সরকারিভাবে এলপিজির দাম নির্ধারণ করেও বাজারের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা সংকটের মধ্যে নতুন করে দাম নির্ধারণের পরও নির্ধারিত মূল্যে মিলছে না গ্যাস সিলিন্ডার। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত ১২ কেজির সিলিন্ডারপ্রতি দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু গ্রাহকদের কিনতে হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকায়। সরবরাহ ঘাটতির পাশাপাশি আমদানি থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত সাপ্লাই চেইনের বিভিন্ন স্তরে বাড়তি দাম নেওয়া হচ্ছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে ঢাকার বাইরের বিভিন্ন এলাকায় একই চিত্র দেখা গেছে।
গ্রাহকদের অভিযোগ, সরকার দাম নির্ধারণ করলেও সেই দামে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। আবার সরকার বাজারে সেরকম তদারকিও করছে না। ব্যবসায়ীরা নিজেদের ইচ্ছেমতো দাম নিয়ে সিলিন্ডার বিক্রি করছেন।
আমদানি থাকলেও সংকট কেন
বাংলাদেশে এলপিজি আমদানির ৯৮ শতাংশের বেশি বেসরকারি কোম্পানির মাধ্যমে হয়। বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৩২ থেকে ৩৩টি কোম্পানির লাইসেন্স থাকলেও এলপিজি আমদানি করছে ১০ থেকে ১২টি কোম্পানি। এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে দেশে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। আগস্টে আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫৮ হাজার টন।
আমদানির পরিমাণ প্রায় একই থাকলেও বাজারে সরবরাহ সংকট কেন তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আমদানিকারক ও অপারেটরদের কেউ কেউ বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় ও প্রিমিয়াম বেড়ে যাওয়ায় এলপিজির খরচ বেড়েছে। আবার যেসব কোম্পানি নিজেরা আমদানি না করে অন্য অপারেটরদের কাছ থেকে গ্যাস কিনে বোতলজাত করে, তারাও পর্যাপ্ত সরবরাহ পাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছে।
রাজধানীর হাতিরপুলের এক গ্রাহক জানান, গত ২ অক্টোবর ৫০ টাকা ডেলিভারি চার্জসহ ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে তার খরচ হয়েছে ২ হাজার ৫০০ টাকা। ওই সময় সিলিন্ডারটির সরকার নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। তবে বেশি দামে বিক্রির বিষয়টি স্বীকার করেন বিক্রেতা। তিনি জানান, সরবরাহ সংকটের কারণে তারও খরচ বেড়েছে। সর্বশেষ কেনা সিলিন্ডারে তার খরচ পড়েছে ২ হাজার টাকা, যা তিনি সর্বোচ্চ ২ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি করছেন। মিরপুরেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে। সেখানে এক দোকানদার ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম জানিয়েছেন ২ হাজার ৪০০ টাকা।
বিভিন্ন স্তরে বাড়তি দাম
বিইআরসির নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, অপারেটর কোম্পানির কাছ থেকে একজন ডিলার বা পরিবেশকের ১২ কেজির সিলিন্ডার কেনার কথা ১ হাজার ৭৪২ টাকায়। ডিলারের মুনাফা ৫০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতার মুনাফা ৪০ টাকা ধরে গ্রাহক পর্যায়ে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। কিন্তু বাস্তবে ডিলার পর্যায়েই নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ব্যবসায়ী সমিতির নির্দেশনাও মানা হচ্ছে না
এলপিজি ব্যবসায়ী সমিতিও অপারেটর পর্যায়ে বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগ তুলে বিইআরসিকে চিঠি দিয়েছে। সমিতির দেওয়া তথ্যে, নতুন মূল্য নির্ধারণের পর বিভিন্ন অপারেটর ডিলারদের প্রতি সিলিন্ডার ১ হাজার ৭৪০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। যদিও কয়েকটি কোম্পানি নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দামেও সিলিন্ডার দিচ্ছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস
এলপিজির নির্ধারিত দাম কার্যকর করতে জ্বালানি মন্ত্রণালয় সারা দেশের জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা দিয়েছে। জেলা প্রশাসকরা ডিলারদের সঙ্গে আলোচনা করার পাশাপাশি অভিযানও পরিচালনা করছেন। বিইআরসি জানিয়েছে, আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করে সংকটের কারণ অনুসন্ধানে কমিটি গঠন করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনের মাধ্যমে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু এ নির্দেশনার কোনো প্রভাবই বাজারে পড়ছে না।
কেকে/এআই