আপনার হাতে ১০০ টাকা। আপনি কি ১০০ টাকার পণ্য কিনবেন, নাকি এমন কিছু করবেন, যাতে ওই ১০০ টাকা দিয়ে ২০০, ৩০০ কিংবা ৫০০ টাকার ব্যবসা পরিচালনা করা যায়? প্রশ্নটি সহজ। কিন্তু এর উত্তরই একজন সাধারণ ব্যবসায়ী আর একজন দক্ষ উদ্যোক্তার মধ্যে বড় পার্থক্য তৈরি করে।
ধরুন, চারজন উদ্যোক্তার প্রত্যেকের হাতে ১০০ টাকা। প্রথমজন ভাবলেন, ‘এই টাকা দিয়ে কী কিনতে পারি?’ দ্বিতীয়জন ভাবলেন, ‘কেনার পর ব্যবসা চালানোর জন্য কত টাকা হাতে থাকবে?’ তৃতীয়জন ভাবলেন, ‘যে সম্পদ থেকে আয় করব, সেটির মালিক হওয়া কি সত্যিই প্রয়োজন?’ আর চতুর্থজন প্রশ্ন করলেন, ‘আমার ১০০ টাকা কোথায় ব্যবহার করলে সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি হবে?’
চারজনের ক্যাপিটাল (মূলধন) একই। কিন্তু ব্যবসায়িক ফল একই হবে না। কারণ পার্থক্য মূলধনের পরিমাণে নয়, মূলধন ব্যবহারের চিন্তায়।
আমরা স্বাভাবিকভাবেই নিজের জিনিসের মালিক হতে চাই। নিজের জমি, নিজের ভবন, নিজের গাড়ি, নিজের মেশিন—এসব আমাদের নিরাপত্তার অনুভূতি দেয়। কিন্তু ব্যবসায় আবেগ দিয়ে হিসাব করা হয় না। ব্যবসার ভাষা হলো রিটার্ন, ক্যাশ ফ্লো (নগদ প্রবাহ), রিস্ক (ঝুঁকি) এবং ক্যাপিটাল ইফিসিয়েন্সি (মূলধন দক্ষতা)।
এক কোটি টাকা দিয়ে একটি মেশিন কিনলেন। মেশিনটি আপনার নিজের। কিন্তু সেটি যদি বছরে মাত্র ৫ লাখ টাকার অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করে, তাহলে শুধু ‘মেশিনটি আমার’—এই সন্তুষ্টি ব্যবসায়িক সাফল্যের প্রমাণ নয়। একই মেশিন লিজ নিয়ে যদি কম মূলধন আটকে রেখে বেশি রিটার্ন তৈরি করা যায়, তাহলে মালিকানা না থাকলেও অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা বেশি হতে পারে।
অর্থাৎ ওনারশিপ বা মালিকানা একটি আইনি বিষয়, প্রোডাক্টিভিটি (উৎপাদনশীলতা) একটি অর্থনৈতিক বিষয়। ব্যবসায় এই দুটিকে এক করে দেখাই অনেক সময় সবচেয়ে ব্যয়বহুল ভুল।
এবার প্রশ্ন হলো, নিজের টাকা কি তাহলে বিনামূল্যের?
অনেক উদ্যোক্তা মনে করেন, নিজের ১ কোটি টাকা দিয়ে ভবন বানালে কোনো সুদ দিতে হচ্ছে না, তাই সেটি প্রায় বিনামূল্যের ক্যাপিটাল। আসলে তা নয়। ওই ১ কোটি টাকা ভবনে আটকে রাখার কারণে তা ইনভেন্টরি, টেকনোলজি, মার্কেটিং, ডিস্ট্রিবিউশন কিংবা নতুন ব্যবসায় বিনিয়োগ করা যাচ্ছে না। অর্থাৎ নিজের মূলধনেরও অপরচুনিটি কস্ট (সুযোগ ব্যয়) আছে।
তাই উদ্যোক্তার প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়, “আমি এটি কিনতে পারি কি না?” বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, “এই টাকা এখানে বিনিয়োগ করাই কি আমার ক্যাপিটালের সবচেয়ে উৎপাদনশীল ব্যবহার?”
এখানেই শুরু হয় ক্যাপিটাল অ্যালোকেশনের (মূলধন বণ্টনের) আসল শিক্ষা।
ব্যবসায় শুধু টাকা কোথায় বিনিয়োগ করলেন, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়; কত দ্রুত সেই টাকা আবার ব্যবসায় ফিরে এসে নতুন আয় তৈরি করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। গুদামে অতিরিক্ত পণ্য পড়ে আছে, গ্রাহকের কাছে দীর্ঘদিনের পাওনা আটকে আছে, অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পড়ে আছে—কাগজে লাভ থাকলেও ব্যবসার নগদ প্রবাহ সংকটে পড়তে পারে। তাই প্রফিট বা মুনাফা দেখলেই সন্তুষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই। উদ্যোক্তাকে দেখতে হবে ওয়ার্কিং ক্যাপিটেল (চলতি মূলধন) কতটা দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে এবং নগদ কত দ্রুত ব্যবসার চক্রে ফিরে আসছে।
এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে—বড় ব্যবসা মানেই কি ভালো ব্যবসা?
বিক্রি ১০ কোটি থেকে ২০ কোটি হয়েছে। নতুন শাখা হয়েছে, সম্পদ বেড়েছে, ঋণ বেড়েছে। বাইরে থেকে মনে হচ্ছে ব্যবসা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু একজন বিচক্ষণ ক্যাপিটাল অ্যালোকেটর প্রশ্ন করবেন, “আরও ১ কোটি টাকা ব্যবসায় ঢোকানোর ফলে অতিরিক্ত কত টাকা রিটার্ন তৈরি হচ্ছে?”
