প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। গতকাল শনিবার বেলা ১১টার দিকে পরীক্ষা শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরীক্ষা স্থগিতের পর প্রতিবাদে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, শাহবাগ, নীলক্ষেত মোড়, সাতমসজিদ সড়ক ও মিরপুরসহ ঢাকার বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করেন চাকরিপ্রার্থীরা।
এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে শাস্তিসহ পাঁচ দফা দাবি জানিয়ে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটামও দিয়েছেন চাকরিপ্রার্থীরা। এ সময়ের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা। একই ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও ছাত্রদলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন।
এদিকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় মন্ত্রণালয়ের গাফিলতিকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, ইতঃপূর্বে বিভিন্ন চাকরি পরীক্ষার প্রশ্ন স্বতন্ত্র কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করানো হলেও এবার মন্ত্রণালয় নিজেই তা তৈরি করেছেন। ফলে এখানে মন্ত্রণালয়ের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় জড়িত থাকার ব্যাপক সন্দেহ তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে প্রশ্নপত্র ফাঁস, এটি দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের চরম গাফিলতি প্রকাশ। তাদের মতে— এর ফলে শুধু চাকরিপ্রত্যাশীদের ভোগান্তির শিকার হয়নি, সরকারের ইমেজও সংকটে ফেলেছে। প্রশ্ন উঠেছে— সাধারণ একটি নিয়োগ পরীক্ষায় যদি প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে সরকারসংশ্লিষ্টরা ব্যর্থ হয়, তাহলে বড় ধরনের নিয়োগ কীভাবে সামলাবেন।
এ প্রসঙ্গে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশাসন উইংয়ের পরিচালক ডি এম আতিকুর রহমান বলেন, ফেসবুকে একটি পোস্ট দেখার পর পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রশ্নের সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্নের মিল পাওয়া গেছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পুরোটা তো দেয়নি, যতটুকু দিয়েছে মিল পাওয়া গেছে।’
চাকরিপ্রার্থী ক্ষোভ, বিভিন্ন সড়কে অবরোধ
পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা নিয়েও বিভিন্ন কেন্দ্রে ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি দেখা যায়। কোনো কোনো কেন্দ্রে পরীক্ষা শুরুর মাত্র পাঁচ মিনিট আগে মাইকে পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা দেওয়া হয়। আবার কোনো কোনো কেন্দ্রে নির্ধারিত সময়ের প্রায় আধা ঘণ্টা আগেই পরীক্ষার্থীদের প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়। সেখানে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট পরীক্ষা নেওয়ার পর তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এমন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি ও হতাশা তৈরি হয়।
রাজধানীর কবি নজরুল সরকারি কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে আসা এক চাকরিপ্রার্থী খোলা কাগজকে বলেন, বেলা ১১টায় পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সকাল ৯টার দিকেই ফেসবুকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর ছড়িয়ে পড়ে। তিনি বলেন, সাধারণত স্বতন্ত্র কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি করা হয়, কিন্তু এবার মন্ত্রণালয় নিজেই প্রশ্নপত্র তৈরি করেছে। এরমধ্যে প্রশ্নপত্র ফাঁস। এটা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের চরম দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। যার মাশুল দিচ্ছে সাধারণ চাকরিপ্রত্যাশীরা।
সাইফুল ইসলাম নামে আরেক পরীক্ষার্থী বলেন, পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় তিনি চরম ভোগান্তি ও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তার ভাষ্য, তার মতো দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেকেই ধারদেনা করে ঢাকায় এসেছেন। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পরীক্ষা দিতে এসে শেষ মুহূর্তে পরীক্ষা স্থগিতের খবর পেয়ে তারা হতাশ হয়েছেন। এ পরিস্থিতির দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে বলেও দাবি করেন তিনি।
এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীদের বিক্ষোভ করতে দেখা যায়। মিরপুরে কেন্দ্রের সামনের সড়ক অবরোধ করেন চাকরিপ্রার্থীরা। অন্যদিকে মতিঝিল বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, কলোনি উচ্চবিদ্যালয়, বালক উচ্চবিদ্যালয়, বাংলা কলেজ, খিলগাঁও মডেল কলেজ ও শাপলা চত্বর কেন্দ্র ঘিরেও বিক্ষোভ হয়।
পাঁচ দাবিতে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের দাবিতে পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছেন চাকরিপ্রার্থীরা। এসব দাবি পূরণে সরকারকে ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন তারা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন চাকরিপ্রার্থীরা।
এদিকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ তদন্তে উচ্চপর্যায়ের পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে সরকার। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মাহফুজুল আলম খানকে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। পরে স্থগিত হওয়া পরীক্ষার নতুন তারিখও ঘোষণা করা হয়েছে।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ১৬ অক্টোবর বিকেল ৩টায় পরীক্ষাটি পুনরায় অনুষ্ঠিত হবে।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ছাত্রদলের নিন্দা
প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের নিন্দা জানিয়ে দ্রুততম সময়ে নতুন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। এক বিবৃতিতে সংগঠনটি বলে, এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির কোনো বিকল্প নেই। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমালোচনা
প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার, চাকরিরত ব্যক্তিদের চাকরিচ্যুত করা এবং আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন। তিনি বলেন, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করতে হবে। এ ঘটনায় জড়িত চাকরিরত ব্যক্তিদের চাকরিচ্যুত করে আইনের আওতায় আনতে হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ। তিনি এ ঘটনাকে পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে ‘নির্মম রসিকতা’ বলে মন্তব্য করেছেন।
অন্যদিকে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। একইসঙ্গে পরীক্ষার্থীদের আর্থিক ক্ষতি পূরণে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে দলটি।
কেকে/এআই