উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট ও জ্বালানি অনিশ্চয়তা—এই তিন চ্যালেঞ্জের চাপে রয়েছে দেশের অর্থনীতি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্বল বিনিয়োগ, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি, ব্যাংক খাতের অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত অনিশ্চয়তা। দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা ও নীতির সীমাবদ্ধতায় অর্থনীতির ওপর আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিনিয়োগ বাড়ানো, ব্যাংক ও রাজস্ব খাতে সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক সুশাসন প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উদ্যোগের সুফল পেতে আস্থার সংকট কাটানো এবং অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা জরুরি।
অর্থনীতির সংকট কাটাতে সরকারের নানা উদ্যোগ :
অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতের সংকট মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে ১৫০টি কূপ খনন, তিন থেকে চারটি নতুন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল স্থাপন এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে কর ছাড় ও প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পুঁজিবাজারে বিশেষ তহবিল গঠন এবং ব্যাংক ও রাজস্ব খাতে সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট ও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার কারণে জ্বালানি খাত এখন অর্থনীতির অন্যতম প্রধান উদ্বেগের জায়গা। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খলা এবং বিদেশে অর্থ পাচারের মতো সমস্যাগুলো মোকাবিলায় সরকার কাজ করছে। একইসঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, এসব আলোচনার মাধ্যমে দেশের পুঁজিবাজার ও বন্ড খাতে বড় অঙ্কের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, মাতারবাড়ীর পাশাপাশি খুলনার কাছাকাছি গভীর পানির একটি নতুন স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে প্রায় ২০ মিটার গভীরতায় বড় জাহাজ থেকে সরাসরি তেল ও এলএনজি খালাসের সুবিধাসম্পন্ন আধুনিক টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে একটি জ্বালানি কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, একটি যৌক্তিক সময়ের মধ্যে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও জ্বালানি খাত পুরোপুরি স্থিতিশীল হবে। এরপর অর্থনীতি স্বাভাবিক গতিতে ফিরবে এবং পর্যায়ক্রমে দ্রুত প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে।
বিনিয়োগ বাড়াতে পাঁচ বছরের জন্য একই করহার :
বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
তিনি বলেন, ভঙ্গুর অর্থনীতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক জ্বালানি সংকট দেশের অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে আট মাসে জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৪ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলার।
তিনি জানান, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, দেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া না হলে প্রবৃদ্ধি আরও কমার আশঙ্কা রয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির সময় ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রত্যাশার কথাও জানান তিনি।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে পাঁচ বছরের জন্য একই করহার বজায় রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান উপদেষ্টা। এ ছাড়া বন্ধ কারখানা চালু করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা এবং ৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কম সুদে ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যবসার পরিবেশ, অর্থায়ন, জ্বালানি ও যোগাযোগ খাতেও সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে।
গতকাল রাজধানীতে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর ইএসজি ডেটা প্ল্যাটফর্মের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
অনুষ্ঠানে ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে শক্তিশালী উল্লেখ করে বাণিজ্যে প্রবেশাধিকার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণ এবং যুব ও নারীর কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকারের উদ্যোগে সমর্থন দেওয়ার কথা জানান।
অর্থের সংকট নয়, আস্থার সংকট :
অর্থনীতির বর্তমান দুরবস্থার পেছনে অর্থের অভাবের চেয়ে আস্থার সংকটকে বেশি দায়ী করছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি উচ্চ দারিদ্র্য, নিম্ন বিনিয়োগ ও নিম্ন প্রবৃদ্ধির একটি চক্রে আটকে রয়েছে। এর ফলে দারিদ্র্যের চাপ, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের বোঝা ও প্রাতিষ্ঠানিক হয়রানি বাড়ছে। এসবের ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। টেকসই অর্থনৈতিক উত্তরণের জন্য এ কাঠামোগত সংকট থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং সংস্কারহীন প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা সরকারকে স্বীকার করে তা মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এসব সমস্যার পেছনে অর্থের সংকটের চেয়ে আস্থার সংকটই প্রধানত দায়ী।
অর্থের অপচয়কেও অর্থনীতির অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
তার ভাষ্য, দেশে অনেক ভবন নির্মাণ করা হলেও সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ফলে বিভিন্ন খাতে দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, এমনকি কারখানা পরিচালনার জন্যও বিদেশ থেকে লোক আনতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শিক্ষার গুণগত মান বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।
আস্থা ফেরানোই বড় চ্যালেঞ্জ :
অর্থনীতির বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সরকারের পরিকল্পনায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, জ্বালানি সরবরাহ সম্প্রসারণ, করনীতির ধারাবাহিকতা এবং ব্যাংক ও রাজস্ব খাতের সংস্কার গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উদ্যোগের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো, অর্থের অপচয় বন্ধ করা এবং নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ কমানোই হবে সরকারের অন্যতম বড় পরীক্ষা।
কেকে/ এমএস