কারণ রেভিনিউ গ্রোথ (রাজস্ব বৃদ্ধি) এবং ভ্যালু ক্রিয়েশন (মূল্য তৈরি) এক জিনিস নয়।
একটি ব্যবসা বড় হতে পারে, কিন্তু ক্যাপিটাল-ইফিশিয়েন্ট নাও হতে পারে। আবার তুলনামূলক ছোট একটি ব্যবসা শক্তিশালী হতে পারে, যদি অল্প ক্যাপিটাল বারবার ঘুরিয়ে ভালো নগদ প্রবাহ এবং রিটার্ন অন ক্যাপিটাল তৈরি করতে পারে।
এবার আসা যাক ঋণের কথায়
ঋণ কি খারাপ? না। আবার ঋণ নিলেই ব্যবসা বড় হবে—এমনও নয়। ব্যাংক লোন, লিজ, ইনভেস্টর ক্যাপিটাল—সবই ফাইন্যান্সিয়াল ক্যাপিটাল। এগুলোর মূল্য নির্ভর করে কোথায় ব্যবহার করা হচ্ছে এবং তার বিপরীতে কত রিটার্ন তৈরি হচ্ছে, তার ওপর।
ধরুন, ১০ শতাংশ কস্ট অব ক্যাপিটাল নিয়ে আপনি এমন একটি ব্যবসায় বিনিয়োগ করলেন, যেখানে টেকসইভাবে ১৮ শতাংশ রিটার্ন তৈরি করা সম্ভব। সঠিক মাত্রার লেভারেজ এখানে ব্যবসার গতি বাড়াতে পারে। কিন্তু একই ১০ শতাংশ খরচের ক্যাপিটাল এমন জায়গায় বিনিয়োগ করলেন, যেখানে রিটার্ন মাত্র ৬ শতাংশ—তাহলে ঋণ ব্যবসাকে শক্তিশালী করছে না; বরং ভুল সিদ্ধান্তটিকেই বড় করছে।
লেভারেজ অনেকটা গাড়ির অ্যাক্সিলারেটরের মতো। এটি গাড়ির দিক ঠিক করে না। দিক ভুল হলে অ্যাক্সিলারেটর শুধু ভুল জায়গায় দ্রুত পৌঁছে দেয়।
তাহলে একজন উদ্যোক্তার আসল শক্তি কোথায়?
শুধু কত টাকা আছে, কত অ্যাসেট আছে বা কত বড় অফিস আছে—সেখানে নয়। আসল শক্তি হলো প্রতিটি টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার ক্ষমতা।
নতুন উদ্যোক্তা প্রশ্ন করেন, “আমার কত টাকা আছে?”
অভিজ্ঞ উদ্যোক্তা প্রশ্ন করেন, “আমি কত অ্যাসেট কিনতে পারি?”
আর দক্ষ ক্যাপিটাল অ্যালোকেটর প্রশ্ন করেন, “আমার প্রতিটি টাকা কোথায় সবচেয়ে বেশি উৎপাদনশীল হবে?”
এই শেষ প্রশ্নের সঙ্গে আরও কিছু প্রশ্ন জুড়ে যায়—এই বিনিয়োগ কত ক্যাশ ফ্লো তৈরি করবে? ক্যাপিটাল কতদিন আটকে থাকবে? রিস্ক কতটা? ইনভেন্টরি কত দ্রুত বিক্রি হবে? পাওনা কত দ্রুত আদায় হবে? টেকনোলজি বা আউটসোর্সিং ব্যবহার করলে একই কাজ কম ক্যাপিটালে করা সম্ভব কি না? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এই টাকা অন্য কোথাও বিনিয়োগ করলে কি আরও ভালো রিটার্ন পাওয়া যেত?
আধুনিক ব্যবসায় তাই সবকিছুর মালিক হওয়া জরুরি নয়। নিজের কারখানা না থাকলেও কনট্রাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিং করা যায়, বিশাল গুদাম না থাকলেও দক্ষ সাপ্লাই চেইন তৈরি করা যায়, সব কর্মী নিজের প্রতিষ্ঠানের না হলেও টেকনোলজি ও আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো যায়। মূল কথা হলো—আপনার ক্যাপিটাল কতটা কার্যকরভাবে ভ্যালু তৈরি করছে।
তাহলে শুরুতে করা প্রশ্নটির উত্তর কী?
আপনার হাতে ১০০ টাকা থাকা আসল বিষয় নয়। আসল বিষয় হলো—ওই ১০০ টাকা দিয়ে আপনি কত টাকার উৎপাদনশীল সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন এবং সেই ক্যাপিটাল কত দক্ষতার সঙ্গে ক্যাশ ফ্লো ও ভ্যালু তৈরি করছে।
সুতরাং ব্যবসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়তো “এটা কি আমার?” নয়।
বরং—
“এটি কি আমার ক্যাপিটালকে আরও উৎপাদনশীল করছে?”
কারণ সম্পদের মালিকানা আপনাকে সম্পদশালী দেখাতে পারে, কিন্তু মূলধনের উৎপাদনশীলতা আপনাকে সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী উদ্যোক্তা করে।
লেখক: প্রকৌশলী, এ্যাব মেম্বার, আজীবন ফেলো আইইবি।
কেকে/সাশ