ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন ফ্যাসিস্ট সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই ডিসেম্বরকে ঘিরেই আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা দেশের বিভিন্ন জায়গা ও প্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরায় কয়েকটি পোশাক কারখানা বন্ধের ঘোষণাকে পুঁজি করে শ্রমিকদের মাঠে নামিয়ে দেন তারা। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল উত্তরায় শ্রমিক বিক্ষোভে পুলিশসহ অর্ধশত আহত হয়েছে। অথচ শ্রমিকরা জানেই না তারা কেন আন্দোলন করছে, বা তাদের নেতা কে?
সূত্র বলছে, উত্তরায় শ্রমিক আন্দোলনের নেপথ্যে রয়েছে ফ্যাসিস্টদের নাশকতার ছক। দাবি আদায়ের চেয়ে মহাসড়ক বন্ধ করাই মুখ্য। কারণ, আন্দোলনকারীরা বিক্ষিপ্ত। বিকাশের মাধ্যমে তাদেরকে অর্থ সরবরাহ করা হচ্ছে। এই শ্রমিক আন্দোলনে শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা শ্রমিক ফেডারেশনের কোনো নেতাকর্মীই নেই। মূলত, কয়েকজন শ্রমিক নেতাকে সামনে রেখে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করছে ফ্যাসিস্টরা। আর এর নেপথ্যে কাজ করছেন, উত্তরায় অবস্থান করা আওয়ামী লীগের সাবেক একজন এমপি। তার প্রতিষ্ঠান থেকেই এসব ষড়যন্ত্র শুরু হয়।
গত ১২ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলনটি এখন মারমুখী আকার ধারণ করেছে। গতকাল শনিবার দ্বিতীয়বারের মতো পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন শ্রমিকরা। ভাঙচুর করা হয় পুলিশের গাড়ি। হামলা করা হয় পুলিশের ওপর। আহত হন অন্তত ৫০ জন।
চলতি বছরের শুরু থেকেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ফেসবুক পোস্টে আলোচনায় ছিল নভেম্বর ডেডলাইন, ডিসেম্বর হেডলাইন। সেই ডিসেম্বরকে সামনে রেখেই তারা ষড়যন্ত্রের জাল বুনে যাচ্ছে। জুলাই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল উত্তরা, আজমপুর, বিএনএস সেন্টার, রাজলক্ষী এলাকাটি। সেই আলোকে এই এই জায়গাটিকেই টার্গেটে পরিণত করা হয়েছে। এ ছাড়া উত্তরা এলাকাটি অধিক পরিমাণ এলিট শ্রেণির মানুষের বসবাস। ফলে এখানে ভিআইপি, সিআইপিদের ওপর নজরদারিও অনেকটা কম।
এক সময় এ এলাকায় আওয়ামী লীগের অন্তত ৭০ থেকে ৮০ জন এমপি-মন্ত্রী বসবাস করতেন। এ ছাড়া ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতাই এখানে বসবাস করতেন। সেই আলোকে এখনো এলাকাটিতে আওয়ামী লীগের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে নিভৃতে। ইতোপূর্বে এ এলাকা থেকে আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতাসহ অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গাজীপুর নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার আশপাশের আওয়ামী লীগের নেতারা অনেকেই এখানে বসবাস করেন। বর্তমানে তারা না থাকলেও স্ত্রী-সন্তান ও অনেক অনুসারী এখানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই নাশকতার ছক আঁকছে আওয়ামী লীগ। চলমান গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলনও এরই একটি অংশ বলে মনে করছেন অনেকে। গ্রেপ্তার হওয়া বহু আওয়ামী লীগ নেতা জামিনে এসে এখানে বসবাস শুরু করেছেন। অনেকে দেশে নেই। কিন্তু তাদের পরিবার-পরিজন উত্তরায় বসবাস করছেন। তারাই এসব ঘটনার ইন্ধন দিচ্ছেন। অর্থায়ন করছেন।
