শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬,
২৪ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● করপোরেটের কবজায় নিত্যপণ্যের বাজার      ● ফ্রি ট্রেড জোন ও রেলভিত্তিক আইসিডিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে বিনিয়োগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর      ● আবরার হত্যা মামলার রায় দ্রুত কার্যকরে সহযোগিতার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর      ● রূপপুরের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত অনুমোদন      ● ডেঙ্গুতে একদিনে আরও ৫ জনের প্রাণহানি      ● নতুন করে ৪ মৃত্যু, হাম ও উপসর্গে মোট প্রাণহানি ১১৪৪      ● ১৫ বছরের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ড      
জীবনানন্দ
মিথ, প্রান্তর ও নিঃসঙ্গতার কবি অ্যান কারসন
ফরহাদ নাইয়া
প্রকাশ: শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:২৭ এএম

অ্যান কারসন—যিনি প্রাচীন গ্রিক পুরাণ ও আধুনিক মানুষের নিঃসঙ্গতাকে এক সুতোয় বেঁধে সাহিত্যের মানচিত্রই পাল্টে দিয়েছেন। টরন্টোর অলিগলি থেকে উঠে আসা এই প্রাবন্ধিক ও কবি প্রথাগত রীতির তোয়াক্কা না করে কবিতা, গদ্য ও অনুবাদের সীমানা ভেঙে দিয়েছেন। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত তার আলোচিত গ্রন্থ Eros the Bittersweet থেকে শুরু করে অনন্য পদ্য-উপন্যাস Autobiography of Red—প্রতিটি রচনায় তিনি প্রাচীন মিথকে সমকালীন প্রেক্ষাপটে জীবন্ত করে তুলেছেন।

প্রথম নারী হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ টি. এস. এলিয়ট পুরস্কার জয় থেকে শুরু করে গুগেনহাইম ও ম্যাকআর্থার ফেলোশিপ অর্জন—তার সাফল্যের ঝুলিতে রয়েছে বহু স্বীকৃতি। আর এবার সাহিত্যের সর্বোচ্চ সম্মান হিসেবে ২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। প্রাচীন ধ্রুপদি সুর ও আধুনিক মননশীলতার এই জাদুকরি সম্মিলনই অ্যান কারসনকে করে তুলেছে আমাদের সময়ের অন্যতম উজ্জ্বল সাহিত্যিক নক্ষত্র। নিচে তার কয়েকটি কবিতার অনুবাদ তুলে ধরা হলো। অনুবাদ করেছেন ফরহাদ নাইয়া।

আমাদের এবং

অ্যান কারসন

আমাদের এবং
প্রাণীকুলের মাঝে
রয়েছে এক নামহীনতা।

আমরা
অনির্দিষ্টভাবে
হাতড়ে মরি—

রোমানরা যার নাম দিয়েছিল
‘ক্যামেলোপার্ডালিস’
অথবা ‘জিরাফ’ (তাদের কাছে
যাকে উট ও চিতাবাঘের
সংকর বলে মনে হয়েছিল)। কিংবা
আমরা শ্রেণিবিন্যাসে ভুল করে বসি—

একটি কস্তুরিমৃগ বা মাস্ক অক্স
আসলে কোনো বলদই নয়; বরং
ছাগলের সঙ্গে এর রক্তের সম্পর্ক
আরও গভীর।

আর যখন আমরা
কোনো নির্দিষ্ট প্রাণীর
নামকরণ করতে যাই,
তখন আমরা ভান করি, যেন
তারা কোনো বস্তু (স্পট),
কোনো গুণ (বিউটি)
কিংবা আমাদেরই অন্য কোনো রূপ (বব)।

রেড মিট: স্টেসিকোরোসের খণ্ডাংশ

অ্যান কারসন

Red Meat: Fragments of Stesichoros হলো অ্যান কারসনের পদ্য-উপন্যাস Autobiography of Red-এর একটি সূচনা পর্ব। প্রাচীন গ্রিক গীতিকবি স্টেসিকোরোসের লেখা হারিয়ে যাওয়া Geryoneis কবিতার যেসব অংশ টিকে রয়েছে, কারসনের নিজস্ব অনুবাদে সেগুলোর সংকলনই এই পর্বে তুলে ধরা হয়েছে।

১. গেরিয়ন

গেরিয়ন ছিল একজন দানব। তার কাছে সবকিছুই ছিল লাল।

সকালে কম্বলের ভেতর থেকে মুখ বাড়াতেই সে দেখল চারপাশ লাল।

লাল প্রান্তরে তার লাল নিশ্বাসের মধ্যে গবাদিপশুগুলো শিকলে বাঁধা হাঁটু ঘষে যাচ্ছিল।

