বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬,
২০ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: ● শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে ৪ ঘণ্টা এগিয়ে শুরু মজুরি বোর্ডের সভা      ● গাজীপুরে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, বাসন থানার সামনে সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ      ● কল্যাণপুরে বাস-লেগুনার মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ৪      ● বড়দিন উদযাপনে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী      ● দ্বিতীয় পদ্মা ও যমুনা সেতু নির্মাণে গতি আনার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর      ● হাম উপসর্গে আরও ৬ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ৮২      ● মিরপুরে ফের শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, বন্ধ মেট্রোরেল স্টেশন      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
৭ নভেম্বরের চেতনা: জাতীয় সংহতিই প্রযুক্তির বাংলাদেশ গড়ার প্রথম শর্ত
ড. শাহ জে মিয়া
প্রকাশ: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:৩২ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

আগামী ৭ নভেম্বর, শনিবার, জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। আমার এই লেখায় আমি দিনটিকে নিছক একটি পুরোনো তারিখ হিসেবে দেখার বদলে একটি প্রশ্ন সামনে রাখতে চাই, আর তা হলো, বাংলাদেশি জাতি হিসেবে যে কাজটি আমরা গত পঞ্চান্ন বছরেও শেষ করতে পারিনি, সেই কাজটির চাবি কি এই বিপ্লব ও সংহতি দিবসের ভেতরে লুকিয়ে আছে? প্রশ্নটি এ বছর আমাদের সবার কাছে আরও প্রাসঙ্গিক, যখন আমরা ১২ই ফেব্রুয়ারি একটি ইনক্লুসিভ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার পেয়েছি। কারণ দীর্ঘ বিরতির পর দিনটি জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে আবার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ফিরে পেয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠক এই দিনে সরকারি ছুটি বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে , এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রতি বছর ৭ নভেম্বর সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। একটি দিবসকে রাষ্ট্র এবং জনগণ যখন আবার নিজের বলে মেনে নেয়, তখন আমি মনে করি তার অর্থটি আবার নতুন করে বুঝে নেওয়া দরকার।

আসুন প্রথমে এই দিনের ঘটনাটি সংক্ষেপে জেনে নিই, কারণ আমাদের তরুণ প্রজন্মের অনেকেই এই ইতিহাস পাঠ্যবইয়ে পড়ার সুযোগ পাননি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর সেনাবাহিনীর দায়িত্ব এসে পড়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কাঁধে। এরপর ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি অংশ অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করে এবং গৃহবন্দী করে রাখে। দেশ তখন কার্যত নেতৃত্বশূন্য, সেনানিবাসে বিভ্রান্তি, আর সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক। এই অবস্থায় ৬ নভেম্বর দিবাগত রাতে সিপাহিরা এবং তাদের সঙ্গে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন এবং বন্দিদশা থেকে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে আনেন। বাংলাপিডিয়ার ভাষায়, “৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লব তাকে রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে”। এখানে বলে রাখা ভালো যে, যদিও দিনটিকে আমাদের সব রাজনৈতিক পক্ষ একই নামে ডাকে না, তবে আমি এই লেখায় সেই নামেই ডাকছি, যে নামে রাষ্ট্র আজ দিনটিকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, সাধারণ মানুষ কেন সেই রাতে রাস্তায় নামলেন? সৈনিকের অভ্যুত্থান এক বিষয়, আর তার পাশে নিরস্ত্র মানুষের এসে দাঁড়ানো সম্পূর্ণ আরেক বিষয়। আমি মনে করি, এর উত্তর লুকিয়ে আছে তার আগের কয়েকটি বছরের অভিজ্ঞতার ভেতরে। স্বাধীনতার আগে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণে সারা দেশের মানুষ জর্জরিত ছিলেন। স্বাধীনতার পর অর্থাৎ ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ মানুষ আশা করেছিলেন, এবার অন্তত রাষ্ট্র তাদের পাশে দাঁড়াবে। বাস্তবে ঘটেছিল উল্টোটা।

