এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নিয়ে এমনিতেই চলছে নৈরাজ্য। ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে ক্রেতাদের নির্ধারিত দামের চেয়ে অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। তবু ঠিক মতো মিলছে না এলপিজি সিলিন্ডার। এর মধ্যেই নিজেদের বিভিন্ন দাবি আদায়ে আগামী বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার সারা দেশে এলপিজি বিক্রি বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এতে নতুন করে সংকট তৈরির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, দাবি-দাওয়ার আড়ালে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে মুনাফা খুঁজছে এসব ব্যবসায়ীরা।
তাদের ভাষ্য, পরিবেশকদের কমিশন বৃদ্ধি, ব্যবসায়িক হয়রানি বন্ধসহ কিছু দাবির যৌক্তিকতা থাকতে পারে। কিন্তু সেই দাবিতে হঠাৎ করে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধের ঘোষণা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়াবে। বিশেষ করে রান্নার কাজে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোকে বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা করতে গিয়ে বাড়তি খরচ ও ভোগান্তির মুখে পড়তে হতে পারে।
ব্যবসায়ীদের এ সিদ্ধান্ত সাধারণ ভোক্তাকে জিম্মি করা উল্লেখ করে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক খোলা কাগজকে বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের এ ঘোষণা লাখ লাখ ভোক্তাকে একধরনের জিম্মি করা। কারণ এটা এমন একটা বিষয়— যার সঙ্গে মানুষের প্রাত্যহিক জীবন ও বেঁচে থাকা যুক্ত। এভাবে দাবি আদায়ের জন্য দুদিন বন্ধ রাখা এবং সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। এ ধরনের সুযোগ কাউকে দেওয়া যাবে না। তাদের যৌক্তিক দাবি থাকলে তারা সরকারের সঙ্গে বসবে, কথা বলবে, স্মারকলিপি দেবে, দেন-দরবার করবে এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করবে। কিন্তু হঠাৎ করে এভাবে সেবা বন্ধ করে দেওয়া সরাসরি মানুষের পেটে লাথি মারার সমান।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ সিদ্ধান্তের পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না, তাও অনুসন্ধান করা দরকার। বর্তমান সরকারকে বহু দিক থেকে অকার্যকর ও ব্যর্থ প্রমাণ করার নানা তৎপরতা আমরা দেখছি। এর পেছনে কোনো অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা রয়েছে কি না; গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তা খতিয়ে দেখা উচিত।’
এ বিষয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান খোলা কাগজকে বলেন, ‘এলপিজি গ্যাস একটি জরুরি সেবা। ১৮ কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন এখন এর ওপর নির্ভরশীল। শহরের বস্তি থেকে শুরু করে গ্রামের ছোট চায়ের দোকান; সবখানেই সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করা হয়। ফলে ফায়ার সার্ভিস কিংবা বিদ্যুৎ বিভাগের মতো সংস্থাসমূহ যেমন চাইলেই ধর্মঘটে যেতে পারে না, এলপিজি পরিবেশকরাও তা পারেন না। লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘন করে ধর্মঘট ডেকে পুরো দেশকে জিম্মি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকার ২৫২ টাকা নতুন করে দাম নির্ধারণ করলেও ব্যবসায়ীরা তা মানছেন না। তারা নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করছেন। এতে সরকার যেমন বিব্রত হচ্ছে, তেমনি সাধারণ মানুষও ভুক্তভোগী হচ্ছে। এখানে সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকা প্রয়োজন। লাইসেন্সের শর্ত অমান্য করে যারা ধর্মঘট করছে, তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’
গতকাল সোমবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি মো. সেলিম খান এ কর্মসূচির ঘোষণা দেন। তিনি জানান, সমিতির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ১৫ ও ১৬ অক্টোবর টানা দুই দিন সারা দেশে এলপি গ্যাসের দোকান বন্ধ থাকবে। দাবি পূরণ না হলে পরবর্তী সময়ে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে।
ব্যবসায়ীদের দাবির মধ্যে রয়েছে পরিবেশকদের কমিশন বৃদ্ধি, কোম্পানিগুলোর ইচ্ছেমতো মাসে একাধিকবার দাম বাড়ানোর প্রবণতা বন্ধ, দাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিইআরসির নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কোম্পানিগুলোর সিলিন্ডারে গ্যাস ভরার ব্যবস্থা চালু এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অযৌক্তিক জরিমানা আরোপ বন্ধ করা।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বর্তমান নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি করা কঠিন। এ কারণে প্রতি সিলিন্ডারে পরিবেশকদের কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা করার দাবি জানিয়ে গত ৮ অক্টোবর বিইআরসিতে চিঠি দিয়েছেন তারা। তবে কমিশন বাড়ানোর দাবির সঙ্গে সাধারণ মানুষের জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, এ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ভোক্তারা।
রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন তারিক রহমান। তিনি বলেন, বাজারে এমনিতেই সবকিছুর দাম বেশি। গ্যাস কিনতে গিয়ে নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি টাকা দিতে হচ্ছে। এখন আবার দুই দিন বিক্রি বন্ধ রাখলে আমরা কোথা থেকে গ্যাস পাব? ব্যবসায়ীদের দাবি থাকতে পারে, কিন্তু তার জন্য সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলা কেন?
উত্তরার এক গৃহিণী বলেন, আমাদের বাসায় রান্নার জন্য এলপিজি ছাড়া বিকল্প নেই। সিলিন্ডারের গ্যাস শেষ হয়ে গেলে নতুন সিলিন্ডার কিনতেই হবে। আর ব্যবসায়ীরা দোকান বন্ধের ঘোষণা দিলেও, আদতে বন্ধ থাকবে না। বরং এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কেউ কেউ আরও বেশি টাকা নেবে। এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। সবকিছুর মূলে হচ্ছে মুনাফা। তিনি আরও বলেন, গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ থাকলে দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হবে। ব্যবসায়ীদের সমস্যার সমাধান সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে হওয়া উচিত।
মিরপুরের বাসিন্দা মিজানুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ব্যবসায়ীদের কমিশন কম হলে তারা কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানাবেন, প্রয়োজনে আলোচনায় বসবেন। কিন্তু বিক্রি বন্ধ করে দিলে ক্ষতিটা হবে সাধারণ মানুষের। আমরা তো দাম নির্ধারণ করি না, কমিশনও ঠিক করি না। তাহলে তাদের দাবির চাপ আমাদের ওপর কেন পড়বে?
এদিকে ভোক্তা-সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানির মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের বাজারে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা জরুরি। ব্যবসায়ীদের ন্যায্য কমিশন, পরিবেশকদের ব্যয় ও বাজার পরিচালনার বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। একইসঙ্গে ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষা, নির্ধারিত দামে পণ্য বিক্রি ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। এ ছাড়া ব্যবসায়ীদের দাবি নিয়ে বিইআরসি ও সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ রয়েছে। সেখানে সমাধান না হলে আইনসম্মত উপায়ে দাবি উত্থাপন করা যেতে পারে। কিন্তু সরবরাহ বন্ধের মতো কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হলে তার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। এ ছাড়া বাজারে যখন নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগ রয়েছে, তখন বিক্রি বন্ধের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে কৃত্রিম সংকট কিংবা অতিরিক্ত দাম আদায়ের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
কেকে/ এমএস