গেরিয়ন ঘুমের মধ্যে যে স্বপ্ন দেখত, সেটিও ছিল লাল।

সেই লাল ভোর স্বপ্নের লাল জেলির মধ্যে
ডুবে যাচ্ছিল।

গেরিয়নের স্বপ্ন শুরু হয় লাল রঙে। তারপর কড়াই গলে বেরিয়ে আসে—

শিকড় ভেদ করে কুকুরের মতো লাফিয়ে ওঠে রুপালি পাল।

এক অচেনা কুকুর—
আরেকটি লাল দিনের মোহনায়।

২. ইতোমধ্যে তার আগমন

লবণাক্ত টিলাগুলোর ওপারে সে ছিল—সেই ‘সে’,
যে জানত স্বর্ণকুটিরের আসল ঠিকানা,
যেখানে লাল চূড়ার ওপর লাল ধোঁয়া ওড়ে।

৩. গেরিয়নের বাবা-মা

‘তুমি যদি রাতের খাবারের টেবিলে মুখোশ পরে থাকতেই চাও,
তবে বেশ, শুভরাত্রি’—তারা বলল।

তারপর তাকে টেনে নিয়ে গেল
রক্তক্ষরণকারী সিঁড়ি বেয়ে,
উত্তপ্ত, শুষ্ক বাহুর দিকে,
ইনকিউবাসের টিকটিক করা লাল ট্যাক্সির দিকে।

সে যেতে চায় না।
সে নিচে নামতে চায়,
বই পড়তে চায়।

৪. গেরিয়নের মৃত্যুর সূচনা

গেরিয়ন তার মনের লাল রাস্তা ধরে হেঁটে গেল। বলল—না,
এ ছিল হত্যা।

প্রিয় পশুগুলোকে মৃত পড়ে থাকতে দেখে
ভেঙে গেল তার বুক।

‘এই তো আমার সব প্রিয়জন’, বলল গেরিয়ন,
‘আর এবার পালা আমার।’

৫. গেরিয়নের আবর্তিত ভাগ্য

তার মা তা দেখলেন। মায়েরা এমনই হন।

‘আমার ওপর ভরসা রাখো’, বললেন তিনি,
তার কোমলতার রূপকার।

‘তোমাকে এখনই কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হবে না।’

তার লাল ডান গালের আড়ালে গেরিয়ন দেখতে পেল,
গরম প্লেটের কুণ্ডলিটি ধীরে ধীরে জ্বলে উঠছে।

৬. ওদিকে স্বর্গে

কাচের তলাওয়ালা নৌকার মেঝের ওপর দিয়ে
নিচের দিকে তাকিয়ে ছিলেন এথেনা।

তিনি আঙুল তুলে দেখালেন।
জিউস তাকালেন তাঁর দিকে।

৭. গেরিয়নের উইকএন্ড

পরে, ঠিক আছে—পরে।
তারা বার ছেড়ে ফিরে গেল সেন্টরের আস্তানায়।

সেন্টরের হাতে মাথার খুলি দিয়ে তৈরি একটি পেয়ালা,
যাতে মাপা আছে তিন দাগ পরিমাণ মদ।

পেয়ালাটি ঠোঁটে ছুঁইয়ে সে পান করল।

‘এপাশে এসো। তোমার পানীয়টি সঙ্গে করে নিয়ে আসতে পারো,
যদি একা আসতে ভয় হয় তোমার।’

সেন্টর তার পাশের সোফায় চাপড় দিল।

ছোট, লালচে-হলুদ এক জীবন্ত প্রাণী—
মৌমাছি নয়, যেন এক অজানা শিহরণ—
গেরিয়নের মেরুদণ্ড বেয়ে
ভেতর থেকে উঠে এল ওপরের দিকে।

৮. গেরিয়নের বাবা

একটি নীরব শেকড়ও হয়তো আর্তনাদ করতে জানে।

সে ভালোবাসত শব্দ চুষে নিতে।

দরজার চত্বরে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর
সে বলত, ‘এই তো এক সর্বশক্তিমান শব্দ—
নাইটবলস্নর্টেড’
(রাতে গর্জে ওঠা নাক ডাকার শব্দ)।

৯. গেরিয়নের যুদ্ধজীবন

গেরিয়ন মাটিতে কান চেপে শুয়ে রইল।

ঘোড়াদের শব্দ যেন
জীবন্ত পুড়ে যাওয়া গোলাপের মতো।

১০. শিক্ষাজীবন

সেকালে আইন ছিল দুর্বল,
কিন্তু পরিবার ছিল শক্তিশালী।

প্রথম দিন গেরিয়নের মা হাত ধরে তাকে নিয়ে গেলেন স্কুলে।

পরিপাটি করে দিলেন তার ছোট লাল ডানাগুলো,
তারপর ধাক্কা দিয়ে ঠেলে দিলেন দরজার ভেতরে।

১১. সত্য

‘এমন কি কোনো ছোট্ট ছেলে আছে,
যে নিজেকে দানব বলে ভাবে?’

