বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬,
২৩ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● প্রবাসী আয়ে জোয়ার : ছয় দিনে এল ৭,৭৪৯ কোটি টাকা      ● ১০ উড়োজাহাজ কিনতে এয়ারবাসের সঙ্গে বিমানের চুক্তি সই      ● ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার অধিকার নিশ্চিত করতে চায় সরকার : প্রধানমন্ত্রী      ● অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে জেট ফুয়েলের দাম লিটারে বাড়ল ১৭ টাকা      ● ডেঙ্গুতে ২৪ ঘন্টায় ৮ মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ২৮৯      ● একনেকে ১৬ হাজার ২০৭ কোটি টাকার ১৩ প্রকল্প অনুমোদন      ● সমঝোতার পরও এমপি গাজী নজরুলের জামিন নামঞ্জুর      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি স্বাস্থ্য খাতে কী ঝুঁকি তৈরি করছে
প্রফেসর ড. শাহ জে মিয়া
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:২৬ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

আমি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কিত বিষয় ক্লাসে ছাত্রদের পড়াই। এই বিষয়েই চিন্তা এবং গবেষণা করি গত কয়েক শতাব্দী যাবৎ। আর এই গবেষণা যদি কোনোভাবে দেশের মানুষের কল্যাণে লাগে, তাহলেই আমার কাছে হবে সেটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা। সম্প্রতি আমি একটি প্রশ্ন নিয়ে কাজ শুরু করেছি। প্রশ্নটি হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঠিক কতটা সংবেদনশীল ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা নিরাপদ? আমার চিন্তা শুরু হয়েছে বিশেষ করে সেইসব সেবা খাতে বা ক্ষেত্রে, যেগুলো সরাসরি মানুষের সাথে, মানুষের জন্য এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করে। এই তালিকার সেবা খাতে একেবারে শীর্ষে আছে স্বাস্থ্যসেবা। আজকের এই লেখায় আমি এসব কাজেরই আমার কিছু গভীর পর্যবেক্ষণ পাঠকের সামনে রাখতে চাই। যাহোক, শুরুতেই আমার সিদ্ধান্তটি বলে রাখি: স্বাস্থ্য খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে যে গতিতে কথা হচ্ছে, সেই গতিতে প্রয়োগ করা সম্ভব নয়, এবং সব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কিত উদ্ভাবন এখানে গ্রহণ করাও উচিত নয়।

প্রথমেই মূল কারিগরি প্রশ্নটি স্পষ্ট করে নিই, কারণ এটি না বুঝলে বাকি আলোচনা অর্থহীন। স্বাস্থ্যসেবা ক্ষেত্রে একজন অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রোগীর দিকে তাকিয়ে যা বোঝেন, সেই জ্ঞান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শিখিয়ে দেওয়া যায় না। সেই জ্ঞান বইয়ে লেখা থাকে না, কম্পিউটারের ফাইলেও থাকে না। সেটি বছরের পর বছর হাজার হাজার রোগী দেখে তৈরি হওয়া এক ধরনের বোধ, যেখানে রোগীর মুখের ভাব, কণ্ঠের দুর্বলতা, পরিবারের ইতিহাস এবং এলাকার পরিচিত রোগবালাই সম্পর্কিত অভিজ্ঞ আর জ্ঞান সব একসাথে কাজ করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই যা পারে তা হলো কিছু সহায়তা এসব বিষয়ে এবং সেটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