১৯৭৪ সালে দেশ এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের মুখে পড়ে; সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৭ হাজার, কিন্তু স্বাধীন গবেষকদের অনুমান তার বহুগুণ বেশি। দেশের এক প্রান্তে মানুষ না খেয়ে মারা যাচ্ছেন, আর অন্য প্রান্তে ক্ষমতার ঘনিষ্ঠ একটি গোষ্ঠী স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন কাটাচ্ছিলো, এই বৈষম্য তখন আর কারও চোখ এড়ায়নি। রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পেতে হলে একটি নির্দিষ্ট দলের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা চাই, এই ধারণাটিই তখন মানুষের ক্ষোভের কেন্দ্রে ছিল। অতএব সেই রাতের জনস্রোতকে আমি নিছক একটি সামরিক ঘটনার দর্শক হিসেবে দেখি না। আমি দেখি বঞ্চিত মানুষের একটি জমে থাকা জবাব হিসেবে।

এবার আসি দিনটির নামের দ্বিতীয় শব্দটিতে, কারণ আমি মনে করি আসল কথাটি ওখানেই আছে। দিনটির নাম কেবল বিপ্লব দিবস নয়, নাম জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। এখানে ছোট্ট করে সংহতি শব্দটি নিয়ে দুটি কথা বলে রাখা উচিত। সংহতি মানে কেবল সম্প্রীতি বা পারস্পরিক সদ্ভাব নয়; সংহতি মানে হলো সমাজের ভিন্ন ভিন্ন অংশ একটি অভিন্ন লক্ষ্যের সামনে নিজেদের ছোট ছোট স্বার্থকে পাশে সরিয়ে রেখে এক কাতারে দাঁড়ানো। ইংরেজিতে যাকে আমরা বলি 'সলিডারিটি' (Solidarity), অর্থাৎ পরস্পরের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে জন্ম নেওয়া ঐক্য। যাহোক, তো ৭ নভেম্বরের তাৎপর্য ঠিক এখানেই। সেদিন সামরিক বাহিনী, আধা-সামরিক বাহিনী এবং বেসামরিক সাধারণ মানুষ, অর্থাৎ তিনটি সম্পূর্ণ আলাদা জগতের মানুষ একই রাতে একই উদ্দেশ্যে একসঙ্গে দাঁড়িয়েছিলেন। আমাদের ইতিহাসে এমন ঘটনা সত্যিই বিরল, আর বিরল বলেই আজ পর্যন্ত সবার কাছে এটি মনে রাখার মতো।

এই সংহতির চেতনা থেকেই পরবর্তীকালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণাটি দাঁড় করিয়েছিলেন। এখন স্বাভাবিক প্রশ্ন আসে, এই জাতীয়তাবাদের ভিত্তির ভেতরে আসলে কী কী ছিল? তিনি লক্ষ করেছিলেন, বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্ম ও মতের জাতিগোষ্ঠী বাস করে, তাই কেবল ভাষা বা সংস্কৃতির ভিত্তিতে জাতীয় পরিচয় ঠিক করলে কেউ না কেউ বাদ পড়ে যাবে; সেই কারণেই তিনি মনে করতেন, ভূখণ্ডের ভিত্তিতেই জাতীয়তাবাদকে গ্রহণ করা উচিত। অর্থাৎ এই ভূখণ্ডে যিনি জন্মেছেন, যিনি এখানে বাস করেন এবং এই রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধ, তিনিই বাংলাদেশি। একজন বিশ্লেষক বিষয়টিকে একটি ফুলের তোড়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন: ভাষা যদি একটি ফুল হয়, ধর্ম আরেকটি ফুল, আর ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতি, ভূগোল, ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধ মিলিয়ে যে তোড়াটি তৈরি হয়, সেটিই বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। উপমাটি আমার ভালো লাগে, কারণ ফুলের তোড়ায় কোনো ফুলকে বাদ দেয়া যায় না, বা বাদ দিলেও সেটা আর ফুলের তোড়া থাকে না।

আমি বলতে চাই, এই সংজ্ঞার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর অন্তর্ভুক্তি। পাহাড় কিংবা সমতল, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র বা নৃগোষ্ঠী নির্বিশেষে প্রত্যেকের জায়গা এখানে আছে। একজন পাহাড়ি তরুণ তার নিজের ভাষায় ও নিজের সাহিত্যে বড় হবেন, নিজের ধর্ম ও সামাজিক রীতি পালন করবেন, তার সন্তানেরাও সেভাবেই বেড়ে উঠবে। এবং তারপর তারা নিজ নিজ জায়গা থেকেই দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখবেন; এতে তাদের বাংলাদেশি পরিচয় এতটুকু কমে না, বরং বাড়বে । আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি বহুভাষিক ও বহুধর্মের দেশে এই ভূখণ্ডভিত্তিক পরিচয়টিই সবচেয়ে নিরাপদ পরিচয়। 

