গাজীপুরের শ্রীপুরের ব্যস্ততম মাওনা চৌরাস্তার ফ্লাইওভারে ৬৪টি সড়কবাতির মধ্যে জ্বলছে মাত্র চারটি। দীর্ঘদিন ধরে অচল হয়ে আছে বাকি ৬০টি। স্থানীয়দের দাবি, অন্তত পাঁচ বছর ধরে রাত নামলেই প্রায় অন্ধকারে ডুবে থাকে গুরুত্বপূর্ণ এই উড়ালসড়ক। এতে দূরপাল্লার বাস থেকে রাতে নামা যাত্রী, পথচারী ও স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অন্ধকারের সুযোগে ছিনতাই, চুরি ও মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অপরাধের আশঙ্কার কথাও জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর বাতিগুলো অচল থাকলেও সেগুলো সচলের কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। সন্ধ্যার পর ফ্লাইওভারের ওপরের অংশে নেমে আসে ঘন অন্ধকার। বিশেষ করে মধ্যরাতে দূরপাল্লার বাস থেকে নামা অপরিচিত যাত্রীরা বেশি ঝুঁকিতে পড়েন। পাশাপাশি পর্যাপ্ত আলো না থাকায় পথচারীদের চলাচলেও তৈরি হয় ভোগান্তি।
শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত মাওনা চৌরাস্তা দিন-রাত ব্যস্ত থাকে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মানুষ, আশপাশের শিল্পকারখানার শ্রমিক-কর্মচারী এবং দূরপাল্লার বাসের যাত্রীদের আনাগোনায় রাতেও সরগরম থাকে এলাকা। এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ফ্লাইওভারে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
অটোচালক আল মাহমুদ বলেন, ‘রাতে ফ্লাইওভারের ওপর প্রায় পুরোটা অন্ধকার থাকে। দু-একটি বাতি জ্বললেও সেগুলোও নিভু নিভু। অন্ধকারের সুযোগে অপরাধীরা এখানে অবস্থান করে। রাতে যাত্রী ও পথচারীদের চলাচলে ভয় লাগে।’
পথচারী আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘মধ্যরাতে দূরপাল্লার বাস থেকে অনেক যাত্রী ফ্লাইওভারের ওপর নামেন। তারা জায়গাটি সম্পর্কে অপরিচিত থাকেন। অন্ধকারে তাঁদের সহজেই বিপদে পড়ার আশঙ্কা থাকে। সড়কবাতিগুলো দ্রুত সচল করা দরকার।’
মাওনা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, ‘ফ্লাইওভারের অধিকাংশ বাতিই অচল। অল্প কয়েকটি জ্বলে। ফলে ওপরের অংশে অন্ধকার থাকে। পুলিশ সেখানে আলাদা নজর রাখে, যাতে কোনো ধরনের অপরাধ সংঘটিত না হয়। বাতিগুলো দ্রুত মেরামত করা প্রয়োজন।’
৭০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মাণ
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল মাওনা ফ্লাইওভার উদ্বোধন করা হয়। অ্যাপ্রোচ সড়কসহ প্রায় ৯০০ মিটার দীর্ঘ ও ১৯ মিটার প্রশস্ত ফ্লাইওভারটি নির্মাণে ব্যয় হয় ৭০ কোটি টাকার বেশি। এর মূল অংশের দৈর্ঘ্য ৪৫০ মিটার।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পের আওতায় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের মাধ্যমে নির্মিত হয় ফ্লাইওভারটি। চালুর পর ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মাওনা চৌরাস্তা অংশে যানজট অনেকটাই কমে আসে। দ্রুতগামী ও দূরপাল্লার যানবাহন ফ্লাইওভার দিয়ে চলাচল করায় নিচের সড়কেও যানবাহনের চাপ কমে যায়।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ফ্লাইওভার চালুর পর মাওনা চৌরাস্তা ঘিরে ব্যবসা-বাণিজ্যেরও প্রসার ঘটেছে।
স্থানীয় হোটেল ব্যবসায়ী বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘ফ্লাইওভার হওয়ার পর মাওনার চিত্র অনেক বদলে গেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য বেড়েছে, মানুষের আনাগোনাও বেড়েছে। এত গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রাতে পর্যাপ্ত আলো না থাকা দুর্ভোগের বিষয়।’
৬৪ বাতির মধ্যে জ্বলছে চারটি
মাওনা ফ্লাইওভারের ৩২টি খুঁটিতে দুই পাশে মোট ৬৪টি সড়কবাতি রয়েছে। স্থানীয়দের হিসাবে বর্তমানে এর মধ্যে মাত্র চারটি বাতি জ্বলছে। ফলে রাতের বেলায় ফ্লাইওভারের বড় অংশ অন্ধকারে থাকে।
অন্ধকারের কারণে ফ্লাইওভারের দুই পাশের ফুটপাত মাদকসেবীদের আনাগোনার স্থান হয়ে উঠেছে বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের। এতে পথচারীদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে।
তবে দীর্ঘদিন ধরে অধিকাংশ বাতি অচল থাকার বিষয়টি পুরোপুরি স্বীকার করেননি সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তারা।
গাজীপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রকৌশলী মো. তারেক হোসেন বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে সব বাতি নষ্ট—এমনটা ঠিক নয়। গত বছরও অল্প কিছু বাতি নষ্ট ছিল। পরে ধীরে ধীরে আরও কিছু বাতি নষ্ট হয়েছে।’
তিনি বলেন, সরকারের বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ব্যবহারের নির্দেশনা রয়েছে। এ কারণে মাওনা ফ্লাইওভারে সৌরবিদ্যুৎচালিত বাতি স্থাপনের চিন্তা করছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। চলতি অর্থবছরের বাজেট প্রকাশের পর এ বিষয়ে কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের দাবি, সৌরবাতি স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি নতুন ব্যবস্থা কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত দ্রুত বিদ্যমান সড়কবাতিগুলো সচল করা হোক। তাঁদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ এই উড়ালসড়কে পর্যাপ্ত আলো নিশ্চিত করা গেলে রাতের চলাচলে ভোগান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ অনেকটাই কমবে।
কেকে/সাশ