এখানে ছোট্ট করে দুটি শব্দ বলে রাখা উচিত, কারণ এই দুটি শব্দই পুরো সায়েন্স কমিউনিটিতে বিতর্কের কেন্দ্রে। প্রথমটি ‘ডিটারমিনিস্টিক’ বা নির্ধারিত পদ্ধতি, যার অর্থ হলো এআইকে একটি নির্দিষ্ট নকশা বা প্যাটার্ন চিনতে শেখানো, যেমন এক্স-রে ছবিতে ফুসফুসের একটি নির্দিষ্ট ধরনের ছায়া ও তার বড় বা ছোট হওয়ার ধারণা। নকশাটি চেনার পর যেকেউ একজন ফুসফুসের ডাক্তার হিসাবে বলতে পারে এই মুহূর্তে রোগীর অবস্থাটি কোন পর্যায়ে আছে। দ্বিতীয়টি ‘প্রোবাবিলিস্টিক’ বা সম্ভাবনানির্ভর পদ্ধতি, যেখানে সে বলে দিতে পারে এই রোগীর অবস্থা থেকে পরিস্থিতি কোন দিকে কতটা এগোতে পারে, কত শতাংশ সম্ভাবনা নিয়ে। যাহোক, তো লক্ষ করুন, এই দুটির কোনোটিই ‘বোঝা’ বা জ্ঞান সম্পর্কিত নয়। এগুলো হিসাবনির্ভর মাত্র। কারণ নকশা চেনা আর রোগ বোঝা এক জিনিস নয়, আর এই পার্থক্যটুকুই স্বাস্থ্য খাতে বা রোগীর জীবন ও মৃত্যুর ব্যবধান হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এই কথাটি তাত্ত্বিক শোনালেও এর প্রমাণ হাতের কাছেই আছে এবং আমি মনে করি প্রমাণটি যথেষ্ট ভয় ধরানো। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শত শত হাসপাতালে সেপসিস নামের একটি প্রাণঘাতী সংক্রমণ আগেভাগে ধরার জন্য একটি বহুল ব্যবহৃত এআই ব্যবস্থা চালু ছিল। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান দাবি করেছিল এর নির্ভুলতা ০.৭৬ থেকে ০.৮৩। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ২০২১ সালের এ কাজে স্বাধীনভাবে ৩৮ হাজার ৪৫৫টি ভর্তির তথ্য যাচাই করে দেখলেন, বাস্তব নির্ভুলতা মাত্র ০.৬৩ [১] এই এআই ব্যবস্থাটির। যাহোক, সংখ্যাটির মানে বোঝা দরকার। এই পরিমাপে ১.০ মানে নিখুঁত, আর ০.৫ মানে কার্যত আন্দাজে বলার সমান। আরও গুরুতর বিষয় হলো, ব্যবস্থাটি সেপসিসে আক্রান্ত রোগীদের ৬৭ শতাংশকেই শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। অথচ হাসপাতালে ভর্তি সব রোগীর ১৮ শতাংশের ক্ষেত্রেই সে সতর্কবার্তা বাজিয়েছে [১]।

এই দ্বিতীয় সংখ্যাটি নিয়ে আমি আলাদা করে ভাবতে বলব। একটি ব্যবস্থা যদি প্রতি পাঁচজন রোগীর একজনের জন্য বিপদসংকেত দেয়, অথচ তার বেশির ভাগই ভুল, তাহলে কিছুদিনের মধ্যেই নার্স ও চিকিৎসকেরা সেই সংকেতকে গুরুত্ব দেওয়া বন্ধ করে দেন। ফলে প্রযুক্তিটি কেবল অকেজো থাকে না, সে প্রকৃত বিপদসংকেতকেও চাপা দিয়ে দেয়। অর্থাৎ ভুল এআই কেবল সাহায্য করতে ব্যর্থ হয় না, সে বিদ্যমান ব্যবস্থাকেও দুর্বল করে দেয়। ওই গবেষকেরা আরেকটি কথা বলেছেন যা আমি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের তৈরি এসব এআই ব্যবস্থার ভেতরটা বাইরের কেউ দেখতে পান না, তাই এগুলোর মান যাচাই করাই কঠিন [১]। একটি এআই যন্ত্র কীসের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তা যদি হাসপাতাল বা সেখানের নার্স ও চিকিৎসকেরা নিজেই জানতে না পারে, তাহলে সেই যন্ত্রের ওপর রোগীর জীবন ছেড়ে দেওয়া যায় কি? আমি তো মনে করি একেবারেই যায় না।