যাহোক, এবার আমি মূল প্রশ্নটিতে ফিরি। স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছর পার হয়ে গেছে। এই সময়ে আমরা অনেক কিছু অর্জন করেছি, কিন্তু একটি জায়গায় বারবার ব্যর্থ হয়েছি। জাতিকে একটি ঐক্যের জায়গায় আনতে পারিনি। প্রতিটি পালাবদলে আমরা ইতিহাস নতুন করে লিখেছি, প্রতিষ্ঠান ভেঙেছি এবং প্রতিপক্ষকে শত্রু বানিয়েছি। এর মূল্য কে দিয়েছে? দিয়েছে আমাদের তরুণ প্রজন্ম, যাদের মেধা, সময় ও সম্ভাবনা আমরা অকারণে নষ্ট করেছি। আমি মনে করি, ৭ নভেম্বরের চেতনাটি আমাদের জন্য ঠিক এই জায়গাতেই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, কারণ সেই চেতনার মূল কথাটি দলীয় নয়, সেটি জাতীয় সার্বভৌমত্ত আর সর্বজনীয়তার স্বাক্ষর।
এই ঐক্যের চেতনাকে আজ একটি লিখিত কাঠামোর ভেতরে নিয়ে এসেছে ৩১ দফা। আমি এখানে কেবল সেই দফাগুলোর কথা বলব, যেগুলো সরাসরি আজকের আলোচনার সঙ্গে যুক্ত। ২২তম দফা যুবসমাজের চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী যুব-উন্নয়ন নীতিমালা তৈরির কথা বলে এবং কর্মসংস্থান না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষিত বেকারদের ভাতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। ২৪তম দফা উচ্চশিক্ষায় জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয় এবং শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলে। আর ৩০তম দফা সরাসরি তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার, পাশাপাশি মহাকাশ গবেষণা ও আণবিক শক্তি কমিশনের কার্যক্রম সমৃদ্ধ করার কথা বলে। অতএব ৩১ দফা কোনো অলীক স্বপ্ন নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত রোডম্যাপ, আর বর্তমান সরকার সেই রোডম্যাপ ধরেই এগোচ্ছে।

এখন আমরা আসি সেই জায়গায়, যেখানে আমার নিজের কাজ এবং আমার নিজের দায়িত্ব নিহিত। আমি তিনটি ক্ষেত্রের কথা আলাদা করে বলতে চাই, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অন্যান্য উচ্চপ্রযুক্তি আগামী দশ বছরে আমাদের সেবার মান সত্যিই বদলে দিতে পারে।

প্রথমেই রয়েছে শিক্ষা ও গবেষণা। উদাহরণস্বরূপ, আজকের ভাষা-প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা এমন ট্রেনিং ব্যবস্থা তৈরি করতে পারি, যা প্রতিটি শিক্ষার্থীর দুর্বলতা আলাদা করে চিহ্নিত করে এবং সেই অনুযায়ী তাকে অনুশীলন সাজিয়ে দিবে। গাইবান্ধার একটি স্কুলের শিক্ষার্থী আর ঢাকার একটি স্কুলের শিক্ষার্থীর মধ্যে যে প্রস্তুতির ব্যবধান, সেটি কমানোর জন্য আমি মনে করি সবচেয়ে সহজ উপায় এটিই। তবে এর জন্য দরকার বাংলা ভাষার মানসম্মত ডেটা, আর সেই ডেটা তৈরির কাজটি আমাদেরই সবার আগে করতে হবে।  কারণ বাংলা এখনো প্রযুক্তিবিশ্বে একটি স্বল্প-সম্পদ ভাষা হিসেবেই বিবেচিত।