‘কিন্তু আমার বেলায় আমি ঠিক আছি’,
পাহাড়ের চূড়ায় বসে থাকা কুকুরটিকে বলল গেরিয়ন।

আনন্দে লেজ নাড়ল কুকুরটি।

১২. ডানা

মার্চের এক ক্ষতবিক্ষত আকাশ থেকে পা ফেলে
সে ডুবে যায় অন্ধ আটলান্টিক সকালের গভীরে।

সমুদ্রসৈকতের মাইলের পর মাইল নিচে
একটি ছোট লাল কুকুর লাফিয়ে বেড়ায়,
মুক্ত এক ছায়ার মতো।

১৩. হেরাক্লেসের আঘাত

ছোট লাল কুকুরটি তা দেখেনি।
সে কেবল অনুভব করেছিল—
সব ঘটনার শেষ পরিণতি তো একটিই।

১৪. হেরাক্লেসের তীর

তীর মানেই মৃত্যু।

চিরুনির মতো তা ভেদ করল গেরিয়নের খুলি।

ছেলেটির ঘাড় একদিকে নুয়ে পড়ল,
ঠিক যেমন নগ্ন বাতাসের ঝাপটায়
লজ্জায় নুয়ে পড়ে কোনো এক পপি ফুল।

১৫. গেরিয়ন সম্পর্কে জানা সব সত্য

সে বিদ্যুৎ ভালোবাসত।
সে থাকত একটি দ্বীপে।

তার মা ছিলেন সমুদ্রগামী নদীর এক জলপরি।
আর তার বাবা ছিলেন সোনা কাটার যন্ত্র।

প্রাচীন পণ্ডিতদের টীকায় বলা হয়েছে,
স্টেসিকোরোস লিখে গেছেন—
গেরিয়নের ছিল ছয়টি হাত, ছয়টি পা ও ডানা।

সে ছিল লাল,
আর তার অদ্ভুত লাল গবাদিপশুগুলো
সবার ঈর্ষার কারণ ছিল।

হেরাক্লেস এসে তাকে হত্যা করে,
লুট করে তার লাল পশুগুলো,
এমনকি সেই কুকুরটিকেও।

১৬. গেরিয়নের সমাপ্তি

লাল পৃথিবী এবং তার সঙ্গে মানানসই
লাল লাল বাতাস বয়েই চলল।

কেবল রইল না গেরিয়ন।

পরিবর্তন

অ্যান কারসন

জাঁতাকলে পিষ্ট হতে হতে কোনো একভাবে কৈশোরে পা রাখল গেরিয়ন।

তারপর সে দেখা পেল হেরাক্লেসের।
আর তার জীবনের সমস্ত রাজ্যের বিন্যাস
যেন কয়েক ধাপ নিচে নেমে গেল।

তারা দুজন ছিল ট্যাংকের তলদেশের
দুটি উচ্চশ্রেণির ইয়েল মাছ।
তারা একে অপরকে চিনতে পেরেছিল
বাক্যের বাঁকা হরফের মতো স্পষ্টতায়।

শুক্রবার গভীর রাতে, ঠিক ভোর তিনটার দিকে,
বাড়িতে ফোন করার জন্য খুচরা পয়সা ভাঙাতে
বাস ডিপোতে ঢুকছিল গেরিয়ন।

ঠিক তখনই নিউ মেক্সিকো থেকে আসা বাসটি থেকে নামলেন হেরাক্লেস।

প্ল্যাটফর্মের কোণ ঘুরে গেরিয়ন দ্রুত সামনে আসতেই
ঘটল সেই মুহূর্তটি—
অন্ধত্বের ঠিক উল্টো পিঠ।

চোখের পলকে পৃথিবীর আলো
দু-একবার এপার-ওপার গলে গেল।

নিউ মেক্সিকো থেকে আসা বাসটির অন্য যাত্রীরা
ততক্ষণে হেরাক্লেসের পেছনে জটলা পাকিয়ে ফেলেছে।

এক হাতে স্যুটকেস, অন্য হাতে জামাটি প্যান্টের ভেতরে গোঁজার চেষ্টা করতে করতে
বাসের শেষ ধাপে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি।

—এক ডলার ভাঙিয়ে খুচরা পয়সা দিতে পারবেন?

নিজের গলায় শুনতে পেল গেরিয়ন,
সে কথাটি বলে উঠেছে।

—না, সরাসরি গেরিয়নের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন হেরাক্লেস।
তবে তোমাকে বিনা মূল্যে একটা কোয়ার্টার (পঁচিশ সেন্ট) দিতে পারি।

—কেন এমন করতে যাবেন আপনি?

—আমি বিনয়ী হতে বিশ্বাসী।

এর কয়েক ঘণ্টা পর তারা নেমে এল রেললাইনের ধারে,
সিগন্যাল বাতির আলোয় গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রইল।

বিশাল রাতটি তাদের মাথার ওপর দিয়ে বয়ে গেল,
ঝরিয়ে দিল তার নিজেরই কিছু ফোঁটা।

—তোমার খুব ঠান্ডা লেগেছে, হঠাৎ বলে উঠলেন হেরাক্লেস।
তোমার হাত দুটো বরফের মতো ঠান্ডা। এদিকে আনো।

বলে তিনি গেরিয়নের হাত দুটো
নিজের জামার ভেতরে ঢুকিয়ে নিলেন।

কেকে/এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close