দেশে কোনোভাবেই হাম সংক্রমণের লাগাম টানা যাচ্ছে না। প্রতিদিন দীর্ঘ হচ্ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৮৬ জন শিশু। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক প্রাদুর্ভাব বলে আখ্যায়িত করেছেন। তারা এ রোগের নির্মূলে দ্রুত টিকা কার্যক্রম বেগবান করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। একই সাথে আক্রান্তদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যবিধি মানার ওপর জোর দিয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত হেলথ বুলেটিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৫৫ জনে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ১০৪ জন শিশু এবং হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১,০৫১ জন।
অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ পর্যন্ত দেশে মোট সন্দেহভাজন হাম আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ ৩ হাজার ৮৪৮ জনে পৌঁছেছে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ২২,৩২৮ জনের শরীরে। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে মোট ১ লাখ ৮০ হাজার ৯৪৫ রোগী, যাদের মধ্যে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৪৫৪ জন ছাড়পত্র পেয়ে ইতোমধ্যে বাড়ি ফিরেছে।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও মহামারি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানের চেইন ভেঙে পড়া এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ব্যাপক ধসের কারণেই এই ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে প্রকট অপুষ্টির সমস্যাটি এই রোগ এবং মৃত্যুর হার বাড়িয়ে দিচ্ছে। কারণ, ৫ বছরের কম বয়সি প্রায় ২৮ শতাংশ শিশু খর্বকায় এবং ১০ শতাংশ কৃশকায়।
এ বিষয়ে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, টিকার মাধ্যমে হাম প্রতিরোধ করা সম্ভব। টিকা দিতে হবে মাইক্র-প্লানিং করে। যাতে করে কোনো শিশু বাদ না পড়ে। যদি ৬ মাস থেকে ১৫ বছরের শিশুরা টিকার বাইরে থাকে তাহলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে। এমনও হতে পারে যে সারা দেশের জনগণকে টিকা দিতে হতে পারে সংক্রমণ রুখতে। বিশেষ করে ৬ মাসের কম বয়সি শিশুদের মাকে টিকার আওতায় আনতে হবে। এসব কার্যক্রম এলোপাতাড়িভাবে নয়, সমন্বিতভাবে করতে হবে। মূলত, টিকার ক্ষেত্রে অবহেলার কারণে এ রোগের প্রকোপ বেড়েছে। ক্রমবর্ধমান টিকা-অনীহা, কোভিড-১৯ মহামারির সময় টিকাদানে বিঘ্নতা—এ সবকিছুই হাম ফিরে আসার কারণ। এ ছাড়া এ বছর অনেক শিশু টিকা কার্যক্রম থেকে বাদ পড়েছে। এখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, এনজিও এবং সরকারকে সমন্বিত হয়ে কাজ করতে হবে এ রোগ নির্মূলে।
তিনি আরও বলেন, আক্রান্তদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। কয়েক দিন বেডরেস্টে থাকলে রোগী দ্রুত সুস্থ হবে। অপুষ্ট রোগীদের সুষম খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। সেকেন্ডারি হাসপাতালগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। প্রথমে উপজেলা বা সেকেন্ডারি পর্যয়ের হাসপাতালগুলোতে রোগীর চিকিৎসা করতে হবে। এরপর রোগীর অবস্থা খারাপ হলে তাকে আরও উন্নত বিভাগীয় বা শহুরে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, হামের কোনো উপসর্গ দেখা গেলে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করে সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। গলা ব্যথা, ক্লান্তি, জ্বর ও র্যাশ দেখা দিলে অবহেলা করা যাবে না। এ রোগটি ভুব ছোঁয়াচে, এ কারণে আক্রন্তকে আলাদা রাখতে হবে। টিকা প্রয়োগ ও স্বাস্থ্যবিধি মানলে হাম নির্মূল করা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, অনেক বাচ্চা অপুষ্টিতে ভুগছে। এ কারণে হামে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে। গরিব শিশুদের পুষ্টিকর খাদ্য দিতে হবে এবং মায়েদের উচিত তার ছোট বাচ্চাকে বুকের দুধ খায়ানো। তাহলে হামে আক্রান্ত হলেও মৃত্যুঝুকি কমবে। একই সাথে কোনো বাচ্চা হামে আক্রান্ত হলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
কেকে/এআই