তারপর রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা ও কৃষি। টেলিমেডিসিনের সঙ্গে পূর্বানুমানভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত করলে উপজেলা পর্যায়ের একজন চিকিৎসক অনেক আগেই ঝুঁকিপূর্ণ রোগীকে চিহ্নিত করতে পারবেন, ফলে রোগী ঢাকায় আসার আগেই চিকিৎসা শুরু হতে পারে। কৃষিতে নির্ভুল চাষাবাদ বা 'প্রিসিশন ফার্মিং' ব্যবহার করে সার, পানি ও কীটনাশকের অপচয় কমানো যায়, যা একজন ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য সরাসরি নগদ সাশ্রয় হবে। আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, এগুলো কোনো ভবিষ্যতের কল্পনা নয়; এই প্রযুক্তিগুলো পৃথিবীর বহু দেশে বছরের পর বছর ধরে মাঠ পর্যায়ে ব্যবহৃত হচ্ছে।

আরেকটি অন্যতম ক্ষেত্র হলো নাগরিক সেবা ও পরিবহন। সরকারি দপ্তরের যে কাজগুলো নিয়মবদ্ধ এবং পুনরাবৃত্তিমূলক, সেগুলোতে স্বয়ংক্রিয়তা আনলে একজন কর্মকর্তা তাঁর সময়টুকু জটিল সিদ্ধান্তে দিতে পারেন। পরিবহনে যানজট ব্যবস্থাপনা, দুর্ঘটনার পূর্বাভাস এবং জরুরি সেবার রুট নির্ধারণে এই প্রযুক্তি ইতিমধ্যেই পরীক্ষিত। তবে এখানে আমি একটি সতর্কবার্তা দিতে চাই, যেটি আমি আমার গবেষণার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি: যন্ত্র বসানো সহজ, কিন্তু যন্ত্রের চারপাশের নিয়ম, দক্ষতা ও জবাবদিহি তৈরি করা কঠিন, আর বেশিরভাগ প্রকল্প ব্যর্থ হয় ঠিক এই দ্বিতীয় জায়গাটিতেই।

এখানে একটি কথা স্পষ্ট করে বলা দরকার, নইলে পুরো আলোচনাটি ভুল দিকে চলে যাবে। এই সেবাগুলো যদি আমরা সম্পূর্ণভাবে বিদেশি প্রযুক্তির উপর নির্ভর করে গড়ি, তাহলে সেবা পাব ঠিকই, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ পাব না। এখানে ছোট্ট করে সার্বভৌম এআই বা সভরেইন এআই বা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা (Sovereign AI) বলতে কী বোঝায়, সেটি সংক্ষেপে বলতে চাই। সার্বভৌম এআই মানে এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে মডেলটি নিজের ভাষায় তৈরি, নিজের দেশের তথ্যভাণ্ডারে প্রশিক্ষিত, নিজের দেশের সার্ভারে চলে এবং নিজের দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী আমরাই সেটি পরিচালনা করতে সক্ষম। যাহোক, তো এবার লক্ষ করুন, ৭ নভেম্বরের মূল কথাটিই ছিল সার্বভৌমত্ব রক্ষা। একাত্তরে এবং পঁচাত্তরে সার্বভৌমত্ব রক্ষা হতো সীমান্তে, মানুষের শরীর দিয়ে। আজ একবিংশ শতাব্দীতে সার্বভৌমত্বের আরেকটি সীমান্ত তৈরি হয়েছে, আর সেটি হলো তথ্য ও মডেলের সীমান্ত। আমদানি করা সমাধান আমাদের সমস্যা বোঝে না, তাই দেশীয় সমস্যার জন্য দেশীয় মডেলই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত।

