার ছেলের শরীরে প্রবেশ করেছে। এ সময় তার শরীর প্রচণ্ড গরম হয়ে যায়, ঘামতে থাকে এবং কাঁপুনি হয়। শরীরে লালচে দাগ দেখা দেয় ও প্রচণ্ড চুলকানি শুরু হয়।’ প্রথমে তারা এসব উপসর্গকে ডেঙ্গুর প্রভাব হিসেবে মনে করেছিলেন বলে জানান তিনি। তবে স্যালাইনের ভেতরে অস্বাভাবিক পদার্থ দেখতে পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরে চিকিৎসক এসে স্যালাইনটি খুলে ফেলেন।

মাহবুব আজিজের দাবি, স্যালাইন পরিবর্তনের কিছুক্ষণ পরই শিশুটির শরীরের লালচে দাগ, চুলকানি এবং অস্বাভাবিক গরমভাব কমে আসে। এ কারণে দূষিত স্যালাইনের কারণে শিশুটির শরীরে কোনো প্রতিক্রিয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, ‘আমরা অন্য চিকিৎসকদের সঙ্গেও কথা বলেছি। তারা জানিয়েছেন, দূষিত স্যালাইন শরীরে প্রবেশ করলে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে।’

ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্যালাইনটি নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেছেন শিশুটির বাবা। তার দাবি, প্রথমে সংশ্লিষ্ট কর্মীরা দুঃখ প্রকাশ করেন। পরে হাসপাতালের ডেপুটি ডিরেক্টরসহ কয়েকজন কর্মকর্তা এবং কাস্টমার সার্ভিসের ম্যানেজার তাদের সঙ্গে কথা বলেন।

মাহবুব আজিজ বলেন, হাসপাতালের পক্ষ থেকে বিষয়টি তদন্ত করে জানানো হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হলেও পরে তারা কোনো লিখিত প্রতিবেদন বা পরিষ্কার ব্যাখ্যা পাননি। স্যালাইনটি পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে কি না এবং পরীক্ষার ফল কী— সে বিষয়েও তাদের বিস্তারিত জানানো হয়নি বলে অভিযোগ তার।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা সেন্ট্রাল ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. সাদিক সালেহীন বলেন, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট নার্স ও চিকিৎসককে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। একইসঙ্গে স্যালাইন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ওরিয়ন ইনফিউশনকেও কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

ডা. সাদিক সালেহীন বলেন, শিশুটির নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাটি ঘটার পর চিকিৎসক ও নার্সরা শিশুটির বিষয়ে অতিরিক্ত সতর্ক রয়েছেন এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, যাতে পরবর্তী সময়ে কোনো ধরনের সমস্যা না হয়।

সম্ভাব্য সংক্রমণ হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে স্যালাইনের নমুনা কালচার পরীক্ষার জন্য পাঠানোর কথাও জানান তিনি।

তবে এর আগে হাসপাতালের ডেপুটি ম্যানেজার (অপারেশনস) মুহাম্মদ আশরাফ আমিন গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, ওই শিফটে দায়িত্ব পালনকারী চিকিৎসক ও নার্সকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে এবং স্যালাইন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানকেও বিষয়টি লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে চাকরি থেকে অব্যাহতির কোনো নথি কিংবা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া চিঠির কপি দেখাতে পারেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কাগজপত্র চাইলে মুহাম্মদ আশরাফ আমিন বলেন, ‘ম্যানেজমেন্টের পক্ষ থেকে বাধ্যবাধকতা আছে, তাই এখন দেওয়া যাবে না। দু-একদিন সময় দেন, পাঠিয়ে দেব।’

তবে শুধু স্যালাইন নিয়ে নয়, হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও অভিযোগ করেছেন শিশুটির বাবা। তার অভিযোগ, শিশুটির বেডের চাদর অপরিষ্কার ছিল এবং তাতে রক্তের দাগও ছিল। বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানানোর পরও তাৎক্ষণিকভাবে চাদর পরিবর্তন করা হয়নি। প্রায় আধা ঘণ্টা পর সেটি পরিবর্তন করা হয়।

এ ছাড়া রুমের বিভিন্ন জিনিস যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, একটি টুল ভাঙা ছিল এবং রুমের একটি দরজা বা অংশ এমন অবস্থায় ছিল, যা পড়ে গেলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। হাসপাতালের খাবার সরবরাহ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী বাইরে থেকে খাবার আনার সুযোগ না থাকলেও নির্ধারিত সময়ে খাবার সরবরাহ করা হয়নি বলে দাবি করেন শিশুটির স্বজনরা।

এ অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও খাবার সরবরাহে কিছুটা সমস্যা হওয়ার কথা স্বীকার করেছে। তাদের ভাষ্য, হাসপাতালের ক্যান্টিন সম্প্রতি চালু হওয়ায় খাবার সরবরাহে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের তুলনায় দেরিতে খাবার দেওয়ার বিষয়টিও তারা অবগত।

শিশুর স্বজনদের সঙ্গে হাসপাতালের নার্স ও স্টাফদের দুর্ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপ-পরিচালক ডা. সাদিক সালেহীন। তিনি বলেন, ‘দুর্ব্যবহার করা হয়নি। শিশুটির পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের মধ্যে অতিরিক্ত উদ্বেগ ও সতর্কতা কাজ করছিল।’ তবে শিশুর স্বজনদের অভিযোগ, ঘটনার ছবি ও ভিডিও ধারণের সময় তাদের বাধা দেওয়া হয় এবং বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলার পরও তারা প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি।

ঘটনাটি নিয়ে স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, শিশু রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসাসেবায় সামান্য ত্রুটিও গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে কোনো ইনফিউশন বা স্যালাইন দূষিত অবস্থায় রোগীর শরীরে প্রবেশ করেছে কি না, তা যথাযথভাবে তদন্ত করা জরুরি।

বিষয়টি শুধু দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক বা নার্সের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে দেখার সুযোগ নেই। স্যালাইন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা ও নার্সিং কর্মীদের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। কীভাবে দূষিত স্যালাইন হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছাল, কীভাবে তা রোগীকে দেওয়া হলো এবং দায়িত্বপ্রাপ্তরা পর্যবেক্ষণের পরও কেন বিষয়টি আগে শনাক্ত করতে পারলেন না— এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি বলেও মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন— জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা উপকরণই যদি দূষিত অবস্থায় রোগীর শরীরে প্রবেশ করে, তাহলে সেটিকে কোনোভাবেই সাধারণ বা অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল হিসেবে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ভূমিকা খতিয়ে দেখে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  ডেঙ্গু   আক্রান্ত   দূষিত স্যালাইন  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close