ফুলের বাগান, বিক্রেতাবিহীন সততা স্টোর, পাঠাগার, রিডিং কর্নার, বিজ্ঞান কর্নার, মানবতার দেয়াল ও ল্যাংগুয়েজ অ্যান্ড ডিবেটিং ক্লাব—নানা সৃজনশীল উদ্যোগে বদলে গেছে নাটোরের লালপুর উপজেলার ৯৮ নম্বর বড়বাদকয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ। শ্রেণিকক্ষের পাঠকে সহজ ও আনন্দময় করতে তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন মডেল ও শিক্ষাসামগ্রী। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. সাইফুল ইসলাম সুইট।
২০২৩ সাল থেকে সাইফুল ইসলামের উদ্যোগে বিদ্যালয়ে একের পর এক সৃজনশীল কার্যক্রম চালু করা হয়। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোসা. নাসিমা খাতুনের সহযোগিতায় এসব কার্যক্রম ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ১০৪ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।
পাঠ্যবইয়ের কঠিন বিষয়গুলো সহজে বোঝাতে বিদ্যালয়ে তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন মডেল ও শিক্ষাসামগ্রী। থ্রিডি মডেল, ম্যাজিক বক্স, সংখ্যা পুকুর, বর্ণ বৃক্ষ, যোগযন্ত্র ও ট্রাফিক বাতির মডেলের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। দিন-রাত, অমাবস্যা-পূর্ণিমা, নামতা, যোগ, বর্ণমালা ও ট্রাফিক সংকেতসহ বিভিন্ন বিষয় এসব উপকরণের মাধ্যমে বোঝানো হয়।
পড়াশোনায় পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে ‘রিডিং কর্নার’। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে সহায়ক পাঠ দেওয়া হয়। বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে রয়েছে ‘আলোকিত শিশু পাঠাগার’। বিদ্যালয়ের বই পড়ার পাশাপাশি পছন্দের বই বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার সুযোগও রয়েছে শিক্ষার্থীদের।
শিক্ষার্থীদের সততা ও দায়িত্ববোধ শেখাতে চালু করা হয়েছে ‘বিক্রেতাবিহীন সততা স্টোর’। সেখানে কোনো বিক্রেতা নেই। শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে নিজেরাই নির্ধারিত মূল্য পরিশোধ করে। এতে ছোটবেলা থেকেই সততা ও আত্মনির্ভরতার চর্চার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহমর্মিতা ও সহযোগিতার মানসিকতা গড়ে তুলতে রয়েছে ‘মানবতার দেয়াল’। ‘বন্ধুর প্রতি বাড়িয়ে দাও তোমার হাত’ স্লোগানে পরিচালিত এ কার্যক্রমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের অতিরিক্ত বা ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী রেখে যায়। প্রয়োজন হলে অন্য শিক্ষার্থীরা সেগুলো ব্যবহার করে।
সম্প্রতি বিদ্যালয়ে চালু হয়েছে ‘ল্যাংগুয়েজ অ্যান্ড ডিবেটিং ক্লাব’। নির্দিষ্ট দিনে শিক্ষার্থীরা উপস্থিত বক্তৃতা, উপস্থাপনা ও বিতর্কে অংশ নেবে। এর মাধ্যমে তাদের ভাষাগত দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস ও যুক্তিভিত্তিক চিন্তার বিকাশ ঘটানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজেও ব্যবহার করা হচ্ছে প্রযুক্তি। রেজাল্ট তৈরি, রেজাল্ট কার্ড, প্রত্যয়নপত্র ও ট্রান্সফার সার্টিফিকেটসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ অনলাইন স্কুল ম্যানেজমেন্ট অ্যাপের মাধ্যমে করা হচ্ছে।
শিক্ষক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষক ও সুযোগ-সুবিধার সংকট আছে, এটা সত্য। কিন্তু শিশুদের শেখার আগ্রহ তৈরি করতে সব সময় বড় বাজেট লাগে না। নিজেদের উদ্যোগে যতটুকু সম্ভব, সেটুকু দিয়েই শিক্ষার্থীদের জন্য আনন্দময় পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছি।’
তবে এত উদ্যোগের মধ্যেও বিদ্যালয়টির বড় সমস্যা শিক্ষকসংকট। ছয়জন শিক্ষকের অনুমোদিত পদের মধ্যে চারটিই শূন্য। প্রধান শিক্ষকের পদটি ২০১৩ সাল থেকে শূন্য রয়েছে। বর্তমানে মাত্র দুজন শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল। পাঠদান স্বাভাবিক রাখতে সম্প্রতি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে দুইজন শিক্ষককে ছয় মাসের জন্য সাময়িকভাবে বিদ্যালয়টিতে সংযুক্ত করা হয়েছে।
বিদ্যালয়টির সামনে প্রায় এক কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে রাস্তাটি কাদায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। শিক্ষকসংকটের পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থার এই সমস্যাও বিদ্যালয়টির দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ।
লালপুর উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. লুৎফর রহমান বলেন, ‘সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সহকারী শিক্ষক সাইফুল ইসলাম শিক্ষার্থী ও শিক্ষকবান্ধব বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের সহযোগিতায় তিনি বিদ্যালয়টিকে আনন্দময় ও স্মার্ট শিক্ষালয়ে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কয়েকবার বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছি। শিক্ষকসংকট থাকলেও শিক্ষার মানের দিক থেকে বিদ্যালয়টি পিছিয়ে নেই।’
লালপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোসা. নার্গিস সুলতানা বলেন, ‘সীমাবদ্ধতার মধ্যেও প্রত্যন্ত গ্রামের এই বিদ্যালয়টি এগিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষকসংকটের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এরই মধ্যে পাঠদান স্বাভাবিক রাখতে দুইজন শিক্ষককে ছয় মাসের জন্য সাময়িকভাবে সংযুক্ত করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, সৃজনশীল ও শিক্ষার্থীবান্ধব উদ্যোগ নেওয়ায় শিক্ষক সাইফুল ইসলামকে উপজেলা শিক্ষা অফিসের পক্ষ থেকে উৎসাহ দিতে সংবর্ধনা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, উপজেলায় এমন স্মার্ট বিদ্যালয়ের উদ্যোগ এটিই প্রথম।
শিক্ষকসংকট, কাঁচা রাস্তা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার সীমাবদ্ধতা থাকলেও সাইফুল ইসলামের উদ্যোগে বিদ্যালয়টির শেখার পরিবেশে পরিবর্তন এসেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ও শিক্ষা উপকরণে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পাওয়া গেলে এসব উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করা সম্ভব।
কেকে/সাশ