৭ নভেম্বরের চেতনার আরেকটি দিক আছে, যেটি প্রযুক্তির আলোচনায় প্রায়ই বাদ পড়ে যায়। সেদিনের মূল তাগিদ ছিল নিজের ভূখণ্ডকে বাইরের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব থেকে রক্ষা করা। আজ সেই প্রভাব আর কেবল সীমান্ত দিয়ে আসে না, আসে স্ক্রিনের ভেতর দিয়ে। নির্বাচনের সময় সীমান্তের ওপার থেকে পরিচালিত গুজব ও ভুল তথ্যের প্রচারণা কীভাবে একটি সমাজকে ভেতর থেকে বিভক্ত করে দিতে পারে, সেটি আমি নিজে কাছ থেকে দেখেছি।  জিয়া সাইবার ফোর্সের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশে কাজ করতে গিয়ে আমাদের প্রতিদিন এই ধরনের প্রচারণা মোকাবিলা করতে হয়েছে। এখানে একটি বিষয় আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই: ডিপফেক, অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বানানো নকল ভিডিও ও কণ্ঠস্বর, এবং সমন্বিত গুজব শনাক্ত করার সক্ষমতা যদি আমাদের নিজেদের হাতে না থাকে, তাহলে আমরা অন্যের তৈরি শনাক্তকারী সফটওয়্যারের উপরেই নির্ভর করতে বাধ্য হব, আর তখন কোনটি সত্য আর কোনটি নয়, সেই সিদ্ধান্তটিও কার্যত আমাদের হাতে থাকবে না। অতএব ফ্যাক্ট-চেকিং বা সত্যতা যাচাইয়ের একটি জাতীয় সক্ষমতা গড়ে তোলা আজ সংস্কৃতির প্রশ্ন নয়, এটি প্রতিরক্ষারই একটি অংশ।

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, একটি ঐতিহাসিক দিবসের আলোচনার সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্পর্ক কোথায়? প্রশ্নটি যুক্তিসঙ্গত, এবং আমি এর উত্তর দিতে চাই। বাস্তবতা হলো, কোনো বড় জাতীয় প্রকল্পই বিভক্ত জাতি বাস্তবায়ন করতে পারে না। একটি জাতীয় ডেটা নীতি, একটি আঞ্চলিক বিগ ডেটা ব্যাংক কিংবা একটি বাংলা ভাষার মডেল তৈরি করতে গেলে দশ-পনেরো বছরের ধারাবাহিকতা লাগে, যা একটি সরকারের মেয়াদের চেয়ে বেশি। যেহেতু এই কাজগুলো এক মেয়াদে শেষ হয় না, সেহেতু এগুলোকে দলীয় প্রকল্প না বানিয়ে জাতীয় প্রকল্প বানানো ছাড়া উপায় নেই। সংহতি তাই এখানে আবেগের বিষয় নয়, সংহতি এখানে একটি প্রকৌশলগত পূর্বশর্ত।

আমরা যারা বহির্বিশ্বে আছি, আমাদের দায়িত্বটিও আমি এখানে স্পষ্ট করে বলতে চাই। বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাকেন্দ্রে বাংলাদেশি শিক্ষক, গবেষক ও প্রকৌশলীরা যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা প্রতিদিন অর্জন করছেন, সেটি দেশে পৌঁছে দেওয়ার একটি কাঠামোবদ্ধ পথ আমাদের তৈরি করতে হবে। আমি মনে করি, অর্থের চেয়ে এই জ্ঞানের স্থানান্তরটিই এখন বেশি জরুরি, কারণ অর্থ দিয়ে যন্ত্র কেনা যায়, কিন্তু যন্ত্র চালানোর ও যাচাই করার সক্ষমতা কিনতে পাওয়া যায় না।

এবার আসি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে, অর্থাৎ আমাদের তরুণ প্রজন্ম এর থেকে কী পাবে? অনেকের মনে আশঙ্কা থাকে যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এলে মানুষের কাজ কমে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রযুক্তি কাজ কমায় না, কাজের ধরন বদলে দেয় এবং কাজের মানকে উন্নীত করে। আগামী দশ বছরে আমাদের দেশে এআই সলুশন আর্কিটেক্ট, মডেল মূল্যায়ন বিশেষজ্ঞ, বাংলা ভাষার ডেটা অ্যানোটেটর, এমএলঅপস ইঞ্জিনিয়ার, ডেটা প্রোটেকশন অফিসার, স্বাস্থ্য-ডেটা বিশ্লেষক এবং স্মার্ট ফার্মিং কনসালটেন্টের মতো পদ তৈরি হবে। অথচ এসব পদের নাম আজ থেকে দশ বছর আগে বাংলাদেশে কেউ উচ্চারণও করত না। আমি চাই গাইবান্ধা কিংবা বান্দরবানের একজন তরুণ, যিনি আজ কেবল একটি চাকরির অপেক্ষায় বসে আছেন, তিনি আগামীকাল তাঁর নিজের এলাকার কৃষকদের স্মার্টফোনের মাধ্যমে এআই-ভিত্তিক পরামর্শ দেবেন এবং সেটিকেই পেশা হিসেবে নেবেন। কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মানুষের বিকল্প নয়, সহায়ক, এই কথাটি আমি বারবার বলি এবং আজও বলছি।