কেউ ভাবতে পারেন এটি হয়তো একটিমাত্র ব্যর্থ উদাহরণ। দুর্ভাগ্যবশত তা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ ও খাদ্য প্রশাসন এ পর্যন্ত দেড় হাজারেরও বেশি এআইভিত্তিক চিকিৎসা-যন্ত্রকে বা এ সম্পর্কিত উদ্ভাবন অনুমোদন দিয়েছে। অথচ গবেষকেরা যখন এর মধ্যে ১,৩৫৭টি যন্ত্র পরীক্ষা করে দেখলেন, তাঁরা পেলেন মাত্র ৩টি উদ্ভাবন গবেষণা যেখানে রোগীর প্রকৃত ফলাফল, অর্থাৎ রোগী বাঁচলেন কি না, সুস্থ হলেন কি না, আবার ভর্তি হতে হলো কি না, তা যাচাই করা হয়েছে [২]। শতাংশের হিসাবে এটি ০.২ শতাংশ। আমি আবার মনে করি যে, অনুমোদন পাওয়া মানে এই নয় যে যন্ত্রটি রোগীর উপকার করে বা করতে সক্ষম।

যাহোক, তৃতীয় সমস্যাটি আমার বিবেচনায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। একটি এআই ব্যবস্থা যেখানে তৈরি হয়, সেখানকার রোগীদের দেখে সে শেখে; অন্য জায়গায় নিয়ে গেলে তার ফল অবিশ্বাসই বাড়ায়। মানুষের রোগের ধরন অঞ্চলভেদে আলাদা, ঋতুভেদে আলাদা, জলবায়ু ও ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী বা বংশ-সূত্রে রোগের নির্ণয় ধরন আলাদা হতে পারে। এমনকি দুটি হাসপাতালের তথ্য লেখার অভ্যাসও এবং ধরন এক নয়। আসুন একটা উদাহরণ দেখি। বক্ষব্যাধির এক্স-রে বিশ্লেষণে একই এআই ব্যবস্থা এক তথ্যভাণ্ডারে ০.৮৫ নির্ভুলতা দেখিয়ে অন্য তথ্যভাণ্ডারে নেমে এসেছে ০.৭৩-এ, আর রেডিওলজি নিয়ে করা পর্যালোচনাগুলো বারবার দেখাচ্ছে যে নিজের জায়গায় ভালো ফল দেওয়া ব্যবস্থা বাইরের জায়গায় দুর্বল হয়ে পড়ে [৩]। অর্থাৎ ইউরোপ বা আমেরিকার রোগীদের তথ্যে প্রশিক্ষিত একটি এআই ব্যবস্থা বাংলাদেশের যেকোনো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একই রকম কাজ করবে, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই।

আরও একটি বিপদ আছে, যেটি সবচেয়ে কম দেখা যায় অথচ সবচেয়ে গভীর। এআই তথ্যের ভেতরে যে নকশা পায় সেটিই শেখে, আপনি তাকে যা শেখাতে চেয়েছিলেন তা নয়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২০ কোটি মানুষের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত একটি এআই অ্যালগরিদম নিয়ে ২০১৯ সালে গবেষকেরা দেখালেন, ব্যবস্থাটি কৃষ্ণাঙ্গ রোগীদের অসুস্থতা ধারাবাহিকভাবে কম করে দেখাচ্ছে [৪]। কারণটি নির্মাতাদের কোনো বিদ্বেষ ছিল না; তাঁরা ‘রোগীর প্রয়োজন’ মাপার জন্য ‘চিকিৎসায় খরচ’কে মাপকাঠি বানিয়েছিলেন। কিন্তু যে জনগোষ্ঠী চিকিৎসার সুযোগ কম পায়, তাদের খরচও কম হয়। ফলে সমান অসুস্থ একজন কৃষ্ণাঙ্গ রোগীর খরচ কম দেখে এআই যন্ত্রটি ধরে নিয়েছে তিনি কম অসুস্থ। সংশোধনের পর দেখা গেল, বাড়তি সেবার জন্য চিহ্নিত রোগীদের মধ্যে কৃষ্ণাঙ্গদের থাকার কথা ছিল ৪৬.৫ শতাংশ, অথচ ছিলেন মাত্র ১৭.৭ শতাংশ [৪]। এর ফলে একটি ভুল মাপকাঠি বেছে নেওয়ার কারণে কোটি কোটি মানুষের সেবা বছরের পর বছর বেঠিকভাবে বণ্টিত হয়েছে।

