শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬,
২২ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: ● ৭ নভেম্বর দেশের সব পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা      ● সীমান্তের ওপার থেকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে: প্রধানমন্ত্রী      ● মোংলায় পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      ● হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার ইকবাল সোবহান, মুচলেকায় মুক্ত রাজীব ঘোষ      ● শ্রমিকদের ব্যবহার করে রাষ্ট্রবিরোধী অপচেষ্টা চলছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী      ● একনেকে ৫৮ হাজার কোটি টাকার ১৩ প্রকল্প অনুমোদন      ● শেখ হাসিনার সাবেক তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী আটক      
জীবনানন্দ
বিভূতিভূষণ : প্রকৃতি, মানুষ ও অনন্ত জীবনের কথাশিল্পী
ইফতেখার রবিন
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ৩:৩৯ পিএম
সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

কোনো কোনো লেখক সময়কে অতিক্রম করে সাহিত্যে বেঁচে থাকেন। তাদের রচনার চরিত্র, পরিবেশ কিংবা ঘটনাপ্রবাহ হয়তো কোনো নির্দিষ্ট যুগের; কিন্তু তাদের উচ্চারিত জীবনসত্য কখনো পুরোনো হয় না। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তেমনই একজন কথাশিল্পী। তিনি যে বাংলার কথা লিখেছেন, তার অনেকটাই আজ বদলে গেছে; যে গ্রাম তিনি দেখেছেন, তার অনেকখানি আজ নগরায়ণের বিস্তারে হারিয়ে গেছে; যে নদী, বন, মাঠ, পথ, পাখি ও ঋতুচক্র তার সাহিত্যে বারবার ফিরে এসেছে, তার অনেকটাই আজ পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে। অথচ বিভূতিভূষণেরর লেখা আজও পাঠকের হৃদয়কে একইভাবে আলোড়িত করে।

কারণ তিনি কেবল একটি সময়ের গল্প বলেননি—তিনি বলেছেন মানুষের গল্প। মানুষের ক্ষুধা, দারিদ্র্য, স্বপ্ন, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, নিঃসঙ্গতা, বিস্ময়, আত্মমর্যাদা, প্রকৃতির প্রতি আকর্ষণ এবং অজানাকে জানার চিরন্তন আকাঙ্ক্ষার গল্প। আর মানুষের এই মৌলিক অনুভূতিগুলোর কোনো মেয়াদ নেই।

১২ সেপ্টেম্বর বাংলা সাহিত্যের এই অনন্য কথাশিল্পীর জন্মদিন। ১৮৯৪ সালের এই দিনে চব্বিশ পরগনা জেলার মুরাতিপুর গ্রামে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তার পৈতৃক নিবাস ছিল ব্যারাকপুর গ্রামে। পিতা মহানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন সংস্কৃতজ্ঞ, পণ্ডিত ও কবিমনের মানুষ। তার কাছেই বিভূতিভূষণের শিক্ষার সূচনা। পিতার বইয়ের সংগ্রহ এবং সাহিত্যপ্রবণতা শিশুমনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

অতি অল্প বয়সেই বিভূতিভূষণের মধ্যে পড়াশোনা ও লেখার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। তার শ্যালক চণ্ডীদাস চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, প্রায় পাঁচ বছর বয়স থেকেই তিনি পিতার কাছে ‘মুগ্ধবোধ’ ব্যাকরণ পড়তে শুরু করেছিলেন। পিতার কবিসত্তা ও অনুভূতিশীল মন তার সাহিত্যিক মানস গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পিতার অনুকরণে শিশুবয়সেই খাতায় পালা লিখতেন তিনি।

বিভূতিভূষণের শৈশব ছিল আর্থিক অনটনে ঘেরা। কিন্তু দারিদ্র্য তার দৃষ্টিকে সংকুচিত করেনি; বরং জীবনকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ করে দিয়েছিল। তিনি দেখেছিলেন অভাবী মানুষের মুখ, নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের অসহায়তা, গ্রামীণ জীবনের আনন্দ-বেদনা, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। পরবর্তী সময়ে তার সাহিত্যজগতে এই অভিজ্ঞতাগুলোই নানা চরিত্র ও ঘটনার মাধ্যমে ফিরে এসেছে।

গ্রামের পাঠশালায় তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শুরু। পরে বনগ্রাম উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। মেধাবী ছাত্র হিসেবে এন্ট্রান্স ও আইএ পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর ১৯১৮ সালে রিপন কলেজ থেকে ডিস্টিংশনসহ বিএ পাস করেন।

তবে তার জীবনের শুরুটা লেখক হিসেবে নয়। জীবিকার প্রয়োজনে তাকে শিক্ষকতা করতে হয়েছে, গৃহশিক্ষকতা করতে হয়েছে, বিভিন্ন চাকরির সঙ্গে যুক্ত হতে হয়েছে। জাঙ্গিপাড়া ও হরিনাভির শিক্ষকতা এবং পরবর্তী জীবনে ভাগলপুর অঞ্চলে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার সাহিত্যিক দৃষ্টিকে আরও প্রসারিত করে।

