কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে জামায়াতে ইসলামী নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান রঞ্জনের বড় ছেলে শাহরিয়ার জামান রানাকে (৪০) ছুরিকাঘাতের ঘটনায় থানায় মামলা গ্রহণ নিয়ে টানাপোড়েনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় কটিয়াদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তাকে দ্রুত বদলির দাবি জানিয়েছেন আখতারুজ্জামান রঞ্জন।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ভোরে উপজেলার সহশ্রাম-ধুলদিয়া ইউনিয়নের গচিহাটা এলাকা থেকে হামলার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে লিমন (২৫) নামে একজনকে আটক করা হয়। আটক লিমন একই ইউনিয়নের গচিহাটা এলাকার সামছদ্দিনের ছেলে।
আহত শাহরিয়ার জামান রানা উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান রঞ্জনের বড় ছেলে। বর্তমানে তিনি রাজধানীর কল্যাণপুরের ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁর শারীরিক অবস্থা শঙ্কামুক্ত বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সুত্র জানা যায়, বুধবার সন্ধ্যায় শাহরিয়ার জামান রানা গচিহাটা বাজারে অবস্থান করছিলেন। এ সময় ধারালো অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে কয়েকজন ব্যক্তি তার ওপর হামলা চালান। তাকে মারধরের পাশাপাশি ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়।
এদিকে বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে লাইভে এসে আখতারুজ্জামান রঞ্জন অভিযোগ করেন, গচিহাটা বাজারে একটি চক্র বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নাম ভাঙিয়ে নানা অপকর্মে জড়িত। ওই চক্রের মদদেই কয়েকজন যুবক তার ছেলের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়েছে। ঘটনার পরপরই কটিয়াদী থানার ওসি মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামকে বিষয়টি জানান। ওসি দ্রুত তদন্তের আশ্বাস দিয়ে এক ঘণ্টার মধ্যে ঘটনাস্থলে যান। পরে হামলায় জড়িত সন্দেহে ১২ জনের নাম জানতে চাইলে তিনি তাঁদের নাম ওসির হোয়াটসঅ্যাপে পাঠান।
আখতারুজ্জামান রঞ্জনের দাবি, পুলিশ ঘটনাস্থলে কয়েকজন সন্দেহভাজনকে পেয়ে তাদের সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টা আলোচনা করে। পরে ওসি তাকে লিখিত অভিযোগ দিতে বলেন। সে অনুযায়ী আইনজীবীর মাধ্যমে অভিযোগপত্র তৈরি করে থানায় জমা দিতে গেলে ওসি তা গ্রহণে গড়িমসি করেন। একপর্যায়ে পুলিশ সুপারের অনুমতি ছাড়া এজাহার গ্রহণ সম্ভব নয় বলে তাকে জানানো হয়।
তিনি আরও বলেন, পরে তারা আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। আদালতে আবেদন তৈরির সময় তাদের জানানো হয়, থানা অভিযোগটি এজাহার হিসেবে গ্রহণ করবে। এরপর আবার থানায় গেলেও বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত অভিযোগটি গ্রহণ করা হয়নি।
১২ জনের নাম দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, তাদের মধ্যে কয়েকজন দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় চাঁদাবাজি, মাস্তানি ও বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত। তারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়ায় থেকে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন। একসময় তিনি তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতেন। তবে বিএনপির সঙ্গে তার রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি হওয়ার পর তারা বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন। এ কারণে তার প্রতি তাদের বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
আখতারুজ্জামান রঞ্জনের অভিযোগ, সন্দেহভাজনদের কয়েকজন আগে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাদের কেউ কেউ মাদক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও জড়িত। গচিহাটা রেলস্টেশনের বিপরীত পাশে মাদকের একটি আড্ডা রয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, বিষয়টি স্থানীয় লোকজন ও পুলিশ জানে। এমনকি ওই মাদক কারবারিদের কাছ থেকে ওসি নিয়মিত চাঁদা পান বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে লাইভে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি তিনি।
রঞ্জন বলেন, অভিযোগপত্রে কোনো ভুল থাকলে আইন অনুযায়ী যাচাই-বাছাই ও তদন্তের মাধ্যমে তা সংশোধন করা যেতে পারে। কিন্তু অভিযোগ গ্রহণ না করার এখতিয়ার পুলিশের আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তার অভিযোগ, ওসি অভিযুক্ত ব্যক্তিদের রক্ষার চেষ্টা করছেন এবং ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করছেন।
হামলার ঘটনায় বিএনপির মূল দলের কোনো নেতা বা সাংগঠনিক পর্যায়ের নেতাকর্মী জড়িত নন বলে দাবি করেন আখতারুজ্জামান রঞ্জন। তিনি বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দীন, কটিয়াদী উপজেলা বিএনপির সভাপতি দিলীপ, সাধারণ সম্পাদক কাঞ্চন ও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি বাবলুর কোনো সাংগঠনিক লোক তাঁর দেওয়া ১২ জনের তালিকায় নেই। তবে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি একজনের নাম বাদ দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন বলে জানান তিনি। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ওই ব্যক্তির নাম বাদ দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হন বলেও উল্লেখ করেন।
আখতারুজ্জামান রঞ্জন বলেন, পুলিশের এমন ভূমিকার কারণে বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। সাধারণ মানুষের কাছে এ ঘটনার দায় বিএনপির ওপর পড়তে পারে। অথচ বিএনপির মূল দলের কেউ এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন।
ফেসবুক লাইভের শেষ দিকে তিনি পুলিশ প্রশাসনের কাছে কটিয়াদী থানার ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে তাকে দ্রুত বদলির দাবি জানান। তার আশঙ্কা, বর্তমান ওসি দায়িত্বে থাকলে মামলার তদন্ত প্রভাবিত হতে পারে এবং তিনি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবেন।
এ বিষয়ে কটিয়াদী থানার ওসি মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বলেন, বুধবার সন্ধ্যায় গচিহাটা কলেজের তিন শিক্ষার্থী আফতাব, আহাদাত ও জামিদুল কলেজ এলাকায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। তাদের মধ্যে জামিদুল ও আহাদাত আফতাবকে এগিয়ে দিতে কলেজের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় আখতারুজ্জামান রঞ্জনের ছেলে শাহরিয়ার জামান রানা তাদের দেখতে পেয়ে কাছে ডাকেন এবং সেখানে কী করছেন, তা জানতে চান।
ওসি বলেন, শাহরিয়ার জামান তাদের মাদকসেবী বলে সন্দেহ করেছিলেন। তবে তারা সবাই ওই কলেজের শিক্ষার্থী। তাঁদের মধ্যে আফতাবের চোখে কম দেখার পাশাপাশি কানে শোনারও কিছুটা সমস্যা রয়েছে। এ নিয়ে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে শাহরিয়ার জামান রানাকে ছুরিকাঘাত করা হয়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত একজনকে আটক করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকায় সেগুলো সংশোধনের পর নিয়মিত মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হবে।
এ বিষয়ে জানতে কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
কেকে/ এমএস