এখান থেকেই আমার মূল যুক্তিটি দাঁড়ায়। আজকের এআই ব্যবস্থাগুলো মূলত সংকীর্ণ, অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট কাজের জন্য একধরনের তথ্য দিয়ে তৈরি। কিন্তু একজন চিকিৎসক রোগ নির্ণয়ের সময় একসাথে বহু রকম তথ্য মেলান। পরীক্ষার ফল, রোগীর বর্ণনা, চোখে দেখা লক্ষণ, বহু বছরের চিকিৎসা-ইতিহাস, নাড়ি ও রক্তচাপের ধারাবাহিক পরিবর্তন, এমনকি রোগীর পারিবারিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা। এই সবগুলো তথ্য একত্র করে একজন বিশেষজ্ঞ যেভাবে দেখেন, সেভাবে দেখতে পারে এমন সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরি করা গবেষণার সক্রিয় বিষয় বটে। কিন্তু এআই গবেষণা জগতে বাস্তবে তা এখনো অনেক দূরের পথ। আর যতদিন সেই পথ পাড়ি দেওয়া না হয়, ততদিন এআইকে চিকিৎসকের বিকল্প ভাবার কোনো সুযোগ নেই। এআই মানুষের বিকল্প নয়, সহায়ক, এবং স্বাস্থ্য খাতে এই কথাটি অন্য যেকোনো খাতের চেয়ে বেশি সত্য।

এতক্ষণ আমি হাসপাতালের যন্ত্রপাতির কথা বললাম, কিন্তু আজ সবচেয়ে দ্রুত যে ব্যবহারটি বাড়ছে তা ঘটছে হাসপাতালের বাইরে, সাধারণ মানুষের হাতের মোবাইলে। মানুষ এখন সাধারণ চ্যাটবটের কাছে নিজের উপসর্গ লিখে জানতে চাইছেন তাঁর কী হয়েছে এবং আরোগ্য লাভের জন্য কোন ওষুধ খাওয়া উচিত। এখানে একটি কথা আমি জোর দিয়ে বলতে চাই। সাধারণ এআই চ্যাটবট কোনো চিকিৎসা-যন্ত্র নয়। সেটি চিকিৎসার জন্য তৈরি হয়নি, চিকিৎসার মান যাচাইয়ের কোনো পরীক্ষা তাকে পাস করতে হয়নি, এবং ভুল বললে তার কোনো দায়ও নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের নির্দেশিকায় এই ঝুঁকিগুলো আলাদা করে চিহ্নিত করেছে। ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য দেওয়া, রোগীর আবেগ নিয়ে খেলা, গোপন তথ্য ফাঁস হওয়া, এবং সবচেয়ে গুরুতর যেটি, স্বাস্থ্যসেবা স্বাস্থ্যব্যবস্থার বাইরে চলে যাওয়া [৬]। আমাদের দেশে যেখানে প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ কেনা এখনো সহজ, সেখানে এই শেষ ঝুঁকিটি বিশেষভাবে বিপজ্জনক। তাই আমি মনে করি, স্বাস্থ্য খাতে যে এআই ব্যবহার হবে, তাকে হতে হবে এই কাজের জন্যই বিশেষভাবে তৈরি ও পরীক্ষিত ব্যবস্থা, সাধারণ কাজের জন্য বানানো কোনো সরঞ্জাম নয়।স্বাস্থ্য খাত কেন অন্যদের চেয়ে আলাদা, সেটিও বলা দরকার। এখানে একটি ভুলের মূল্য একজন মানুষকে তার শরীর দিয়ে বা জীবন দিয়ে দিতে হয়। এখানে নৈতিকতার প্রশ্ন আছে, কারণ কে আগে চিকিৎসা পাবেন, সেই সিদ্ধান্ত নিছক কারিগরি সিদ্ধান্ত নয়। এখানে অত্যন্ত সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য থাকে, যা ফাঁস হলে সারা জীবনের জন্য ফাঁস হয়ে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত আছে স্বাস্থ্যবিমার হিসাব, সরকারের নীতি, হাসপাতালের দায় এবং অনেক ক্ষেত্রে একজন মানুষের জীবিকা। এতগুলো স্বার্থ যেখানে জড়িত, সেখানে ‘পরীক্ষা করে দেখি কী হয়’ বলে কোনো প্রযুক্তি ছেড়ে দেওয়া যায় না।

স্বাস্থ্যসেবায় এআই প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো, ‘যন্ত্র বা অ্যালগরিদম কখন সিদ্ধান্ত নেবে, সেই সিদ্ধান্ত কে নেবে?’ অর্থাৎ, কোনো এআই অ্যালগরিদমকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অর্পণ করার বা তাকে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেওয়ার কর্তৃত্ব কার কাছে থাকা উচিত? আর আপনি কি সেই কর্তৃত্ব এআইকে দিতে চান?