বিশেষ করে ভাগলপুর তার সাহিত্যজীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানকার অরণ্য, আদিবাসী ও প্রান্তিক মানুষের জীবন, প্রকৃতির বিপুল বিস্তার এবং সভ্যতার সঙ্গে অরণ্যের সংঘাত তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সেই অভিজ্ঞতারই শিল্পিত প্রতিফলন আমরা পরবর্তীকালে ‘আরণ্যক’-এ দেখতে পাই।

বিভূতিভূষণের জীবনের একটি বিস্ময়কর দিক হলো—তিনি প্রথম জীবনে লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখেননি। তার নিজের ডায়েরির কথায়, উপন্যাস-গল্প তো দূরের কথা, একদিন প্রবন্ধ লিখবেন—এমন কথাও তিনি ভাবেননি।

কিন্তু কখনো কখনো জীবন মানুষকে এমন পথে নিয়ে যায়, যে পথের কথা মানুষ নিজেও আগে জানে না।

১৯২০ সালের দিকে হরিনাভিতে শিক্ষকতা করার সময় পরিচয় হয় পাঁচুগোপাল নামে এক তরুণের সঙ্গে। সাহিত্যপ্রিয় এই তরুণ একদিন বিভূতিভূষণকে বই লেখার প্রস্তাব দেন। বিভূতিভূষণ তাতে গুরুত্ব দেননি। কিন্তু পরদিন স্কুলে গিয়ে তিনি দেখলেন—দেয়ালে তার উপন্যাস প্রকাশের বিজ্ঞাপন!

বন্ধুর এই কৌতুক তাকে বিব্রত করে। চারদিকে যখন প্রশ্ন উঠতে শুরু করল—‘উপন্যাস কবে বের হবে?’—তখন সম্মান রক্ষার তাগিদে শেষ পর্যন্ত তিনি লেখা শুরু করলেন। লিখলেন একটি গল্প। পাঠিয়ে দিলেন কলকাতার একটি মাসিক পত্রিকায়।
তারপর শুরু হলো উৎকণ্ঠার অপেক্ষা।

শেষ পর্যন্ত যে খামটি এলো, তা খুলে তিনি দেখলেন—গল্পটি ফেরত আসেনি। সম্পাদক জানিয়েছেন, তার রচনা মনোনীত হয়েছে এবং শিগগিরই প্রকাশিত হবে।

এই অপ্রত্যাশিত ঘটনাই যেন বাংলা সাহিত্যের জন্য এক সৌভাগ্যের মুহূর্ত।

১৯২১ সালে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তার প্রথম গল্প ‘উপেক্ষিতা’। শুরু হয় বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণের দীর্ঘ ও উজ্জ্বল যাত্রা।

১৯২৫ সালে ভাগলপুরে বসে তিনি শুরু করেন ‘পথের পাঁচালী’। ১৯২৮ সালে রচনা শেষ হয়। ১৯২৯ সালে বই আকারে প্রকাশিত হওয়ার পর বাংলা সাহিত্যে এর অভিঘাত ছিল গভীর।

‘পথের পাঁচালী’কে শুধু একটি দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারের কাহিনি বললে এর মহত্ত্বকে ছোট করা হয়। এটি আসলে জীবনকে তার সমস্ত আনন্দ-বেদনা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, স্বপ্ন ও মৃত্যুর সঙ্গে দেখার এক অনন্য উপন্যাস।

অপু ও দুর্গার চোখ দিয়ে পাঠক যে পৃথিবী দেখে, সেখানে দারিদ্র্য আছে; কিন্তু দারিদ্র্যই সব নয়। আছে কাশবন, রেলগাড়ি দেখার বিস্ময়, বৃষ্টির আনন্দ, ফল চুরি করার উত্তেজনা, দূরের অজানা পৃথিবীর প্রতি আকর্ষণ।

দুর্গার মৃত্যু তাই শুধু একটি চরিত্রের মৃত্যু নয়—এটি শৈশবের এক নির্মল পৃথিবীর আকস্মিক ভাঙন।

হরিহরের স্বপ্ন, সর্বজয়ার দীর্ঘশ্বাস, ইন্দির ঠাকরুণের নিঃসঙ্গতা—সব মিলিয়ে বিভূতিভূষণ এমন এক মানবিক জগৎ নির্মাণ করেছেন, যেখানে পাঠক চরিত্রদের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে না; বরং তাদের জীবনের অংশ হয়ে যায়।

এ কারণেই ‘পথের পাঁচালী’ সময়কে অতিক্রম করেছে।

‘পথের পাঁচালী’র ধারাবাহিকতায় ‘অপরাজিত’। এখানে অপুর জীবন আরও বিস্তৃত হয়। শৈশবের গ্রাম থেকে শিক্ষার জগৎ, পরিচিত পরিবেশ থেকে শহর, এবং ক্রমে বৃহত্তর পৃথিবীর দিকে এগিয়ে যায় সে।

