নারীদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাতায়াত নিশ্চিত করতে চালু করা হয়েছে ‘পিংক বাস’ সেবা। শুরুতে যাত্রীসংখ্যা কম থাকলেও এক মাসের মধ্যে তা দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু যাত্রী বাড়লেও আয় বাড়েনি প্রত্যাশিত হারে। ফলে সেবা পরিচালনায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনকে (বিআরটিসি) প্রতিদিন ভর্তুকি দিতে হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। মাস শেষে এ ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ১৫ থেকে ১৮ লাখ টাকা। সীমিত ট্রিপ, স্বল্প রুট, দীর্ঘ অপেক্ষা ও চালকসংকটে যাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী সেবা দিতে না পারায় সম্ভাবনাময় এই উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
বিআরটিসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রাজধানীতে ১৩টি পিংক বাস চলাচল করছে। এসব বাস পরিচালনায় রয়েছেন ১৫ জন নারী চালক ও ২৪ জন হেল্পার। আরও ৩২ জন নারী চালক ও হেল্পার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। সেবা চালুর প্রথম দিকে প্রতিদিন বাসগুলোতে যাতায়াত করতেন প্রায় ৬৫০ জন। এক মাসের ব্যবধানে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩০০ জনে। বর্তমানে ভাড়া থেকে দৈনিক আয় হচ্ছে প্রায় ১৫ হাজার টাকা। বিপরীতে পরিচালন ব্যয় মেটাতে প্রতিদিন প্রয়োজন হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা ভর্তুকি।
পিংক বাসের অন্যতম বড় সমস্যা সীমিত ট্রিপ ও অনিয়মিত সময়সূচি। বাসগুলো সাধারণত সকাল ৭টা থেকে ৮টা ৪০ মিনিটের মধ্যে চলাচল শুরু করে। বিকেলে দ্বিতীয় দফায় বাস চলে বিকেল ৪টা থেকে সাড়ে ৫টার দিকে। ফলে দিনের বড় একটি সময় বাসগুলো চলাচলের বাইরে থাকে। অন্যদিকে, যাত্রীদের প্রয়োজনের সময় বাস না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
বেসরকারি চাকরিজীবী ফারজানা আক্তার বলেন, ‘পিংক বাসে যাতায়াত অবশ্যই স্বস্তিদায়ক। অন্যান্য গণপরিবহনের তুলনায় ভালো। তবে বেশির ভাগ সময় বাসের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। কখনো বাস আসে বিকেল ৪টায়, কখনো ৫টায়। পর্যাপ্ত বাস না থাকায় বাধ্য হয়েই অনেক সময় অন্য গণপরিবহনে উঠতে হয়।’
আরেক নারী যাত্রীর অভিযোগ, প্রতিটি রুটে দিনে মাত্র এক বা দুটি ট্রিপ পরিচালিত হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে বাস পাওয়া যায় না। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা এড়াতে অনেকেই বিকল্প গণপরিবহন ব্যবহার করেন। এতে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ার পাশাপাশি পিংক বাসের সম্ভাব্য যাত্রীও হারাচ্ছে সেবাটি।
এ বিষয়ে বিআরটিসির জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা মোস্তাকিম ভূঞা বলেন, পিংক বাসের সংখ্যা ও রুট বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে বাসের সংখ্যাও বাড়ানো হবে। তবে পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বাসের সংখ্যা বাড়ালেই এ সেবার সমস্যার সমাধান হবে না। কোন রুটে কখন যাত্রীর চাপ বেশি, কোথায় বাসের চাহিদা রয়েছে এবং কীভাবে নিয়মিত সেবা নিশ্চিত করা যায়, তা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা সাজানো জরুরি।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান খোলা কাগজকে বলেন, নারীদের জন্য আলাদা পিংক বাস চালুর উদ্যোগটি যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়াই নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের সীমিত সেবার মাধ্যমে ঢাকার বিপুলসংখ্যক নারীর পরিবহন চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। রাজধানীর বিভিন্ন রুটে নারীদের যাতায়াতের প্রয়োজন থাকলেও সকালে কর্মস্থলে যাওয়ার সময় পর্যাপ্ত বাস পাওয়া যায় না। দুপুরে যাত্রী কম থাকায় বাসগুলো অনেকটা ফাঁকা চলে, আবার বিকেলে কর্মস্থল থেকে ফেরার সময় দেখা দেয় বাসের সংকট। ফলে সেবাটি অধিকাংশ নারীর প্রয়োজন পূরণ করতে পারছে না।
তিনি বলেন, নারীদের জন্য আলাদা বাস চালুর পরিবর্তে রাজধানীর সব গণপরিবহনকে নারী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য নিরাপদ ও যাত্রীবান্ধব করে তোলা উচিত। গণপরিবহনের মান উন্নত হলে নারীদের জন্য পৃথক বাসের প্রয়োজনীয়তাও কমে আসবে। তার ভাষায়, ‘পিংক বাসের উদ্যোগটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ছাড়া নেওয়া হয়েছে, লোকসান তো হবেই।’
বাংলাদেশে নারীদের জন্য পৃথক বাস চালুর উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। বিআরটিসি ১৯৯৮ সালে পরীক্ষামূলকভাবে মহিলা বাস চালু করে। ২০০১ সালে এ সেবা সম্প্রসারণ করা হয়। পরে ২০১৮ সালেও সেবাটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। বেসরকারি উদ্যোগে ‘দোলনচাঁপা’ নামেও নারীদের জন্য বাসসেবা চালু হয়েছিল। তবে আগের উদ্যোগগুলোতেও বাসের স্বল্পতা, দীর্ঘ অপেক্ষা ও অনিশ্চিত সময়সূচির মতো সমস্যা দেখা যায়। ফলে পৃথক বাস চালুর উদ্যোগ থাকলেও নারীদের জন্য নিয়মিত ও সহজলভ্য পরিবহনসেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজের মতে, বর্তমান পরিকল্পনায় মাত্র কয়েকটি বাস দিয়ে ঢাকার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রুটে সেবা দেওয়া হচ্ছে। অথচ একজন কর্মজীবী নারীর কাছে শুধু নিরাপদ বাস থাকাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজনের সময় সেই বাস পাওয়াও জরুরি। তিনি বলেন, কৌশলগত পরিকল্পনা ছাড়া কার্যকর গণপরিবহনসেবা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এর জন্য উপযুক্ত রুট নির্ধারণ, পর্যাপ্ত বাস, দুই বাসের মধ্যবর্তী সময় কমানো, নির্ভরযোগ্য সময়সূচি, সাশ্রয়ী ভাড়া, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, যাত্রীদের জন্য সহজলভ্য তথ্য এবং অন্যান্য গণপরিবহনের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। পিংক বাসের ক্ষেত্রেও এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
নারীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে চালু হওয়া পিংক বাসের যাত্রীসংখ্যা বাড়লেও সেবার সীমাবদ্ধতা ও পরিচালন ব্যয়ের চাপ কাটেনি। ফলে উদ্যোগটিকে কার্যকর করতে শুধু বাস বাড়ানো নয়, বরং যাত্রীদের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী রুট, ট্রিপ ও সময়সূচি পুনর্বিন্যাসের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন পরিকল্পনা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাই সামনে আসছে।
কেকে/এআই