যাহোক, তাহলে আমার প্রস্তাবনা কী? আমি মনে করি, স্বাস্থ্য খাতে এআই উদ্ভাবন বন্ধ করার দরকার নেই, কিন্তু তাকে একটি দরজা পেরিয়ে আসতে হবে। সেই দরজাটি হলো একটি স্বাধীন কর্তৃপক্ষ বা যাচাই বোর্ড। যার একমাত্র কাজ হবে স্বাস্থ্য খাতে আসা প্রতিটি এআই উদ্ভাবনকে পরীক্ষা করা ও অনুমোদন দেওয়া।

এখানে ‘গার্ডরেল’ কথাটি প্রায়ই শোনা যায়। এর সহজ অর্থ হলো রাস্তার পাশের রেলিং, যা গাড়িকে চলতে বাধা দেয় না, কেবল খাদে পড়তে দেয় না। এই যাচাই বোর্ড কেবল দেখবে না যে যন্ত্রটি কত শতাংশ নির্ভুল। দেখবে তার বিস্তার ও গভীরতা দুটোই—অর্থাৎ কোন কোন রোগী ও কোন কোন পরিস্থিতিতে এটি কাজ করে, আর কোথায় করে না এবং ভুল করলে তার দায় কে নেবে।

এই যাচাই বোর্ড একই সঙ্গে যা করতে পারে, তা হলো এআই উদ্ভাবনকে বাজারে ছাড়ার পরেও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা। কারণ রোগের ধরন বদলায় এবং এআই যন্ত্রের নির্ভুলতাও সময়ের সঙ্গে ক্ষয়ে বা পরিবর্তিত হয়ে যায়।

বাস্তবে এই যাচাই কেমন হবে, তা-ও স্পষ্ট করে বলা দরকার। বোর্ডকে অন্তত চারটি প্রশ্নের উত্তর চাইতে হবে: এআই যন্ত্রটি কোন দেশের, কোন বয়সের এবং কোন ধরনের রোগীদের তথ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে? বাংলাদেশের রোগীদের ওপর এটি আলাদাভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে কি না? এআই যন্ত্রটি ভুল করলে সেই ভুল কোন ধরনের রোগীর ক্ষেত্রে বেশি হচ্ছে? সবশেষে, যন্ত্রটি যে সুপারিশ দিচ্ছে, তার কারণ চিকিৎসককে বুঝিয়ে বলতে পারছে কি না?

এই চারটি প্রশ্নের উত্তর না পেলে অনুমোদন দেওয়া উচিত নয়, তা সে যন্ত্র বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কিত উদ্ভাবন বিদেশে যত প্রশংসিতই হোক।

আমি জানি, কেউ বলবেন, এত কড়াকড়ি করলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উদ্ভাবন থেমে যাবে। তাদের জন্য বলি, উন্নত বিশ্ব ঠিক এই পথেই হাঁটছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের এআই আইনে রোগ নির্ণয়, চিকিৎসার পরামর্শ ও রোগী পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত এআইকে সরাসরি ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ শ্রেণিতে ফেলেছে। যেখানে প্রশিক্ষণের তথ্য ও সীমাবদ্ধতার নথি রাখা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, মানুষের তত্ত্বাবধান এবং আনুষ্ঠানিক সনদায়ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে [৫]।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও স্বাস্থ্য খাতে বড় মডেল ব্যবহারের নৈতিকতা নিয়ে চল্লিশটিরও বেশি সুপারিশ দিয়েছে। সেখানে স্পষ্ট করে বলা আছে, স্থানীয় পর্যায়ে যাচাই ছাড়া ভিন্ন জনগোষ্ঠীতে এসব ব্যবস্থার ফল অনির্ভরযোগ্য হয়ে পড়ে [৬]। অর্থাৎ আমি নতুন কিছু দাবি করছি না; আমি কেবল বলছি, আমাদেরও সেই কাঠামোটি মানা দরকার।

এবার আসুন সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটির মুখোমুখি হই, এবং প্রশ্নটি সম্পূর্ণ ন্যায্য। অনেকে বলবেন, বাংলাদেশে চিকিৎসকের এত সংকট যে এআই যা-ই দিক, তা না থাকার চেয়ে ভালো। সংকটটি সত্যিই বাস্তব কি না?

