দেশের মানসিক রোগে চিকিৎসায় রোগীদের অন্যতম ভরসাস্থল জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউ ও হাসপাতাল। প্রতিদিন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বহু মানুষ হাসপাতালটিতে চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। চারশ শয্যার এই প্রতিষ্ঠানে রয়েছে ইনডোর, বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগ। এ ছাড়া রয়েছে প্যাথলজি বিভাগ। হাপাতাল সূত্রমতে, বহির্বিভাগে প্রতিদিন সেবা নেন পাঁচ শতাধিক রোগী।
তবে দেশের জাতীয় এই ইনস্টিটিউট ও হাসাপতালের সেবার মান নিয়ে রোগী স্বজনদের মধ্যে রয়েছে অসন্তোষ। চিকিৎসকদের সময়মত উপস্থিত না হওয়া, পর্যাপ্ত সরকারি ওষুধ না পাওয়া, হাসপাতালের স্টাফদের দুর্ব্যবহার ও সিট পেতে বিড়ম্বনাসহ নানান অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। রোগীদের আত্মীয়দের অভিযোগ এ হাসপাপতালে অনেকে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিলেও ভালো হননি। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
কুমিল্লা থেকে মেয়ে আকলীমাকে নিয়ে এসেছেন জাকির হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে এক মাস ধরে অস্বাভাবিক আচরণ করছে। বিভিন্ন অসংলগ্ন কথা ও গালি-গালাজ করে। এমনকি পরিবারের সদস্যদের মারধর করে। এরপর তাকে এখানে নিয়ে আসি এবং ভর্তি করি। কিন্তু, এখানে ডাক্তাররা সময়মতো উপস্থিত হয় না। অধিকাংশ চিকিৎসা চলে নার্সদের মাধ্যমে। এ ছাড়া শিক্ষানবিশ ডাক্তারদের দিয়ে কাজ চালানো হয়।’
নোয়াখালী থেকে আসা সালাউদ্দিন জানান, তার বোন তাহমিনা (২৪) হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় তাকে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে। এখানে আসার পর চিকিৎসা পেতে তাকে চরম বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়েছে। ভালো কেবিন পেতে অসদুপায়ে টাকা লেনদেন হয়, এ কারণে ভালো বেড পাননি। বড় ডাক্তাররা ছয় দিনে মাত্র দুইবার রাউন্ড দিয়েছে। হাসপাতালের চিকিৎসার মান অনেক খারাপ। ডাক্তাররা দায়িত্ব নিয়ে কাজ করেন না। তারা নার্সদের মাধ্যমে রোগীদের চিকিৎসা দেন। অনেক সময় ভর্তি হওয়া রোগীকে সরকারি ওষুধ দেওয়া হয় না। কারণ জিজ্ঞাসা করলে, নার্সরা বলেন ওষুধের সাপ্লাই নেই। হাসপাপতালের স্টাফরা চরম দুর্ব্যবহার করে।
ফরিদপুরের রোগী ফাহিম খানের মা নুরজাহান বেগম জানান, তার ছেলে এইচএসসিতে পড়া অবস্থায় অসুস্থ হয়ে পড়ে। ওষুধ খাওয়ালে ভালো থাকেন, এরপর আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে এ পরিস্থিতি চলছে। এ হাসপাতালে অনেক দিন চিকিৎসা করেও তাকে সুস্থ করা যায়নি। এখানে কেউই দায়িত্ব নিয়ে কাজ করেন না। এ ছাড়া বহির্বিভাগে থাকা রোগী ও তাদের স্বজনরা জানিয়েছেন, হাসপাপতাল থেকে সব ওষুধ দেওয়া হয় না। ত্রিশ দিনের চিকিৎসার ক্ষেত্রে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ২০ দিনের ওষুধ দেয়। এ ছাড়া বেশ কিছু ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়।
৫৭ চিকিৎসককে সতর্ক করেছিল মন্ত্রণালয়:
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ৫৭ জন চিকিৎসককে সতর্ক করা হয়েছিল। অনুপস্থিতি ও বিলম্বে উপস্থিতির জন্য হাসপাতালটির এসব ডাক্তারকে সতর্ক করা হয়। চলতি বছরের ১৯ থেকে ২৫ আগস্ট মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের শৃঙ্খলা অনুবিভাগ থেকে সিনিয়র সহকারী সচিব সাদিয়া আফরিন স্বাক্ষরিত পৃথক পৃথক চিঠিতে সংশ্লিষ্টদের এই সতর্কবার্তা পাঠানো হয়।
মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, গত ৮ মার্চ স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল পরিদর্শনের সময় আপনি বিলম্বে উপস্থিত হন/উপস্থিত হননি। এতে প্রত্যাশিত স্বাস্থ্য সেবা বিঘ্নিত হয়েছে বিধায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুসারে অসদাচরণের সামিল। প্রথমবার অপরাধ বিবেচনায় আপনাকে নির্দেশক্রমে সতর্ক করা হলো। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটলে আপনার বিরুদ্ধে বিধি-মোতাবেক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
হাসপাতাল ঘিরে মাদকসেবীদের আড্ডা :
এ মানসিক হাসপাতালটির আশপাশে অসংখ্য অবৈধ দোকান রয়েছে। রাতে এ হাসপাতালের গেটের ভিতরে-বাইরে চলে অবাধ মাদকসেবন। এসব বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ উদাসীন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের আবাসিক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জেবুন নাহার লাকিকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি বর্তমানে ছুটিতে আছি। এসব বিষয়ে আমি কোনো কথা বলতে পারব না।’
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক প্রফেসর ডা. সাইফুন নাহার বলেন, ‘ডাক্তাররা রোগীদের সেবায় সময়মতো উপস্থিত হন না, এটা মিথ্যা কথা। তারা ঠিকভাবে সেবা দেন। এ ছাড়া আমাদের এখানে অনেক ইন্টার্ন ডাক্তার আছেন। যদি কেউ প্রমাণ করতে পারেন যে সিট বা কেবিন পেতে টাকা লেনদেন হয়, তবে অভিযুক্তদের শাস্তি দেওয়া হবে। কেউ ফ্রি সরকারি ওষুধ না পেলেও জানাতে হবে, তবেই প্রতিকার মিলবে। যদি কেউ তথ্য না দেয়, তাহলে কীভাবে ব্যবস্থা নেব।’
স্টাফদের দুর্ব্যবহার, হাসপাতালের আশপাশে মাদকসেবীদের আড্ডা এবং দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিয়ে ভালো না হওয়া রোগীদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ হাসপাতালের স্টাফরা খুব কম বেতন পান। তারা প্রশিক্ষিত নন। এ কারণে অনেক সময় দুর্ব্যবহারের অভিযোগ আসে। অনেক আক্রমণাত্মক ও মারমুখী রোগী সামলানোর কারণে তারা এমনটা করেন। হাসপাতালের আশপাশে মাদকসেবীদের আড্ডা ও অবৈধ দোকানের বিষয়ে পুলিশকে জানানো হয়েছে, তারা ব্যবস্থা নেবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘ডায়াবেটিস যেমন ভালো হয় না কিন্তু নিয়ন্ত্রণে থাকে। ঠিক তেমনিভাবে অনেক মানসিক রোগ ভালো হয় না, তবে এটা নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু, কিছু মানসিক রোগ দ্রুতই ভালো হয় যায়।’
কেকে/ এমএস