অপুর মধ্যে আছে জানার আকাঙ্ক্ষা। সে থেমে থাকতে চায় না। পৃথিবী তাকে ডাকছে।

এই অপুর মধ্যে আমরা আধুনিক মানুষেরও প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। আজকের তরুণ যেমন নিজের পরিচিত পরিসর পেরিয়ে নতুন পৃথিবী আবিষ্কার করতে চায়, তেমনি অপুও অজানার দিকে এগিয়ে যায়।

তাই ‘অপরাজিত’ কেবল অপুর কাহিনি নয়; এটি মানুষের আত্মবিকাশের কাহিনি।

বিভূতিভূষণকে প্রকৃতির কথাশিল্পী বলা হয়। তবে তার প্রকৃতি নিছক সৌন্দর্যের অলংকার নয়।

তার কাছে প্রকৃতি মানুষের জীবনের অংশ। কখনো প্রকৃতি চরিত্রের আনন্দকে গভীর করেছে, কখনো বিষাদকে তীব্র করেছে, কখনো দিয়েছে মুক্তির অনুভূতি।

মেঠোপথ, নদী, কাশবন, শালবন, জ্যোৎস্না, বৃষ্টি, পাখির ডাক, সন্ধ্যার আলো—এসব তার সাহিত্যে যেন জীবন্ত চরিত্র।

‘পথের পাঁচালী’তে প্রকৃতি শিশুর বিস্ময়ের অংশ। ‘আরণ্যক’-এ প্রকৃতি হয়ে ওঠে এক বিশাল নৈতিক ও দার্শনিক প্রশ্ন। ‘ইছামতী’তে নদী ও জনজীবন পরস্পরের সঙ্গে মিশে যায়।


বিভূতিভূষণের সাহিত্য ভাষা ও ভূগোলের সীমা অতিক্রম করেছে। ‘পথের পাঁচালী’ ভারতীয় বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে; ইংরেজি ও ফরাসি ভাষাতেও এর অনুবাদ হয়েছে।

সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র ‘পথের পাঁচালী’ তার সাহিত্যকে বিশ্বদর্শকের কাছে আরও ব্যাপকভাবে পৌঁছে দেয়। অপু-দুর্গার জীবন তখন আর শুধু বাংলার একটি পরিবারের গল্প থাকে না; তা হয়ে ওঠে বিশ্বমানবতার গল্প।

একটি দরিদ্র পরিবারের শিশুর চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখেও যে বিশ্বমানবতার কথা বলা যায়—বিভূতিভূষণ তার প্রমাণ।

বিভূতিভূষণ কি আজও প্রাসঙ্গিক?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বরং প্রশ্নটি উল্টো করে করা যায়—কোন জায়গায় বিভূতিভূষণ আজ প্রাসঙ্গিক নন?
প্রকৃতি নিয়ে ভাবতে গেলে তিনি প্রাসঙ্গিক।
দারিদ্র্য নিয়ে ভাবতে গেলে তিনি প্রাসঙ্গিক।
শিশুর শৈশব নিয়ে ভাবতে গেলে তিনি প্রাসঙ্গিক।
নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের স্বপ্ন নিয়ে ভাবতে গেলে তিনি প্রাসঙ্গিক।
মানুষের একাকিত্ব নিয়ে ভাবতে গেলে তিনি প্রাসঙ্গিক।
ভোগবাদী সমাজের বিপরীতে জীবনের সরল সৌন্দর্য খুঁজতে গেলে তিনি প্রাসঙ্গিক।
পরিবেশ রক্ষা নিয়ে ভাবতে গেলে তিনি প্রাসঙ্গিক।
মানুষে মানুষে সহমর্মিতা নিয়ে ভাবতে গেলে তিনি প্রাসঙ্গিক।
এমনকি আধুনিক মানুষের আত্মপরিচয় ও আত্মঅন্বেষণের প্রশ্নেও তিনি প্রাসঙ্গিক

একটি মেঠোপথ, একটি নদী, একটি দরিদ্র পরিবার, একটি শিশুর বিস্মিত চোখ, একটি বৃদ্ধার নিঃসঙ্গতা—এসবের মধ্যেও একটি মহাবিশ্ব লুকিয়ে থাকতে পারে।

১৯৫০ সালের ১ নভেম্বর ঘাটশিলায় বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনাবসান ঘটে। বয়স হয়েছিল মাত্র ৫৬ বছর। তার জীবনের দৈর্ঘ্য সীমিত ছিল, কিন্তু তাঁর সাহিত্যিক জীবন সময়ের সীমা মানেনি।
আজ তার মৃত্যুর বহু দশক পর আমরা এমন এক পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে আছি, যে পৃথিবী প্রযুক্তিতে অনেক এগিয়েছে, কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে পিছিয়ে গেছে; যোগাযোগে বিপ্লব ঘটেছে, কিন্তু মানুষের ভেতরের একাকিত্ব কমেনি; অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে, কিন্তু বৈষম্যও রয়ে গেছে; শিশুর হাতে অসংখ্য বিনোদন এসেছে, কিন্তু মুক্ত শৈশব সংকুচিত হয়েছে।


কেকে/সাশ 




মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close