রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের প্রকৃতি যতটা মনোরম, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ততটাই উদ্বেগজনক। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও অপহরণকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বেড়েছে। গোলাগুলি ও হত্যার ঘটনায় পাহাড়ি জনপদে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সাজেকে নতুন করে সৃষ্ট উত্তেজনা সেই আতঙ্কেরই সর্বশেষ প্রকাশ।
সরেজমিন প্রতিবেদনে স্থানীয়দের যে বর্ণনা উঠে এসেছে, তা অস্বস্তিকর। আয়ের একটি অংশ টোকেনের মাধ্যমে চাঁদা হিসেবে দিতে হয়। জীবনের নিরাপত্তার জন্য একাধিক গ্রুপকে অর্থ দেওয়ার নজিরও আছে। গোয়েন্দা তথ্যমতে, তিন জেলা থেকে বছরে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা আদায় হয়। এই অর্থে কেনা অস্ত্র শেষ পর্যন্ত তাক করা হচ্ছে সেই সাধারণ মানুষের দিকেই, যাঁরা চাঁদা দিচ্ছেন। এর চেয়ে বড় বিড়ম্বনা আর কী হতে পারে?
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, জেএসএস ও ইউপিডিএফের হাতে স্নাইপার রাইফেল, নাইট ভিশন ক্যামেরা, রকেট লঞ্চার ও বিমান বিধ্বংসী অস্ত্রসহ ছোট-বড় নানা ধরনের মারণাস্ত্র রয়েছে। দুই সংগঠনের বিরোধে শতাধিকবার গোলাগুলির ঘটনাও ঘটেছে। কে কোন এলাকায় চাঁদা তুলবে, এই আধিপত্যের দ্বন্দ্বই সংঘাতের মূল কারণ বলে স্থানীয়রা মনে করেন।
এই সংঘাতের মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। সাজেকের অবরোধ ও অস্থিরতায় পর্যটনকেন্দ্রিক কয়েক হাজার মানুষের জীবিকা থমকে গেছে। মাহিন্দ্র ও সিএনজিচালক, চান্দের গাড়ির চালক, রেস্তোরাঁ ও হোটেলকর্মী, সবাই আজ অনিশ্চয়তায়। সন্তানেরা বেড়ে উঠছে গোলাগুলির শব্দের মধ্যে। এ ভোগান্তি পাহাড়ি ও বাঙালি সব জনগোষ্ঠীর। তাই অপরাধের দায় নির্দিষ্ট সংগঠন ও ব্যক্তির, কোনো জাতিগোষ্ঠীর নয়, এ কথা স্পষ্ট থাকা জরুরি। অন্যথায় অবিশ্বাস ও বিভাজন আরও গভীর হবে এবং সংকট জটিল আকার নেবে। অবরোধকারীদের দাবিগুলো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একটি সংগঠনের উৎখাত চাওয়া হলেও একই ধরনের অপর সশস্ত্র সংগঠন সম্পর্কে নীরবতা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করছে। রাষ্ট্রকে তাই সব পক্ষের প্রতি সমান অবস্থান নিতে হবে।
১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির লক্ষ্য ছিল সশস্ত্র সংঘাতের অবসান। আড়াই দশক পরও অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও অপহরণের ঘটনা সেই লক্ষ্যের অপূর্ণতাই মনে করিয়ে দেয়। পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি জানিয়েছেন, সাজেকে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে এবং গত কয়েক বছরে এক হাজারের বেশি অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার হয়েছে। এটি ইতিবাচক, কিন্তু যথেষ্ট নয়। নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর কার্যকর প্রতিরোধ গড়ার সামর্থ্য নেই। তবু তাদের সাংগঠনিক পুনরুত্থান উদ্বেগের কারণ। শুধু সামরিক নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী শান্তি আসে না, আবার রাজনৈতিক সমাধানের অপেক্ষায় জানমালের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলাও চলে না।
এ প্রেক্ষাপটে আমরা মনে করি, প্রথমত, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কোনো গোষ্ঠীর প্রতি পক্ষপাত ছাড়া সমান কঠোরতায় অভিযান চালাতে হবে। দ্বিতীয়ত, চাঁদা আদায়ের নেটওয়ার্ক ও আর্থিক লেনদেনের উৎস শনাক্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে। তৃতীয়ত, সাজেকসহ পর্যটন এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কর্মহীন মানুষের জন্য জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। চতুর্থত, চাঁদাবাজি ও অপহরণের শিকার মানুষ যেন নির্ভয়ে অভিযোগ জানাতে পারেন, সেই নিশ্চয়তা দিতে হবে। পঞ্চমত, শান্তিচুক্তির অবাস্তবায়িত ধারাগুলো নিয়ে সব পক্ষের সঙ্গে অর্থবহ সংলাপ এগিয়ে নিতে হবে।
পাহাড়ের শান্তি কেবল তিন জেলার বিষয় নয়, সমগ্র দেশের স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িত। বন্দুকের জোরে আধিপত্যের রাজনীতি বন্ধ করতে না পারলে এর মাশুল দিতে হবে পাহাড়ের প্রতিটি মানুষকে। রাষ্ট্রকে তাই কঠোর আইনি পদক্ষেপ ও আস্থা অর্জনের রাজনীতি, দুটোই একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।
কেকে/সাশ