যাহোক, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আমাদের দেশে প্রতি হাজার মানুষের জন্য চিকিৎসক আছেন ০.৮৩ জন। আর নার্সের প্রয়োজন যেখানে ৩ লাখ ১০ হাজার ৫০০ জন, সেখানে কর্মরত আছেন ৫৬ হাজার ৭৩৪ জন, অর্থাৎ প্রয়োজনের মাত্র ২৮ শতাংশ [৭]।

কিন্তু আমার উত্তর হলো, এই সংকট যুক্তিটিকে উল্টে দেয়। যেখানে রোগীর পাশে একজন বিশেষজ্ঞ দাঁড়িয়ে আছেন, সেখানে যন্ত্রের ভুল তিনি ধরে ফেলতে পারেন। আর যেখানে কোনো বিশেষজ্ঞ নেই, সেখানে যন্ত্রের ভুল সরাসরি রোগীর শরীরে গিয়ে পড়ে, কেউ তা ঠেকায় না। অর্থাৎ চিকিৎসকের অভাব যত বেশি, খারাপ এআই বা যন্ত্রের বিপদও তত বেশি, কম নয়।

আমাদের বাস্তবতা এই সতর্কতাকে আরও জরুরি করে তোলে। দেশে স্বাস্থ্যকর্মীদের একটি বড় অংশ এআই নিয়ে আগ্রহী, অথচ প্রকৃত ব্যবহারকারীর সংখ্যা তার তুলনায় অনেক কম [৮]। অর্থাৎ আগ্রহ আছে, কিন্তু দরকারী প্রস্তুতি নেই।

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে স্বাস্থ্য খাতে এআই প্রকল্পের একটি পরিচিত রোগ আছে, যাকে গবেষকেরা বলছেন ‘পাইলট-রোগ’। এটি ছোট পরিসরের পরীক্ষামূলক প্রকল্পে চমৎকার ফল দেয়, কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে কখনো পৌঁছায় না। কারণগুলোও চেনা: বিচ্ছিন্ন তথ্যব্যবস্থা, বিদেশি অনুদান ফুরিয়ে গেলে খরচ চালাতে না পারা, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, চিকিৎসক ও রোগীর অনাস্থা এবং গ্রামীণ হাসপাতালে কম্পিউটারে এআই অ্যাপ চালানোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের অভাব [৯]।

গবেষকদের সিদ্ধান্তটি আমার নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গেও মেলে। স্বাস্থ্য খাতে এআই ছড়িয়ে দেওয়ার আসল কাজটি অ্যালগরিদম বা নতুন এআই যন্ত্রের প্রমাণ করা নয়, বরং এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা অ্যালগরিদম বা যন্ত্রের সঙ্গে মানুষের সেবায় কাজ করতে পারে।

বিষয়টিকে আমি একটি ছবির মধ্যে দাঁড় করাতে চাই। গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন নারী এসেছেন বুকে ব্যথা নিয়ে। সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই, আছে একটি এআই সহায়ক যন্ত্র, যেটি তৈরি হয়েছে ইংল্যান্ডে, যেখানে যন্ত্রটিকে ইউরোপের রোগীদের তথ্য দিয়ে ট্রেনিং করানো হয়েছিল।

যাহোক, যন্ত্রটি বলল, ঝুঁকি কম। এখন প্রশ্ন হলো, এই সিদ্ধান্তটি কে যাচাই করবে? কে জানবে যে এই এআই যন্ত্র আমাদের জনগোষ্ঠীতে কখনো পরীক্ষা করা হয়নি? আর যদি সিদ্ধান্তটি ভুল হয়, তার দায় কার?

এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর যতদিন আমাদের হাতে নেই, ততদিন স্বাস্থ্য খাতে এআইচালিত বা এআই-সম্পর্কিত যন্ত্র ছড়িয়ে দেওয়ার তাড়াহুড়ো আমাদের সাহায্য নয়, বরং ক্ষতি করবে।

স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আশির দশকেই অনুধাবন করেছিলেন, গ্রামীণ হাসপাতালের উন্নয়ন ও মানুষের স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনার উন্নয়নই দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় নেওয়ার যে ধারা শুরু করেছিলেন, আজ একবিংশ শতাব্দীতে সেই ধারারই নতুন রূপ হতে পারে দায়িত্বশীল প্রযুক্তি।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরে এগিয়ে আসা সেই ধারাবাহিকতা আজ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ কর্মপরিকল্পনায় একটি সুসংহত রূপ পেয়েছে। আর ৩১ দফায় স্বাস্থ্যসেবা ও তরুণদের দক্ষতা নিয়ে যে অঙ্গীকার রয়েছে, এই কাঠামো গড়ে তোলা তারই স্বাভাবিক পরবর্তী ধাপ।

শেষ কথাটি আমি সরাসরি বলতে চাই। আমি স্বাস্থ্যসেবায় এআইয়ের বিরুদ্ধে নই, কিন্তু এটা বলছি যে, স্বাস্থ্য খাত এমন একটি জায়গা, যেখানে প্রযুক্তি ব্যবহারের উৎসাহের চেয়ে সতর্কতা বেশি দরকার। এবং যেখানে ‘এটি কাজ করে’ বলার আগে প্রমাণ করতে হয়, ‘এটি আমাদের মানুষের জন্য কাজ করে’।

সেই প্রমাণের দায়িত্ব নেওয়ার মতো একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান আমাদের গড়ে তুলতে হবে, আর সেটি যত আগে হয়, ততই মঙ্গল। ধন্যবাদ সবাইকে।

তথ্যসূত্র:

১. ওং এ. ও সহলেখকেরা, জামা ইন্টারনাল মেডিসিন, ২০২১। jamanetwork.com/journals/jamainternalmedicine/fullarticle/2781307

২. প্লস ডিজিটাল হেলথ, এফডিএ অনুমোদিত এআই যন্ত্রের ফলাফল যাচাই সংক্রান্ত গবেষণা। journals.plos.org/digitalhealth/article?id=10.1371/journal.pdig.0001597

৩. রেডিওলজিতে এআইয়ের সাধারণীকরণ সক্ষমতা নিয়ে পদ্ধতিগত পর্যালোচনা, ২০২৫। ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC12689012

৪. ওবারমেয়ার জেড. ও সহলেখকেরা, সায়েন্স, ২৫ অক্টোবর ২০১৯। science.org/doi/10.1126/science.aax2342

৫. ইউরোপীয় ইউনিয়নের এআই আইন, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসা-যন্ত্র সংক্রান্ত নির্দেশনা। artificialintelligenceact.eu

৬. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, স্বাস্থ্য খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিকতা ও সুশাসন: বৃহৎ মাল্টিমোডাল মডেল প্রসঙ্গে নির্দেশিকা, ২০২৪। who.int

৭. ঢাকা ট্রিবিউন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের জনবল সংকট সংক্রান্ত প্রতিবেদন। dhakatribune.com/bangladesh/health/407114

৮. বাংলাদেশে চিকিৎসকদের এআই ব্যবহার সংক্রান্ত জরিপ, জার্নাল অব পাবলিক হেলথ রিসার্চ, ২০২৫। doi.org/10.1177/22799036251369408

৯. জোসেফ জে., ফ্রম পাইলট টু পলিসি, ফ্রন্টিয়ার্স ইন ডিজিটাল হেলথ, ২০২৬। pmc.ncbi.nlm.nih.gov/articles/PMC12894408

লেখক: প্রফেসর অফ বিজনেস এনালিটিক্স এন্ড অ্যাপ্লাইড এআই এবং উপপরিচালক—সেন্টার ফর অ্যাপ্লাইড এন্ড রেসপন্সিবল এআই, নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া।
ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরাম এবং বিএনপি চেয়ারম্যানের বহিঃবিশ্বে শহীদ জিয়ার আদর্শে বিশ্বাসী পেশাজীবী এক্সপার্টিজ গ্রুপের সদস্য।

কেকে/এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close