যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পরও কূটনৈতিক সমাধানের পথেই থাকার কথা জানিয়েছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাত নিরসনে আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান সম্ভব।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে আরাগচি বলেন, হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করার বিষয়ে ইরানের শর্ত স্পষ্ট। এসব শর্ত পূরণ হলেই প্রণালী খুলে দেওয়ার বিষয়ে অগ্রসর হবে তেহরান। তার ভাষায়, অচলাবস্থা থেকে বের হওয়ার একমাত্র পথ হলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান।
গত সপ্তাহে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ইরান একটি শান্তি প্রস্তাব দেয়। কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে প্রস্তাবটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে জানায় তেহরান। তবে শনিবার ট্রাম্প জানান, তিনি ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “ইরান হরমুজ প্রণালী দ্রুত খুলে দিতে চুক্তি করতে চাইছে, কারণ দেশটি ‘খুব খারাপভাবে হারছে’।” তবে কূটনীতির পথ পুরোপুরি বন্ধ করেননি তিনি। রোববার অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক ফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান, চলতি সপ্তাহে দুই দেশের আলোচনাকারীরা আরও বৈঠকে বসতে পারেন।
এদিকে আরাগচি বলেন, “ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীরা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি তেহরানকে জানায়নি।” তিনি বলেন, মধ্যস্থতাকারীদের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত অবস্থান জানার অপেক্ষায় রয়েছে ইরান। এরপর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
হরমুজ নিয়ে ইরানের অবস্থান
হরমুজ প্রণালীতে ইরানি হামলার কারণে ওই অঞ্চলে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরানের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামি বলেন, যুদ্ধ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ধারক পর্যায়ে রয়েছে। বিদেশি শক্তি কৌশলগত জলপথ ব্যবহার করবে অথচ ইরান নিজে বাণিজ্য করতে পারবে না—এমন পরিস্থিতি তেহরান মেনে নেবে না বলেও জানান তিনি।
যুদ্ধে আরও জড়িয়ে পড়ছে সৌদি আরব
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার মধ্য দিয়ে বর্তমান সংঘাত শুরু হয়। এরপর যুদ্ধবিরতি ও নতুন করে হামলার মধ্য দিয়ে সংঘাত চলতে থাকে। এতে হাজারো মানুষ নিহত হওয়ার পাশাপাশি ইরানের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত এবং দেশটির দুর্বল অর্থনীতি আরও চাপে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এর জবাবে ইরান ও তার মিত্ররা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় সংঘাত ছড়িয়ে দিয়েছে। ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথিরাও সৌদি আরবের স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
চলতি মাসে সৌদি আরবও সংঘাতে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে। ইয়েমেনে হুথি যোদ্ধাদের অগ্রগতিতে সৌদি-সমর্থিত বাহিনী পিছু হটেছে এবং লোহিত সাগর দিয়ে সৌদি তেল রপ্তানির ওপর নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিরা সৌদি আরবের দিকে একাধিকবার হামলা চালিয়েছে। পরিস্থিতির সম্ভাব্য অবনতির মধ্যে রিয়াদের কিছু স্কুল কর্তৃপক্ষ অভিভাবকদের জানায়, সপ্তাহজুড়ে ক্লাস অনলাইনে অনুষ্ঠিত হবে। তবে এ সিদ্ধান্তের কারণ জানানো হয়নি এবং সৌদি কর্তৃপক্ষও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
এদিকে ইয়েমেনের হুথি-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির তাইজ প্রদেশের মাওইয়া এলাকায় একটি বাজারে হামলায় সাতজন নিহত ও ৪০ জন আহত হয়েছেন। নিহত ও আহতদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। পরে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার দাবি করে, ওই এলাকায় হুথিদের একটি সামরিক শিবির ও কয়েকটি যানবাহন লক্ষ্য করে তাদের বাহিনী হামলা চালিয়েছে।
জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব, চাপে বৈশ্বিক অর্থনীতি
হরমুজ প্রণালী ঘিরে সংঘাতের প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহেও। নিউইয়র্কে কূটনৈতিক তৎপরতার সময় ইরান সৌদি আরবের সঙ্গেও হরমুজ প্রণালী নিয়ে আলোচনা করেছে। সাত মাস ধরে চলা সংঘাতের কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে তেল পরিবহন ব্যাহত হয়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়ছে।
শুক্রবার জাতিসংঘে সাংবাদিকদের আরাগচি জানান, ইরানের প্রস্তাব গ্রহণ করা হলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া এবং আঞ্চলিক সংঘাতে সাময়িক বিরতি কার্যকর করার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি চুক্তিতে পৌঁছে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার বিষয়ে আন্তরিক হয়, তাহলে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রয়েছে। এরপর দুই পক্ষ পারস্পরিকভাবে সম্মত বিষয়গুলো নিয়ে বৃহত্তর আলোচনায় বসতে পারে। এর মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিও আলোচনার বিষয় হতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স
কেকে/সাশ