স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আশির দশকেই অনুধাবন করেছিলেন যে, উৎপাদন ও আত্মনির্ভরতা ছাড়া বাংলাদেশের মুক্তি নেই। তার ১৯ দফা কর্মসূচি দ্রুত আর্থসামাজিক পরিবর্তনের উপর জোর দিয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং প্রশাসনকে বিকেন্দ্রীকরণ করা। এর প্রথম বাস্তব কর্মসূচিটিই ছিল খাল খনন, আর দেড় বছরের মধ্যে দেড় হাজারেরও বেশি খাল খনন ও পুনর্খননের কাজ তিনি শেষ করেছিলেন। লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, ৩১ দফার ২৯তম দফাতেও খাল ও নদী খননের কথা আবার এসেছে। অর্থাৎ ভিত্তিটি একই, কেবল যন্ত্রটি বদলেছে। সেদিন যে কাজটি তিনি কোদাল আর মানুষের শ্রম দিয়ে শুরু করেছিলেন, আজ একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে সেই কাজটিকেই পূর্ণতা দেওয়ার সময় এসেছে।

বিএনপি মানেই বাংলাদেশের মা, মাটি ও মানুষের সাথে সম্পর্কিত একটি অত্যাধুনিক রাজনৈতিক সংগঠন, বিএনপি মানেই বাংলাদেশের আপামর জনগণ। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যে ভিত্তিটি গড়ে দিয়েছিলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সেটিকে গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে নিয়েছেন, আর আজ প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান সেই একই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে ৩১ দফার রোডম্যাপ ধরে রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের কাজটি করছেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ৭ নভেম্বরের সংহতির চেতনাকে যদি আমরা সত্যিই ধারণ করতে পারি, তাহলে শিক্ষা, গবেষণা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, পরিবহন ও সামাজিক উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর একটি স্বনির্ভর, টেকসই ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলতে পারব, যে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। ভবিষ্যতে আরও এধরনের লেখা নিয়ে সবার সামনে আসার প্রত্যাশা নিয়ে শেষ করছি। ধন্যবাদ সবাইকে।

তথ্যসূত্র

১. বাংলাপিডিয়া, 'রহমান, শহীদ জিয়াউর' ভুক্তি। bn.banglapedia.org
২. প্রথম আলো, 'ঘটনাবহুল ৭ নভেম্বর আজ'। prothomalo.com/politics/kw80hbk38v
৩. আইটিভি বিডি, '৭ নভেম্বর সরকারি ছুটি বহাল: মন্ত্রিপরিষদ সচিব', ১৬ এপ্রিল ২০২৬। itvbd.com/national/265246
৪. ঢাকা টাইমস, '৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে প্রতিবছর সাধারণ ছুটি', ৭ অক্টোবর ২০২৬। dhakatimes24.com/2026/10/07/414551
৫. প্রথম আলো, 'বিএনপির ৩১ প্রতিশ্রুতি', ১৩ জুলাই ২০২৩। prothomalo.com/politics/31yb9e4k2s
৬. দৈনিক ইনকিলাব, 'জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ: আত্মপরিচয়, ঐক্য ও অন্তর্ভুক্তির দর্শন'। dailyinqilab.com/editorial/article/813859
৭. ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ সংক্রান্ত তথ্য, উইকিপিডিয়া। en.wikipedia.org/wiki/Bangladesh_famine_of_1974

লেখক: প্রফেসর অফ বিজনেস এনালিটিক্স এন্ড অ্যাপ্লাইড এআই,
উপপরিচালক, সেন্টার ফর অ্যাপ্লাইড এন্ড রেস্পন্সিবল এআই,
নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া।
ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরাম এবং বিএনপি চেয়ারম্যানের বহিঃবিশ্বে শহীদ জিয়ার আদর্শে বিশ্বাসী পেশাজীবী এক্সপার্টিজ গ্রূপের সদস্য।

কেকে/সাশ 



আরও সংবাদ   বিষয়:  জাতীয় সংহতি দিবস   বাংলাদেশ   
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close