সরেজমিন দেখা যায়, প্রথমে শ্রমিকরা খালি হাতে এলেও পরে তারা লাঠিসোঁটা নিয়ে মহাসড়কে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেন। সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে প্রশাসন তাদের সরিয়ে দিতে চাইলে প্রশাসনের ওপর ক্ষিপ্ত হন শ্রমিকরা।
এ দিকে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি খসরু চৌধুরী এই এলাকার গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান নিপা গ্রুপের মালিক। চলমান আন্দোলনে এই খসরু চৌধুরীর ইন্ধনের তথ্যই পেয়েছেন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। ইতঃপূর্বে নিপা গার্মেন্টস থেকে ধারাবাহিক গুজব ছড়ানো হয়। কখনো বলা হয় জিনের আছর হয়েছে, কখনো বলা হয় শ্রমিকরা মারা যাচ্ছে। এখন আবার বেতন-ভাতার দাবিতে আন্দোলন হচ্ছে।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগ নেতা খসরু চৌধুরীর প্রতিষ্ঠানে ১০ থেকে ১৫ হাজার শ্রমিক রয়েছে, যাদের দিয়ে তিনি বড় আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি করছেন। অন্যদিকে ঢাকা-১৮ আসনে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য হাবিব হাসানের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। তার আস্থাভাজন ব্যক্তিদের অধিকাংশই বর্তমানে এলাকায় বসবাস করছেন।
আবার গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমেরও গার্মেন্টস সেক্টরে বিশাল প্রভাব রয়েছে। জাহাঙ্গীর আলমের লোকজন অনেকেই উত্তরায় বসবাস করেন। তারাই আন্দোলনে লোক জড়ো করা ও অর্থায়ন করার কাজ করছে— নিপা গার্মেন্টস ও হাবিব হাসানের গার্মেন্টস এবং গাজীপুর থেকে জাহাঙ্গীর আলমের একাধিক গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান।
গতকাল শনিবার দুপুরে উত্তরা জোনের প্রশাসন ও শিল্প পুলিশ কর্তৃক শ্রমিকদের সঙ্গে একাধিকবার বসার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পুলিশ বলছে, দাবি আদায়ের চেয়ে রাজপথ দখল করাই এখন শ্রমিকদের কাছে মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্দোলনের বিষয়ে উত্তরা জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) রেজাউল করিম, খোলা কাগজকে বলেন- এটি আসলে আন্দোলন মনে হচ্ছে না। এখানে শ্রমিক ফেডারেশনের কোনো লোকজনকে আমরা দেখতে পাইনি। নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কাউকে আমরা পাইনি। বিচ্ছিন্নভাবে শ্রমিকরা দলে দলে আসছেন। তারা দাবি আদায়ের জন্য প্লাকার্ড নিয়ে আসেন। সঙ্গে লাঠিসোঁটা, ইটপাটকেল নিয়ে আসেন। তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন কিছু। এখানে নিপা গার্মেন্টস নামে একটি কারখানার ইন্ধনের তথ্য আমাদের কাছে এসেছে। সেটি নিয়ে আমরা কাজ করছি।
এ বিষয়ে ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এসএম জাহাঙ্গীর হোসেন খোলা কাগজকে বলেন, এ আন্দোলনকে আমরা শ্রমিক আন্দোলন হিসেবে দেখেছি। অভ্যন্তরীণ কী রয়েছে সেটি গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত করে দেখছে। এ বিষয়ে নিয়মিত বিজিএমইএ এবং প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি।
আন্দোলনে আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। বিষয়টি যৌক্তিক। কারণ, ফ্যাসিবাদীরা এলাকা ছেড়ে গেলেও তাদের পরিবার-পরিজন রয়েছে। এই কাজে তাদের হাত রয়েছে কিনা সেটিও খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আন্দোলনের নামে নাশকতা মেনে নেওয়া হবে না, জনগণের জানমাল নিরাপত্তায় প্রশাসন আগামীতে আরও কঠোর হবে।
কেকে/এআই